সময় যখন ভাইরাল হওয়ার!|159220|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ আগস্ট, ২০১৯ ২১:৩১
সময় যখন ভাইরাল হওয়ার!
কবির হোসেন

সময় যখন ভাইরাল হওয়ার!

উন্নতি প্রযুক্তির ফলে নিমেষে আমাদের কাছে সব তথ্য এসে পৌঁছে যাচ্ছে। সুখের-দুঃখের, ঘরের-বাইরের সবকিছু এখন ফেইসবুকে ছড়ানো-ছিটানো। ফেইসবুকে এই ভাইরাল হওয়া কর্মকাণ্ডগুলো যেমন আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করছে, আবার একইভাবে এ ভাইরাল হওয়া কর্মকাণ্ডে আমাদের বিপদেও পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং সাম্প্রতিক কিছু বিপর্যয়ের জন্য ফেইসবুকে ভুয়া খবরের ভাইরাল হওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে।

ভালো বিষয় দিয়ে শুরু করা যাক। এখনকার ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া জনপ্রিয় মানুষটিকে হয়তো আমরা সবাই চিনি। তিনি হলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার সুমন। যিনি দেশের আনাচে-কানাচে সব দুর্ভোগ তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। মানুষের কল্যাণে নির্দ্বিধায় কাজ করছেন। ব্যারিস্টার সুমনের মতো আরো অনেক নিজেদের ভেরিফায়েড ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে লাইভে এসে নানা শিক্ষণীয় বিষয় সমাজকে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত, সচেতন করছেন সমাজের অসচেতন মানুষদের।

আবার হারিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েকে কিংবা হারিয়ে যাওয়া বাবা-মাকে ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া ছবি দেখে স্বজনরা খুঁজে পাচ্ছেন। এ কাজগুলো নিশ্চয়ই মানব কল্যাণের।

আবার দেখা যাচ্ছে, সামাজিক শিক্ষণীয় অনেক বিষয় নিয়ে অনেকে ফেইসবুক লাইভে এসে হাজির হচ্ছেন। এ সব শিক্ষণীয় বিষয় দেখে-শুনে অনেকে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করছেন। চলতে-ফিরতে সারাক্ষণ কাজে লাগাচ্ছেন। এ সব ভাইরাল বিষয়গুলো সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।    

অন্যদিকে যেসব ভাইরাল হওয়ার ছবি বা ভিডিও’র কারণে মানুষের ব্যক্তিজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসছে, সেগুলোর কথা যদি বলি, প্রথমে আসবে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা, একজন মডেল-অভিনেত্রীর সঙ্গে।

রাজধানীর মিরপুর এলাকায় চাচার সঙ্গে সম্পর্কে গর্ভবতী হওয়ার পর স্কুলছাত্রীর নবজাতকে জানলা দিয়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় ভুল কিশোরীর ছবি প্রচারিত হয়। অথচ ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া মেয়েটি একজন অভিনেত্রী ও মডেল।

দেখা গেছে, এই অভিনেত্রী ফেইসবুক লাইভে এসে বারবার বলছেন, আমার সঙ্গে কখনো এ রকম কোনো ঘটনা হয়নি। কে বা কারা আমার এ ছবি ব্যবহার করেছে, আমি কিছু জানি না।

পাঠক কী বুঝতে পারছেন তার অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে!

বর্তমানে ভাইরাল ট্রেন্ডের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কৌশল হলো লোকদেখানো মনোভাব। এখন লিডারশিপের চর্চাটাও ফেসবুকনির্ভর হয়ে পড়েছে। চকচকে, সুন্দর জামাকাপড় পরে বসের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সেলফি তুলে একগাদা প্রশংসা লিখে ব্যক্তিগত ফেইসবুক ওয়ালে শেয়ার করেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন আপনি অনেক কর্মঠ ব্যক্তি বা নিবেদিত প্রাণ।

শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল, তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও ভাইরাল শব্দটি ঢুকে গিয়েছিল। ভাইরাল হওয়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে সত্য আর মিথ্যাকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছিল। কোনটা আসল আর কোনটা নকল দেশবাসীর কাছে জগাখিচুড়ির মতো হয়েছিল।     

এদিকে রাত গভীর হলেই এক দল তরুণ-তরুণী নিজে ভাইরাল হওয়ার জন্য ফেসবুক লাইভে এসে হাজির হয়। তাদের উদ্দেশ্য শুধু শুধু বকবক করা। কাউকে ইমুর নম্বর দেয়, কাউকে বিকাশ নাম্বার দেয়। এ ভাইরাল হওয়া কথোপকথন শুনতে এবং দেখতে এক দল তরুণ-তরুণী রাত জেগে বসে থাকে ।

মাঝে মাঝে এমনও শোনা যায় বা দেখা যায় যে, কেউ কেউ নিজে নিজেই নানা অঘটন ঘটিয়ে নিজেকে ভাইরাল করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতারাতি সেলিব্রেটি হওয়ার জন্য।

একটা ঘটনা বলতে হচ্ছে ভাইরাল হওয়ার ঘটনা নিয়ে। গ্রামের এক যুবক নতুন ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। ফেইসবুকের যথার্থ ব্যবহার সঠিক পদ্ধতিটা ভালো করে জানা নেই ছেলেটির। নতুন ফোন, নতুন অ্যাকাউন্ট যাকে কাছে পাচ্ছে, সামনে দেখছে তারাই ছবি তুলছে।

হঠাৎ এক স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে সামনে পেয়ে ছবি তুলে ছেলেটির তার ব্যক্তিগত ফেইসবুকে ওয়ালে শেয়ার করেছে আনন্দে, খুশিতে এবং কিছু না বুঝেই। অথচ এই মেয়ের ছবি আশপাশের পাঁচ এলাকায় ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়া মেয়েটির বাবা-মায়ের কাছে নানা মানুষ নানা কথা বলতে শুরু করল।

ফলে তরুণীর বাবা-মা ছেলের বাড়িতে এসে হাজির। এই নিয়ে এলাকায় তুলকালাম সৃষ্টি হয়েছে। অথচ যে ছেলের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে মেয়ের ছবি শেয়ার করেছে, সে তখনো বুঝে উঠতে পারেনি সে কী কাজ করছে, ভালো না মন্দ।

আরো একটি উদাহরণ দিলে আরো ভালো করে বোঝা যাবে। এক লোক নতুন স্মার্ট ফোন কিনেছেন। সেই ব্যক্তির ছেলেমেয়ে শখ করে বাবাকে ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছে। বাবা বেচার নতুন জগতে ঢুকে  রাত-দিন সারাক্ষণ ফেইসবুকে পড়ে থাকে। ছেলেমেয়ের ছবি, স্ত্রীর ছবি, যখন যাকে কাছে পাচ্ছেন তারই ছবি তুলে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেইসবুক শেয়ার করছেন।

এমনকি কারও কারও ব্যক্তিগত ইনবক্সেও ছবি পাঠাচ্ছেন। এসব কারণে বেচারার পরিবারে অশান্তি নেমে আসল। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মারামারিও হয়েছে কয়েকবার। তারপরও বাবা বেচারা ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছেন না ফেইসবুকে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ।    

সাম্প্রতিক ভাইরাল হওয়া আরেক ঘটনা ছেলেধরা। হঠাৎ ছেলেধরা শব্দটি ভাইরাল হলো। ফলে যেখানে-সেখানে ছেলেধরা সন্দেহে ভালো মানুষ থেকে শুরু করে মানসিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধী সবাইকে গণধোলাই দেওয়া হলো। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা পৃথিবীতে আরও কোথাও আছে কি না জানা নেই ।

আমরা মানুষ তবে ভালো মানুষ কয়জন? আমরা অন্যকে বোঝাই তবে নিজে বুঝি কয়জন? কেউ ভালো কাজ করতে এগিয়ে আসলে নিজের স্বার্থে এই ভালো মানুষটিকে সমাজে বিতর্কিত করার চেষ্টা করি। আমরা তখনই বুঝি যখন ঘটনা ঘটে যায়। নিজের চোখে না দেখে বা না শুনে কারও প্রতি মন্তব্য করা উচিত না। একইভাবে সন্দেহবশত কাউকে দোষ দিয়ে বিপদে ফেলা উচিত না। এ বিষয়গুলো আমরা জেনেও জানি না।

তাই চাই ভাইরাল হোক সমাজের সব ভালো কাজ। অসংগতিকে তুলে ধরেন। কোনো সহিংসতা যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার না হয়, ভাইরাল না হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখা এখন প্রয়োজন।

সহিংসতা দূর হোক সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে। ইতিবাচক বিষয়গুলো চর্চা হোক, মানবতার জয় হোক।

লেখক: সংবাদকর্মী।