কেন ফুরাচ্ছে দিন?|159164|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
কেন ফুরাচ্ছে দিন?
মামুনুর রশীদ খোকা

কেন ফুরাচ্ছে দিন?

কেন হারিয়ে যাচ্ছে মীরকাদিমের গরুর দিন? সারা দেশেই তো তাদের অনেক সুনাম। কোরবানিতে মীরকাদিমের গরু হলে আর কোনো কথাই থাকে না পুরনো ঢাকার অনেক পরিবারের। মীরকাদিম ঘুরে, ছবি তুলে লিখেছেন মামুনুর রশীদ খোকা

ঢাকা বিভাগেরই একটি জেলা মুন্সীগঞ্জ। এই জেলার সদর উপজেলা মীরকাদিম, এখন হয়েছে পৌরসভা। এক সময় ছিল ‘দ্বিতীয় কোলকাতা’। ইছামতি ও ধলেশ্বরীর তীরে তার বাস। গয়নার নৌকায় দেশ-বিদেশে বাণিজ্য ছিল। ওপারেই  নারায়ণগঞ্জ, বাংলার ‘ডান্ডি’। তবে ধীরে ধীরে পাটের ব্যবসা বন্ধ হতে লাগল সারা দেশে, নারায়ণগঞ্জও হারিয়ে গেল তার ঐতিহ্য শেষে। মুন্সীগঞ্জ দ্বিতীয় কলকাতার মর্যাদা হারাল। তবে আবার তার নাম ছড়াল বিশেষ এক কারণে। সেটির শুরু হলো এই জেলার মূল শহর মীরকাদিম পৌরসভায়। সেই ইতিহাস একশ বছরের। শহরের প্রায় বাড়িতেই ছিল মীরকাদিমের গরু। এমনও দিন গেছে, প্রতিটি গোয়ালেই ৩০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত গরু পালা হয়েছে। এখন কেবল নগর কসবা, টেঙ্গর, নৈদীঘির পাথর, কমলাঘাট, রিকাবি বাজার ও অন্য জেলা মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর গ্রামে পেশাদার গরুর বেপারিরা এই ‘ধবল গরু’ পালছেন।

তারা গরুগুলো কিনছেন ফরিদপুরের টেপাখোলা ও পারা গ্রাম থেকে। রোজার ঈদের পর সেগুলো কেনেন, প্রতিটি গরুর বয়স থাকে আড়াই থেকে তিন বছর। টানা আট মাস থেকে এক বছর সন্তানের মতো যতেœ সেগুলোকে লালন-পালন করেন। পরে পুরনো ঢাকার বিখ্যাত রহমতগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের রহমতগঞ্জ মাঠে বিক্রি করেন ভালো দামে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শহরের প্রায় সব এলাকাতেই অনেকগুলো পরিবার এই ধবল গরু লালন-পালন ও কোরবানির জন্য সেগুলো বিক্রির ব্যবসা করেছেন। একদিকে তাদের লাভ হয়েছে, অন্যদিকে সওয়াবও পেয়েছেন। তবে মীরকাদিমের গাভী, ষাঁড়ের আগের দিন আর নেই। ‘সাদা গরু’ হারিয়ে যাচ্ছে। কেন? সেই খোঁজেই গেলাম শহরের অলিগলিতে, বাসাবাড়িতে। এলাকাগুলো ঘুরে জানা গেল, এখন মাত্র ১২টি পরিবার ধরে রেখেছেন পূর্বপুরুষের পেশাটি। কেন তারা নেই? সে অনেক গল্প।

মীরকাদিমের গরুর সবচেয়ে বড় সুনাম এর মাংস খুব সুস্বাদু। পুরো গরুটিই দেখতে অসাধারণ। এক ফোঁটা দাগও থাকে না সাদা শরীরে। খুব মোটাতাজা, শক্তিশালীও বটে। সেই গরুর ব্যবসা ধরে রেখেছেন নগর কসবার ফকির চাঁনের পরিবার। টানা ৪০ বছর মীরকাদিমের গরুর বেপারি ছিলেন তিনি। তবে মাস কয়েক আগে তার মৃত্যু ঘটেছে। মৃত্যুর আগেই এই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী চারটি গরু নিয়ে এসেছিলেন এবারের কোরবানির জন্য। ঈদে বিক্রি করবেন রহমতগঞ্জের হাটে। তবে ভাগ্য সেটি তাকে হতে দিল না।

বাবার হয়ে তার দুই ছেলে আক্তার ও মঞ্জুর হোসেন গরুগুলো লালন-পালন করছেন। সঙ্গে তাদের মা সালেহা বেগম আছেন সব কাজে। তিনি তো জানেন, কীভাবে তার স্বামী গরুগুলো পালতেন। চারটি গরুকেই তাই তারা সন্তানের মমতায় লালন-পালন করছেন। এত আদর ও ভালোবাসায় থেকে সেগুলো তাদের দেওয়া নামে ডাকলেই সাড়া দিচ্ছে। যখনই বলছেন, ‘সুন্দরী’ মাথা উঁচু করছে, লেজ নাড়িয়ে ডাক ছাড়ছে ওরা। গরুগুলোর পেছনে তাদের অনেক কষ্ট জমা হচ্ছে। প্রতিদিন পাইপ বা বালতিতে গরুকে গোসল করাতে হচ্ছে। খুব ঝক্কির কাজ। আবার সেগুলোর গা মুছে দিতে হচ্ছে লাল গামছায়। কারও নজর যেন না লাগে, সেজন্য আলাদা জায়গাতে ঘেরা দিয়ে গরুগুলোকে রাখা হচ্ছে। নজর লাগলে মীরকাদিমের বিখ্যাত গাভী বা ষাঁড় খেতে রাজি না হতে পারে, ওজন কমে যেতে পারে  শত শত বছর ধরে বিশ্বাস করছেন তারা। গোয়ালঘরে গরুর গোবরও পড়ে থাকতে দিচ্ছেন না, রোগ হতে পারে, তাতে তার শরীরে দাগটি লেগে যেতে পারে। তবে সালেহা বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল আসলে কেন গত পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে এই বিখ্যাত গাভী, ষাঁড়ের বাজার মন্দা।

গরুগুলোর দাম চড়েছে অনেক। ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও এক একটি ধবল গরুর বাছুর কিনতে খরচ হতো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এখন সেগুলোর এক একটির দাম বেড়ে হয়েছে ৫০ থেকে ৭০ হাজার। যাতায়াতের খরচ আছে। বাড়িতে এনে এক একটি ষাঁড় কি গাভীকে খৈল, ভুসি, চালের খুদসহ গম, ভুট্টা, খেসারির ভুসির মতো ভালো গোখাদ্য খাওয়াতে হয়।

 এক কি দুই ঘণ্টা পর পর প্রয়োজন মতো সেগুলো খায় তারা। প্রতিদিন গরুপ্রতি চার থেকে ছয়শ টাকা খরচ হয়। কিনে আনার পর এক বছরে ছয়শ টাকা দরে খাবারের পেছনে মোট ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা খরচ হয় গরুপ্রতি। এত টাকার খাবার, আদর-যতœ ও অমানুষিক পরিশ্রমের পর গরু বিক্রি করে তেমন কোনো লাভ থাকে না। আগে যেখানে মাঠ ছিল, বিল ছিল আশপাশে; শহর গড়ে ওঠায় ঘাস আর পাওয়া যায় না। বাজারের খাবারগুলোর দামও অনেক। প্রতিদিন গরুগুলোকে পশুচিকিৎসক দেখাতে হয়। সেই খরচও আছে। এসব দিয়ে, খাবারের দাম বাড়ায় ও ক্রেতার অভাবে আগের মতো লাভ নেই বলে পুরনো, বনেদি ও পূর্বপুরুষের এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন একে একে প্রায় পুরো মীরকাদিমবাসীই।

রহমতগঞ্জের হাটে যখন কোরবানির দুই দিন আগে তারা গরু নিয়ে যান, অনেক ক্রেতাই থাকেন। তবে তারা আড়াই, তিন লাখ দিয়ে গরু কিনতে রাজি হন না। যদিও জানেন, এই গরুগুলোর মাংসের তুলনা নেই। তখন দামে না পেরে অনেকে ফিরে যান ভারতীয় কি ভুটানি গরুর কাছে। সেগুলো একই আয়তনের, দাম অনেক কম থাকে। বাড়িতে এসে এবার চালিয়ে নাও দাম বেশি বলার পর তো আর পূর্বপুরুষের মতো এই গরুগুলো কেনা কেন হয়নি জানতে চান না স্বজনরা। ফলে দাম ও বাজার এমনকি ঐতিহ্যও হারাচ্ছেন পুরো বাংলাদেশের মানুষ। তারপরও তারা আছেন। জানেন, মীরকাদিমের গরু ফেরে না। বিক্রি হয়-ই। সালেহা বেগমের সন্তান মঞ্জুর হোসেন বললেন, ‘হাটে গিয়ে গরু পাবেন কি না- এই ভয়ে এবং ছেলেমেয়ে ও বাড়ির ছোট সন্তানরা এখনই গরুর জন্য বায়না ধরেছেন বলে আমাদের বাড়িতে গরু দেখা ও কেনার জন্য পুরনো ঢাকার ক্রেতারা এসে পড়তে শুরু করেছেন। তবে সবচেয়ে বড়, বেশ ভালো গরুর জন্য আমরা বলছি, আড়াই লাখ; বাকি তিনটির দাম ওজন ও আকার দেখে বলছি এক লাখ ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, কিন্তু সেই টাকায় এখনো রাজি নন ক্রেতারা। ফলে তারা ফিরে গেছেন।’

তারা পড়েছেন চিন্তায়। দামের বানবনা না হওয়ায় মীরকাদিমের গরুর খামারিদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তেমনই একজন আবদুল খালেক। টেঙ্গর পাড়াতে থাকেন। তার জীবনই ছিল রহমতগঞ্জের কোরবানির হাট ও মীরকাদিমের গরু নিয়ে। রমরমা জীবনে ৩০-৩৫টি গরুও পেলেছেন নামকরা এই মানুষটি। সন্তান স্নেহে যাদের বড় করেছেন, তারা তাকে সচ্ছলতা দিয়েছে; সন্তানদের মানুষ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে তিনি আর নেই। বয়সের ভারে মৃত্যুবরণ করেছেন। বসতবাড়ির পুরোটাই আলাদা গোয়ালঘর বানিয়ে একসময় তারা এক কোণে থাকতেন; সেই দিনও হারিয়েছে।

তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে একমাত্র চাঁদ সওদাগরই বাবার ব্যবসা ধরে রেখেছিলেন। তিনিও মারা গেছেন ১০ বছর হলো। তার সাত সন্তানের পাঁচজনই ছেলে। তারা মানুষের মতো মানুষ হয়েছেন। ফলে বাবার ব্যবসায় একমাত্র কামাল উদ্দিন ছাড়া কেউ আসেননি। এবার তিনি আর পারছেন না। মাত্র তিনটি গরু নিয়ে ব্যবসা করছেন। গেল বছরও পাঁচটি গরু পেলেছেন। লাভ কম, খাটনি অনেক বলে তারও চিন্তার শেষ নেই। গরু কেনার পেছনেই এবার তার খরচ হয়েছে ৯০ হাজার,  এক লাখ ১০ ও এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। ‘ভালো মানের বাছুরের দামও অনেক বেড়েছে’ লাল গামছাতে গরুকে মুছিয়ে বললেন কামাল। এখন এগুলো বিক্রি করে কেমন লাভ হবে তিনি আর জানেন না। ‘দিনে তো এক দেড় হাজার টাকা গরুদের পেছনেই চলে যাচ্ছে। দাম উঠবে আর কত’Ñপ্রশ্নটি করতে ভুললেন না। ‘পরিশ্রমের কথা বাদই দিলাম’ মনের কষ্টে বলে ফেললেন। তবে আশা এখনো ছাড়েননি, ‘পুরনো ঢাকার কয়েকজন বনেদি ব্যবসায়ী এসে আমার গরু দেখে গেছেন। তারা গরুগুলো পছন্দ করেছেন, কিন্তু দামে আরেকটু বনার অপেক্ষায় আছি। তাহলে ৯০ হাজারেরটি সব খরচ ও আমার শ্রম মিলিয়ে দেড় লাখে, এক লাখ দশেরটি এক লাখ ৭০ ও এক লাখ ৩০ হাজারের গরু দুই লাখ ১০-এ বিক্রি করতে পারব। আমার জীবন বাঁচবে, পেশাও থাকবে।’

গরুগুলোর জন্য আগের মতো জায়গা দিতে পারেন না তারা। গোয়াল ঘর নেই, কবেই গেছে; বসতবাড়ি হয়ে ছেয়ে গেছে পুরো পৌরসভা। বাড়ির পাশের ছোট একটি জায়গা এক কি দুই বা বড়জোর তিন শতাংশ জমিতে তারা গরু পালছেন। তাই পেলেও আর শান্তি নেই। এক বা দুটি গরুতে কি আর খুব বেশি লাভ হয়? দরকার হয় অনেকগুলো। তাতে শ্রম দিয়ে গরু বিক্রিতে লাভ বেশি, বাজারও ভালো থাকে। সেসব আফসোস এখন ঘুরে মরছে এই বিখ্যাত বেপারিদের বাড়িতে। ফলে শত বছরের ঐতিহ্যটি টিকে আছে ফকির চাঁন, কামাল উদ্দিন, মনির, মোস্তফা ও আনোয়ারদের মতো হাতেগোনা কটি পরিবারের বাড়িতে। বেঁচে থাকতেও এই পেশা ছাড়ার কষ্ট বুকে নিতে হয়েছে অনেককে।

৪০ বছর টানা মীরকাদিমের গরুর ব্যবসা করে দীন মোহাম্মদ মিয়া আর গরুতে নেই। গেল বছর থেকে টেঙ্গর এলাকার মানুষটি গরু নিয়ে থাকছেন না। বলেছেন, ‘১শ বছর ধরে আমরা সমাজে খুব সম্মানিত হয়ে আসছি। এই গরুর ব্যবসা আমাদের অর্থ, সম্পদ দিয়েছে; ছেলেমেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করতে পেরেছি। তারা লেখাপড়া শিখেছে। সমাজে এখনো আমাদের সম্মান করা হয়। তবে যাদের জন্য এই কষ্ট, সেই ছেলেমেয়েরা এখন আর গরুর ব্যবসায় যেতে দিতে চায় না। পরিবেশ, জায়গা নেই বলে মন চাইলেও থাকতে পারছি না। অন্যের বাড়িতে গরুগুলোকে দেখলে খুব কষ্ট হয়।’

তারপরও তার সঙ্গীরা রহমতগঞ্জ ও ঢাকাসহ সারা দেশের পত্রপত্রিকার শিরোনাম হতে চলে যাবেন এবারও রহমতগঞ্জের বিখ্যাত মীরকাদিমের গরুর হাটে। সেখানে মুহূর্তেই বা দিনে দিনে বিক্রি হয়ে যাবে তাদের প্রিয় গরুগুলো। বেপারিরা যদিও বেশি গরু নিয়ে যেতে পারবেন না। কারও সঙ্গে তিন, কারও বড়জোর পাঁচটি গরু থাকবে। হয়তো ৩৬টির বেশি গরু উঠবে না এই বিখ্যাত হাটে।