কাশ্মীরের অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়|160882|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১০ আগস্ট, ২০১৯ ২০:১৫
কাশ্মীরের অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়
হাবীব ইমন

কাশ্মীরের অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়

কাশ্মীর নিয়ে আমার এত আদিখ্যেতা নেই। জানি যে,  দীর্ঘ সময় থেকে ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে একটি জটিল সংকট সেখানে রয়েছে। আমার আন্তর্জাতিক জগতে জ্ঞানের স্ফিয়ার খুব দুর্বল। কাজেই এ বিষয়ে কথা বলাটা হবে মূর্খের মতোই। তবুও মূর্খের মতো দু-চারটে বলার চেষ্টা করছি।

বলতে পারেন, কেবলই মানবিক এবং অসাম্প্রদায়িক চিন্তা থেকে তাদের নিয়ে আমার যতটুকু আদিখ্যেতা। অবশ্যই কাশ্মীর মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল। কিন্তু আমার বোঝাপড়া মুসলমান বা হিন্দু কোনোটাতে নেই। প্রথমত তাঁদের আমি ‘মানুষ’ হিসেবে বিবেচনায় আনতে চাই।

গণমাধ্যমে কাশ্মীরের শিশুদের ওপর যে অত্যাচার ফুটে উঠছে তাতে আমি ভীষণ শঙ্কিত। কতটা অমানবিক চিত্র সেখানে!

ইতিহাস বলে, ১৯২০ সালে কাশ্মীরের শেষ হিন্দুধর্মাবলম্বী মহারাজা হরিসিংহের আমলে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীই দাবি করেছিল যে, এমন ব্যবস্থা করা হোক, যাতে সমতলের হিন্দুরা এসে তাদের চাকরি নিতে না পারে। এখন এই ব্যবস্থা বাতিলের ভেতর দিয়ে যা অর্জিত হবে, তার মডেল হচ্ছে, ইসরায়েল কর্তৃক অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় বসতি স্থাপন।

তাহলে কাশ্মীরবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হাফসা কাঞ্জোয়ালের ভাষ্যে একে বর্ণনা করা যায়, ‘ভারতের সেটলার-কলোনিয়াল প্রজেক্ট’ ( সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট)। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহদের এ প্রবণতা আমরা এর আগে আসামের ক্ষেত্রেও দেখেছি। কিন্তু তাদের পক্ষে এটা করা সম্ভব?    

৮ আগস্ট ২০১৯ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি বলেছিলাম, ‘আমার প্রেডিকশন : কাশ্মীরের মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবে না। ওরা একদিন স্বাধীন হবে।’

এটা ভীষণ সচেতনভাবে বলেছি। এই স্ট্যাটাসে আমার কিছু ভারতীয় এবং বাংলাদেশে জন্ম নেয়া সেটেলার ভারতীয় বন্ধুরা দারুণ শক্ড। তাদের শক্ডকে আমি সহানুভূতি জানাই। তারা যে একটা ভুল মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় পড়ে রয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। ভারত বলেন, পাকিস্তান বলেন কিংবা চীন অন্তর্ভুক্ত কাশ্মীরের লড়াই আজ না, এ লড়াই তাদের দীর্ঘদিনের। সত্তর বছরের অধিক সময় ধরে তাদের এ লড়াই। গত ত্রিশ বছরে কমপক্ষে ৩০ হাজার কাশ্মীরিকে প্রাণ দিতে হয়েছে। কাশ্মীর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতির এলাকা বা মিলিটারাইজড জোন হিসেবে পরিচিত। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীদের আচরণ দখলদার বাহিনীর মতোই।  

নানাভাবে তাদের ওপর নিপীড়ন সেখানে চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ লড়াইটা কঠোর হয়ে উঠছে সাম্প্রদায়িকতার জায়গায়। ওরা মার খাচ্ছে। মরে যাচ্ছে।  ভারত ক্রমশ একটা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দেশ হয়ে উঠছে। এটা ভারতের জন্য অচিরেই মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াবে। কাশ্মীরে যা ঘটছে ও ঘটবে, কাশ্মীরের জনসাধারণ বা সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্যই নয়, এর মধ্য দিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী কর্তৃত্ববাদের বলয় শানানো হচ্ছে। গত কয়েক বছরে ঘৃণা-বিদ্বেষের চাষাবাদ করা হয়েছে, তার পরিণতিতে গোরক্ষকদের তাণ্ডবে, জয় শ্রী রামকে হিংসাধ্বনিতে পরিণত করার মধ্যে দেখতে পেয়েছি।

রাষ্ট্র সেখানে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। কাশ্মীরের সঙ্গে যে ভূরাজনৈতিক সংকট চলছে, তা কেবল সাম্প্রদায়িকও নয়, আরেকদিকে দখলদারির ঔপনিবেশিক বৈরী টানাপোড়েন।

কত দিন এ মার খাওয়া, মরে যাওয়ার চিত্র কাশ্মীরে চলবে! ওদের ভবিষ্যৎ আসলে কোথায়? গায়িকা মৌসুমী ভৌমিক লিখেছেন, ‘অন্ধকার সময় চিরস্থায়ী নয়।’

আমিও তাঁর সঙ্গে একমত। প্রশ্নটির উত্তর এখনই পাওয়া যাবে না। তবে এ প্রশ্নটির উত্তর এ রকম করে ভাবলে অবান্তর হবে না, নিজেদের প্রয়োজনে, জাতি স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে মার খাওয়া, মরে যাওয়া চিত্রটাই ওদের সাহস দেবে। শক্তি হয়ে উঠবে প্রতিরোধ্যে। ওদের দাবায়ে শেষ পর্যন্ত রাখা যাবে না। ফ্যাসিস্ট এবং বর্বরতা কোনো কাঁটাতারে আটকে রাখতে পারবে না। কাশ্মীর একদিন স্বাধীন হবে। ওদের স্বাধীনতা যৌক্তিক। এটা তাঁদের বাঁচার জন্য।

শোষণ-নিপীড়ন আর কয়দিন চলতে পারে!

উগ্র জাতীয়বাদ, ধর্মোন্মদনা, কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যবাদী মনোভঙ্গি বিজেপি ও তার বন্ধুরা, নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ মনে করতে পারেন যে, রাজ্যের মর্যাদা লোপ করে দিয়ে, বিশেষ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তারা ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের ইন্টিগ্রেশনের- ভারতের সঙ্গে একীভূতকরণের সাফল্য লাভ করলেন, তারা তাদের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পালন করে রাজনৈতিক শক্তি দেখালেন।

হয়তো তারা ভাবছেন ভারতের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদের বৈশ্বিক একটি শক্তি। নানা কারণে ভারত চীনের সঙ্গে সরাসরি শত্রুতার অবস্থান নিচ্ছে না।

এ কথা ভুলে যাওয়া চলবে না, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা আধিপত্য বিস্তারে পাকিস্তান মার্কিন প্রশাসন ও চীনের আরো কাছাকাছি। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিসমূহ সব বিষয়ে এক ধারায় চলে না। এ জায়গাতেও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব খুব তীব্র হয়ে উঠবে। ভারতের একজন কমিউনিস্ট নেত্রী বৃন্দা কারাতের বক্তৃতা আমাকে আন্দোলিত করে। তিনি বলেছেন, ‘শুধু বন্দুক ও বুলেট দিয়ে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা যায় না।’  

বিজেপি কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভারতীয়দের যে মানসিক বন্ধন, তা ছিন্ন করলেন। ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণকে তাঁদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে উসকে দিল। কাশ্মীরের রাজনীতি চলে গেল স্বাধীনতাপন্থীদের দখলে।

[পাকিস্তান একদিন বাংলাদেশের ওপর এইরকম চিত্রটা তৈরি করেছিল, কিন্তু সেই চিত্রটা দীর্ঘ লড়াইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাল্টে গেছে। পরাধীনতা বেশি দিন টেকে না।]

হাবীব ইমন : লেখক, যুবনেতা।