মরা চিড়িয়াখানা বাঁচল|159166|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
মরা চিড়িয়াখানা বাঁচল
নয়ন চক্রবর্ত্তী

মরা চিড়িয়াখানা  বাঁচল

দুর্গন্ধে ঢোকা যেত না, প্রাচীরই ছিল না সেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাকে লাভে আনা হয়েছে। দেশে প্রথম কৃত্রিমভাবে অজগরের ছানা ফোটানো হয়েছে। শিশুদের জন্য রঙিন দেয়াল করছেন। বেঁচে যাওয়া চিড়িয়াখানার গল্প বলছেন নয়ন চক্রবর্ত্তী; ছবি তুলেছেন হাবিবুর রব

চিড়িয়াখানা হলে মনের খোরাক মিটবে, শেখা হবে, গবেষণা চলবে। সবচেয়ে বড় বন্ধু শিশুরা বেড়াতে আসবে খুশিতে। ১৯৮৯ সালে তাই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা গড়ে তুললেন তখনকার জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান ও কজন অনুরাগী। টিকেটের দাম রাখলেন ‘১’ টাকা। ফয়’স লেকে ছয় একর জায়গায় ভালোই চলছিল। তবে একসময় সব থমকে গেল, চিড়িয়াখানা মরে যেতে লাগল। তেমন পশুপাখিও ছিল না। চিড়িয়াখানাকে বাঁচাতে ২০১৪ সালের জুনে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ চট্টগ্রামের নির্বাহী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মমিনুর রশীদ, জেলার সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম, চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও হাটহাজারী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন ও চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভকে চিড়িয়াখানার দায়িত্ব দিলেন। তারা সবাই দেখলেন, প্রধান আকর্ষণ ‘বাঘ’ নেই; খাঁচা নেই বলে বাইরে থাকে ‘হনুমান’। ৩শ প্রাণী থাকলেও না খেতে পেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। ওদের আবর্জনা পরিষ্কার করা হয় না, দর্শকরা নাকে রুমাল দিয়ে হাঁটেন। সীমানা প্রাচীরও নেই। বখাটেদের আড্ডা ছিল, ছিনতাই হয়। পশুপাখির খাবারের টাকা মেরে দেন কর্মচারীরা। ফলে চিড়িয়াখানা ভালো করতে বাড়তি শ্রম, শুক্র-শনিবারও অফিস করতে লাগলেন তারা সবাই। হিসাব রাখার নিয়ম চালু করলেন। জবাবদিহি শুরু হলো। দুর্নীতি করলে শাস্তি দেওয়া হতে লাগল। তাই লাভ হতে শুরু করল, দর্শক বাড়তে লাগল। তবে চিড়িয়াখানার উন্নতি আশপাশের খারাপ লোকেদের ভালো লাগল না। তারা তাদের মেরে ফেলতে চাইল। তারপরও শিশুদের জন্য ভালো চিড়িয়াখানা করবেন বলে তারা পেছালেন না। জেলা প্রশাসক সবসময় সাহায্য করলেন। বেদখল এক একর জায়গা তারা উদ্ধার করলেন। সেই মাটির গুণ পরীক্ষা করে তেমন প্রাণী ও গাছ আনতে লাগলেন। প্রশাসকের মাধ্যমে গ্যাস, পানির লাইন আনলেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করলেন। সাত একর জায়গায় সীমানা দিলেন।

পাশ ধরে পাহাড়ি পথে ফলের চারা রোপণ করলেন। রাইডের ফি ৬০ টাকা রাখা বন্ধ করলেন। আরও লাভে চিড়িয়াখানা উন্নত করতে লাগলেন। আলাদা ‘কিডস জোন’-এ অনেক রাইড করলেন। ২০১৭ সালের জুলাইতে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে চারটি ময়ূরী আনলেন, সে বছরের ৯ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৩৩ লাখ টাকায় কিনলেন দেশের প্রথম বিরল সাদা বাঘ, সুন্দরবনের বাঘ ‘রাজা’ ও ‘পরী’ আনলেন। তারা একসঙ্গে থাকে। রংপুর চিড়িয়াখানা থেকে সিংহীর বিনিময়ে সিংহ আনলেন। এ বছরের ৬ মার্চ বিদেশ থেকে উটপাখি, জেব্রা ও এমু পাখি কিনলেন। শিশুরা চিড়িয়াখানার প্রাণ বলে তাদের জন্য সিঁড়ি, হাঁটা পথ ও পাহাড় ঘেরা দেয়াল রঙিন করলেন। ঢুকলেই মন ভালো হয়ে যায়। ২২ লাখ টাকায় চিড়িয়াখানার পাহাড় ঘেরা আড়াই একর জায়গায় ৭৩০ ফুট লম্বা গাইড ওয়াল করলেন। তাতে বক, উটপাখি, ডাইনোসর, কচ্ছপসহ নানা প্রাণী ও পাখির ছবি আঁকলেন। ওঠা-নামার সিঁড়ি হলো। বছর দুই ধরে পাহাড়ে ১৪শ গাছ দফায় দফায় রোপণ করালেন। আট মাস ধরে চিড়িয়াখানা ও দর্শকরা খুশি হয়ে দেখেছেনÑ দোয়েল, মুনিয়া, বাবুই, টিয়াসহ নানা জাতের পাখি বাসা বাঁধছে, কলকাকলিতে আরও প্রাণ ফিরছে। তাদের জন্য কৃত্রিম বাসা তৈরি করছেন তারা। লেক তৈরি করবেন, মাছ ছাড়বেন। পেছনের পাহাড়ের মেছো বেড়াল, বাদুড়, শিয়াল ও মায়া হরিণ যেন আরও বেশি এ এলাকায় আসে, সেজন্য আলাদা পথ বানাবেন। বাড়তি বনবিড়াল, মেছোবেড়াল ও বাঘডাশ বনে ছেড়ে দেবেন। মাঝে মাঝে ওরা ঘুরতে আসবে। পাখিদের জন্য ৬০ ফুট লম্বা, ২৫ ফুট চওড়া বিরাট পাখিআশ্রম করেছেন। দেশের প্রথম এ নিবাসটি আছে প্রবেশপথে। তাতে হল্যান্ডের ১০ জোড়া রিং নেক প্যারট, ৫০ জোড়া লাফিং ডোভ, ৫০ জোড়া লাভ বার্ড, এক জোড়া ম্যাকাও; দেশি ১০ জোড়া ধনেশ, ৫০ জোড়া ঝুুঁটিদার কাকাতুয়া আছে। তারা ২০ থেকে ২৫টি ছানা দিয়েছে। টাইগার দম্পতি দুটি শাবক জন্ম দিয়েছে। নাম রেখেছেন ‘শুভ্রা’ (সাদা বাঘ) ও ‘জয়া’ (আমাদের বাঘ)। শুভ্রার ওজন ৮০ কেজি, বছর এক বছর। এত ভালো পরিবেশে অন্যরাও সন্তান জন্ম দিচ্ছে। মার্চের প্রথমে মা চিত্রা হরিণ দুটি শাবক জন্ম দিয়েছে। দেশে প্রথম মা অজগরের ডিমে ১১ ও ১২ জুন ইনকিউবেটরে (কৃত্রিম অনুকূল পরিবেশ যন্ত্র) ২৬টি ছানা ফুটেছে। ইনকিউবেটরটি ডা. শাহাদাতের নিজের তৈরি। গয়াল শাবক দিয়েছে। বিদেশ থেকে লাভের টাকায় ক্যাঙ্গারু, দুম্বা কেনা হবে। এখন চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় আছে ৬৭ প্রজাতির মোট ৬২০টি পশুপাখি। এত পাখি ও প্রাণীদের কাছে শিখতে স্কুল পোশাকে শিশুদের ছয় মাস ধরে বিনা টিকিটে চিড়িয়াখানা ঘোরার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এই পর্যন্ত তারা প্রায় দুই হাজার জন এসেছে। প্রকৃতি ভালোবাসছে, কোথাও পশুপাখি মারছে না। সুবিধাবঞ্চিতদেরও বিনা খরচে ঘোরার সুযোগ দেবেন। সাত একরেই পশুপাখির আশ্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। প্রাণী ও পাখি জাদুঘর করা হবে। সিংহ, সাম্বার হরিণ, কুমির ও বাঘের কংকাল সংগ্রহ করেছেন। সব দেখতে মাসে গড়ে ৬০ হাজার দর্শকের পা পড়ছে। প্রতি ঈদে আসছেন ৭০ হাজার। টিকিট ৫০ টাকা। বাতিল চিড়িয়াখানাকে অনেক লাভে এনে, ভালো করে তারা পাঁচজন দলগতভাবে ‘জনপ্রশাসন পদক-২০১৯’ পেয়েছেন।