৩০ জুলাই অঝোরে কেঁদেছিলেন বঙ্গবন্ধু|161326|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
৩০ জুলাই অঝোরে কেঁদেছিলেন বঙ্গবন্ধু
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব

৩০ জুলাই অঝোরে কেঁদেছিলেন বঙ্গবন্ধু

ফরিদপুরের সঙ্গে স্টিমারে কলকাতার ভালো যোগাযোগ ছিল। একবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এসেছিলেন। তখন শেখ মুজিবুরের স্কুলের ছাদ ছিদ্র হয়ে গেছে, বৃষ্টিতে পানি পড়ত। মুজিব তাদের বললেন, স্কুলের ছাদ নষ্ট হয়ে গেছে। ক্লাস করা যায় না। তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রী। তারা তো অবাক, একজন সেভেন-এইটে পড়–য়া ছেলে সাবলীলভাবে দাবির কথা তুলে ধরল! সোহরাওয়ার্দীকে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে মানা হয়। তবে মুজিব রাজনীতি শিখেছেন তিনজনের কাছে। কৃষকদের জন্য, গরিবদের জন্য, শিক্ষার জন্য শেরে বাংলার যে দরদ ছিল, সেটা শেখ মুজিবের হৃদয়কে স্পর্শ করে। এমনও হয়েছে যে, কলকাতা গেছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রিপোর্ট দিচ্ছে যে, শেখ মুজিব একজন হিন্দু বিধবা ও তার ছেলেকে নিয়ে শেরে বাংলার বাড়িতে হাজির হয়েছেন। তিনি ফিরে আসার পর শেরে বাংলাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, মুজিব তো আমার নাতির মতো। আমি তাকে খুব স্নেহ করি। সে কিছু বললে না করতে পারি না। হিন্দু বিধবার ছেলেটি মুজিবের সঙ্গে পড়ে। তারা অনেক গরিব। মুজিব তাকে নিয়ে এসেছিল একটি চাকরির জন্য। আমি তাকে একটি চাকরি দিয়েছি।

আরেকজন হলেন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তার কাছে যেতেন, তার কথাবার্তা শুনতেন। অপরজন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। স্বদেশী আন্দোলনের সময় মুজিব মনে করেন যে, এর মধ্যেই বাংলার মেহনতি মানুষের মুক্তি। দেশ স্বাধীন হলে তাদের জন্য কিছু করা যাবে। ওইভাবে তিনি দীক্ষিত হয়ে গেলেন। খুব সম্ভবত ১৯৩৭ সালে বঙ্গবন্ধু সুভাষ চন্দ্রের বাড়িতে যান। যখন দেখা করে বের হন, তখন গোয়েন্দারা জানতে চাইল তার কাছে কেন গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি সুভাষ চন্দ্র বসুর আদর্শের একজন বিশ্বস্ত কর্মী। সুভাষ চন্দ্রের আদর্শ ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতকে স্বাধীন করা এবং সমাজতান্ত্রিক ভারত প্রতিষ্ঠা করা।

১৯৫৭ সালে সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হলে শেখ মুজিব খুব আপত্তি করেছিলেন। তখন থেকে মুজিব সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে থেকেছেন বটে, কিন্তু আগের মতো শ্রদ্ধা ছিল না। ১৯৬২-৬৩ সালে দুটি বড় ঘটনা ঘটে। নেহরুকে শেখ মুজিব চিঠি লিখেন। চিঠিতে তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ স্বাধীনতার সংগ্রাম করছি। আপনারা কতটুকু সাহায্য করতে পারবেন? ভারত তো চীনের কাছে হেরেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পথে যদি আপনারা সাহায্য করেন, তাহলে ভারতের হারানো সম্মান ফিরে পাবে। নেহরু ওই চিঠির তেমন কোনো জবাব দিতে চাননি তিনটি কারণে। পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে কাশ্মীর সমস্যা শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত ভয় পায় যে, পূর্ব বাংলা স্বাধীন হলে তার পুরো দোষ ভারতের ওপর পড়বে। তারা এই বদনামটা নিতে চায়নি। আর চীনের কাছে মার খাওয়ার পর বাঙালিরা দেশ স্বাধীনের জন্য যুদ্ধ শুরুর পর ভারত সাহায্য করলেই যে সফলতা আসবে, তা তিনি মনে করেননি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলÑ নেহরু মনে করতেন যে শেখ মুজিব সুভাষ বসুর লোক। নেহরু সুভাষ বসুকে একদমই দেখতে পারতেন না। নেহরু সম্ভবত জানতেন যে সুভাষ বসু তখনও বেঁচে আছেন। যদি সুভাষ বসু বেঁচে থাকেন আর শেখ মুজিব বাংলাদেশ স্বাধীন করে ফেলেন, তাহলে তারা এক হয়ে যাবেন। আমি বেকায়দায় পড়ে যাব। এসব কারণে নেহরু ৬ মাস সময় নিলেন চিঠির উত্তর দেওয়ার জন্য।

তখন শেখ মুজিব অধৈর্য হয়ে আগরতলা গেলেন। মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী সঙ্গে গেছেন, তার কাছ থেকে শুনেছি। বঙ্গবন্ধু ট্রেনে শ্রীমঙ্গল গিয়ে নেমে গেছেন। মোয়াজ্জেম তাকে নিয়ে আগরতলা গেছেন। সচিন সিংহ মুজিবকে বললেন যে, তোমাকে আরও বড় নেতা হতে হবে। লন্ডনে গিয়ে প্রবাসী সরকার করা ফলপ্রসূ হবে না। যে মুহূর্তে তুমি বাংলাদেশ ছেড়ে যাবা, দেশের মানুষ তোমাকে ভুলে যাবে। এটা কার্যকর পরামর্শ ছিল। মুজিব দেশে এসে দল শক্তিশালী করা শুরু করলেন এবং ছয় দফা প্রণয়ন করলেন। লাহোরে ঘোষণা করার কারণ হলো, বঙ্গবন্ধু আজীবন মনে করেছেন যে, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ কখনই পাকিস্তানে থাকতে চায় না। পাঞ্জাবিদের দাপট তারা মানতে চায় না। তাই বঙ্গবন্ধু সব সময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ছয় দফার পর পাকিস্তান সরকার অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। আগরতলার খবরটা তারা তখন পেল। মামলা হলো। ফলাফল আমরা সবাই জানি।

এত উচ্চমানের নেতা হলেও একমাত্র পাইপ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর সব কিছুই ছিল সাধারণ বাঙালির মতো। পাইপটা কোথা থেকে নিছেন, তা আমি জানি না। কোনো এক ব্রিটিশ রাজনীতিকের কাছে দেখে তার ভালো লেগেছে। পাইপ এবং বিশ্বের সবচেয়ে দামি তামাক খেতেন বঙ্গবন্ধু। হিরন্ময় বা এ ধরনের নাম, তামাকে ছিল খুবই সুগন্ধ। এছাড়া পায়জামা, পাঞ্জাবি হোক বা অন্য কিছুÑ সবই ছিল সাধারণ বাঙালির মতো। টেংরা, পুঁটি, পাবদা, সাদা ভাত, ডাল, করলা, মলা আর সবজি ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খাবার। সব সময় এগুলো দিয়ে খেতে দেখেছি।

একটা ব্যাপারে খুব সাবধান ছিলেন। বাঙালির বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার কোনো দরকার নেই। কারণ, বাঙালি ছিল পাকিস্তানের ৫৬ ভাগ। বিচ্ছিন্নতাবাদী হলে পশ্চিমারা হবে। ৭ মার্চে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা করলে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলা যেত। তাই তিনি সবই বললেন, কিন্তু আমরা স্বাধীন হয়ে গেছিÑ তা বলেননি। তাই এখনো পাকিস্তান ভাঙার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হঠকারিতাকে সারা বিশ্বে দায়ী করা হয়। তখন অ্যাডমিরাল আসাদ ছিলেন গভর্নর, আর ইয়াকুব ছিলেন মার্শাল ল’র প্রশাসক। ৭ মার্চ সকালে তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, আমাদের ওপর হুকুম হলো, তুমিও স্বাধীনতার ঘোষণা করবা, আমরা ওপর থেকে এমনভাবে বোমা বর্ষণ করব যে লাখ লাখ লোক মারা যাবে। তাতে হয়তো ভয়ও পাইছিলেন।

৭ মার্চের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বলেছেন, আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব। আর বঙ্গবন্ধু বলেছেনÑ রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। ইনশাল্লাহ বলেছেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক হলেও গভীরভাবে মুসলমান। তোমাদের রক্ত না, আমি রক্ত দিয়ে তোমাদের স্বাধীনতা দেব। এই ঋণ কিন্তু আমরা এখনো শোধ করতে পারিনি। কিছু অপরাধীর শাস্তি হয়েছে।

পূর্ব বাংলা থেকে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, ততদিনে পশ্চিমারা তা পেয়ে গেছে। সেজন্য তারা পূর্ব পাকিস্তানে বড় ধরনের ইস্টাবলিশমেন্ট না রাখার পক্ষে ছিল। কিন্তু যদি ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হয়, মুসলমানরা যাতে হেরে না যায়, সেজন্য এখানে ৯৫ হাজার সেনা সদস্য রেখেছিল। এদের ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানিদের। তাই আলোচনা আলোচনা খেলা খেলছে। বঙ্গবন্ধু তা বুঝতে পেরেছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, এভাবে এটা করবা, গান্ধীর কাছে যাবে। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে যখন দেখলেন ইয়াহিয়া খান আক্রমণের ঘোষণা দিয়ে চলে গেলেন, তখন তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দিলেন। তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে একটা অস্বাভাবিক বিতর্ক আছে। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা কিন্তু অনেক লোকে শুনেছে, কিন্তু ব্যাপকভাবে শুনেনি। সেই ঘোষণাটা চট্টগ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হান্নান সাহেব করলেন। তখন দেখা গেল সেনাবাহিনীর একটা প্রভাব তো আছেই। জিয়াউর রহমান তখন যুদ্ধজাহাজ সোয়াতকে খালাস করতে যাচ্ছিলেন। মেজর রফিক তাকে আটকে এদিকে নিয়ে আসছেন। তাই জিয়াউর রহমান বাইচান্স মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন, হয়তো মনেপ্রাণেও ছিলেন। কিছু উপলক্ষ আছে, যাতে মনে হয় জিয়াউর রহমান মনেপ্রাণেই এটা চাচ্ছিলেন। প্রথম ঘোষণায় তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলেন। সেটা কেউই গ্রহণ করল না। পরে তিনি শেখ মুজিবের পক্ষে ঘোষণা দিলেন এবং মুজিবের পক্ষে অনেক বক্তব্য রাখলেন। এতে মনে হয় তিনি বাইচান্স মুক্তিযোদ্ধা নন।

বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেন। জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে গেল। তিনি দালাল আইন করলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল করলেন। ১৭ হাজার মামলা হয়েছিল। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনে দোষীদের ছাড়া বাকিদের তিনি সাধারণ ক্ষমা করে দেন। গোলাম আযম, শফিউল আযমসহ ৮ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করেন। কেউ কেউ বলছেন যে, ১৫০-১৭০ জনের সাজা হয় এই আইনে। পরে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। গোলাম আযমকে ১৯৭৭ সালে ভিসা দিলেন। তিনি পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে দেশে এসে নাগরিকত্ব ফেরত চেয়ে মামলা করলেন। ১৯৮১ সালে তাকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হলো। মামলার বিচারকম-লীর মধ্যে বিচারপতি হাবিবুর রহমানও ছিলেন। গোলাম আযমের বাংলাদেশের জন্মের কথা বিবেচনা করে হয়তো তিনি ওই রায় দিয়েছেন। তিনি এই রায় না দিলে জামায়াতের অস্তিত্ব থাকত না, বিএনপি এত শক্তিশালী হতো না। জিয়াউর রহমান দায়মুক্তি অধ্যাদেশ করেছেন, এটাকে আইনে রূপান্তর করেছে খন্দকার মোশতাক। তার শেষ সময়ে জেল হত্যা করে খুনিরা বাইরে চলে গেল। এরশাদ ক্ষমতায় এসে তাদের ফেরত আনলেন। তারা ফ্রিডম পার্টি করল। দুঃখের বিষয় হলো, বেগম জিয়া কুমিল্লার চান্দিনা আসন থেকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কর্নেল রশিদকে জিতিয়ে আনলেন। তাকে বিরোধীদলীয় নেতা করা হলো। একইভাবে এরশাদ ১৯৮৮ সালে খুনিদের একজনকে দিনাজপুর থেকে জিতিয়ে এমপি বানান।

১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই শেখ হাসিনা তার পুত্র, কন্যা ও রেহানাকে নিয়ে যখন দেশের বাইরে চলে যান, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সেদিন যেভাবে কাঁদতে দেখেছি, এর আগে কোনোদিন তাকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি। তার মনে হয়তো আসছিল যে আর তাদের দেখতে পারবেন না। বেগম মুজিবও কেঁদেছেন অজোরে। সেদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘বাবারে মনে হয় আমার মেয়েটা এই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে গেল।’

আমি তখন উপসচিব। কাজ করি অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে। নজরুল ইসলামকে শিল্পে নিয়ে যান, বিসিকের ডিরেক্টর করেন। আবার তাজউদ্দীন সাহেবকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিয়ে আসেন। তখন বঙ্গবন্ধুর সচিবালয়ে দুজন একান্ত সচিব ছিলেন। প্রথমজন মাহে আলম সাহেব। তিনি বেঁচে আছেন। আরেকজন ছিলেন এ এম নুরুল ইসলাম। মাহে আলম সাহেব চলে গেলেন, সেখানে মশিউর রহমান আসলেন। নুরুল ইসলাম একটি চাকরি নিয়ে ওয়াশিংটনে চলে গেলেন। তখন খুব সম্ভবত মশিউর রহমান পরামর্শ দিয়েছিলেন আমাকে নেওয়ার ব্যাপারে। যেদিন উপসচিব হয়ে স্বাভাবিকভাবে আমি বদলি হই, সেদিনই বিকেল ৩টায় ডেকে পাঠালেন পুরনো গণভবনে। গেলাম, কদমবুচি করলাম। আপাদমস্তক তাকালেন। টিটকারি দিলেন। তুমি কি পোলা, ছাত্র ইউনিয়নের পোলা। আর ছাত্রলীগ এত পছন্দ করে। ব্যাপারটা কি? আমি বললাম, স্যার এটা তো তাদের ব্যাপার। তখন বললেন, শেখ মনিও বলে তোমার কথা, সিরাজুল আলম খানও বলেন, রাজ্জাকও বলে। বললাম, হয়তো নীতির প্রশ্নে অটল আছি, সৎ আর সাহসীÑ সে কারণে হয়তো ওনারা বলেন। ব্রিফিং দিলেন। কিন্তু কথা শেষে যে কথা বললেন, তখন তার চোখে কিছুটা অশ্রু। ততদিনে স্বাধীনতার দেড় বছর হয়ে গেছে। বললেন, ‘এখানে অনেক বড় বড় লোক আসে। তুই আমার সঙ্গে তাদের দেখা করিয়ে দিস বা না দিস, তাদের কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু অনেক গরিব দুঃখী লোক আসবে। গ্রামের লোক আসবে। অনেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিতে আসবে, বাবা তুই তাদের ফিরিয়ে দিস না। কারণ, আমি ছাড়া এই পৃথিবীতে তাদের আর কেউ নাই। আমি বিশ্বস্ততার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেছি। বঙ্গবন্ধুর কত যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িতে গিয়ে স্পেশাল ফান্ড থেকে টাকা দিয়ে আসছি, তার কোনো ঠিক নেই। গোপনে তার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করানো হয়েছে তোহা সাহেবকে, সবুর খান সাহেবের পরিবার-পরিজনকে। আমরা ছদ্মবেশে এনে এনে দেখা করিয়েছি। তিনিও চাইতেন যে তাদের সঙ্গে দেখা হোক। কারণ, তিনি তো জাতির পিতা।

সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো যে, প্রথম যখন মওলানা ভাসানীর কাছে নিয়ে গেছি সন্তোষে, তখন বঙ্গবন্ধু অনেক খাবার-দাবার, কাপড়-চোপড় নিয়ে গেছেন। দেখে মওলানা খুব খুশি। মওলানাকে বঙ্গবন্ধু হুজুর বলতেন। ‘ও মুজিব। আহ। মনে রাখবা, আমাকে ব্যস্ত রাখবা সব সময়। নইলে তোমার পেছনে লাগব।’ বঙ্গবন্ধু খুব উপভোগ করে বললেন, ‘আপনার যখন যা চায়, বলবেন।’

একদিন বঙ্গবন্ধু খেতে বসছেন। আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘এখানে বয়। কি খাইছোস বাবা আজকে।’ খুব সাহস করে বললাম, স্যার আপনার এই শাসনামলে আমাদের বেতনের ২০ ভাগ কেটে ফেলা হয়। ৮০ ভাগ বেতনে চলি। আমি যেহেতু কাজ করি, তাই বাড়িতে আমাকে এক বেলা ভাত আর দুই বেলা রুটি খেতে দেওয়া হয়। বললেন, ‘আজকে তো গোস্ত নাইরে, ছোট মাছ।’

একদম চোখের সামনে দেখলাম, পুলিশ বাহিনী বলছে, ডিসি যে এসপির গোপনীয় এসিআর বা গোপন প্রতিবেদন লেখে, এটা উঠিয়ে দেওয়ার অনেক চেষ্টা হলো। বঙ্গবন্ধু আমাদের সামনেই বারবার তাদের ফিরিয়ে দিয়ে বলেছেন, যারা উর্দি পরে তাদের নিয়ন্ত্রণ উর্দি ছাড়া লোকের হাতে থাকতে হবে। কিন্তু জিয়াউর রহমান পুলিশের দাবি মেনে নেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের দুই বছরের সিনিয়রিটি দেওয়ার দাবি এসেছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু বলতেন, তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে কি টাকার জন্য, সম্পদের জন্য, সিনিয়র গ্রেডের জন্য? যদি টাকা চায়, জমি লিখে দাও, গাড়ি দিয়ে দাও, ফ্ল্যাট লিখে দাও। কিন্তু দুই বছরের সিনিয়রিটি দেওয়া মানে তারা দুই বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছে। আমি তা করতে পারব না। এটা খোদার ওপর মাতব্বরি করা হবে।

একটা ঘটনা ইদানীং মশিউর রহমানের কাছে শুনেছি। উত্তরা গণভবনে গেছেন বঙ্গবন্ধু। আজীবনের জন্য জেল হওয়া একজন মুসলিম লীগ নেতা যিনি সাংঘাতিক অত্যাচারী ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। তাকে জেলখানা থেকে আনা হলো। প্রশাসন খুবই উসখুস করতেছিল। আসার পর আর যায় না। আমরা তখন বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, রাত হয়ে গেছে, ওনি আর কতক্ষণ থাকবেন। তখন বললেন, ওর সাজা মাফ হতে যতক্ষণ লাগে, সে এখানে থাকবে। তখন বঙ্গবন্ধুকে বলা হলোÑ সে আজীবন সাজাপ্রাপ্ত। হয়তো তিনি বললেন, মুজিবের কাছে যে আসে, তার সাজা থাকে না। কোথাও কোথাও একটু বাড়াবাড়ি হয়েছে, কিন্তু তার মানবিকতার এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনেক। শাহ আজিজুর রহমান ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পড়তেন। বেকার হোস্টেলে একসঙ্গে থাকতেন। পরবর্তীকালে সাংঘাতিক শত্রুতা করেছেন। কিন্তু তার পরিবারকে সহায়তা করেছেন বঙ্গবন্ধু।

১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী যখন আত্মসমর্পণ করল, ১৯ বা ২০ তারিখ ভুট্টো নিউইয়র্ক থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হন। ভুট্টো সাহেব বলে পাঠিয়েছেন যে, শেখ মুজিবকে কখনো ফাঁসি দিবা না। এটা সম্ভবত বিশ্ব নেতৃত্বের চাপে হয়েছে। তিনটা কারণে ভুট্টো এটা করেছেন। রাজনীতিবিদদের অন্য রাজনীতিকদের প্রতি দরদ থাকে। আর শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখা না গেলে ৯৫ হাজারকে ফেরত নিতে পারবে না। তৃতীয় কারণ হলো, শেখ মুজিব সাড়ে ৯ মাস জেলে ছিলেন। তিনি অনেক কিছু জানেন না। তাই তার কাছ থেকে যদি কনফেডারেশন গঠনের প্রতিশ্রুতি নিতে পারেন। পাকিস্তান থেকে লন্ডনে তিনি যখন নামলেন, তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা হেরাল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। তাদের কাছে একটা প্লেন চান বঙ্গবন্ধু। সবাই অবাক হয়ে বলছেন, কেন? তুমি পাকিস্তানের প্লেনে আসছো, ইন্ডিয়ান এয়ারওয়েজের প্লেনে যাবে, সেটা রেডি আছে। তুমি প্লেন চাচ্ছো কেন? বঙ্গবন্ধু বলছেন, আমি চাইছি, তোমরা দিবে কি-না, বলো। তখন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটি বিমান দিতে রাজি হয় তারা। ভারতীয়রা ওই সময় সজাগ হয়ে বলে যে, ব্রিটিশ বা ইন্ডিয়ান এয়ারওয়েজ আসলেই রিস্কি। তাই ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি বিমান দেওয়া হয়। এতে কি প্রমাণ হলো? বঙ্গবন্ধু বলেছেন, পাকিস্তান থেকে যখন আসি, তখন আমি স্বাধীন ছিলাম না। লন্ডনে আসামাত্র আমি স্বাধীন। তাই আমি আমার জাতীয়তাবাদ অনুযায়ী নিজের পছন্দ ব্যবহার করি।

অনেকে বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করেছেন যারা পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করেছে তাদের চাকরি পুনর্বহাল করায়। বঙ্গবন্ধু বলতেন, সাড়ে তিনজন মানুষ নিয়ে দেশ চালানো যাবে না। এরা নিজের ইচ্ছায় পাকিস্তানে চাকরি করে নাই। সবারই তো পরিবার আছে। কিন্তু অবশ্যই বলতে হবে যে, তার হৃদয়বান গুণটা সবক্ষেত্রে যে সঠিক ছিল, তা নয়। পাকিস্তান-ফেরত সশস্ত্র বাহিনীর লোকদের ফিরিয়ে নেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তাকে যারা জিগাইছে, তিনি বলতেন, বাঙালি তো ক্ষমা করে নাই। একবার ক্ষমা করে দেখা যাক, কী হয়।

একবার একটা ফাইল নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ হয়। মন্ত্রীর নাম বলতে চাই না। সচিব তখন মনিরুজ্জামান সাহেব। মনিরুজ্জামান পাকিস্তানি মতাদর্শের বলে প্রচার ছিল। কিন্তু সিভিল সার্ভেন্টরা খুবই নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেন। ওই ফাইল মুজিব ভালোভাবে পড়ে দেখেন পুরো দোষ মন্ত্রীর। সচিবের কথা সমর্থন করে ওইদিনই মন্ত্রীর দপ্তর বদল করে দিলেন তিনি।

আমি শেখ মুজিবের একান্ত সচিব-২, মশিউর রহমান একান্ত সচিব-১। মশিউর রহমান ফাইল বেশি দেখতেন। আমি তার ব্যক্তিগত দিক ও সফরগুলো বেশি দেখতাম। মনোয়ারুল ইসলাম নামে একজন ছিলেন, যিনি জীবনে কখনো দ্বিতীয় হন নাই। বেছে বেছে তাকে এনে যুগ্ম সচিব করে সরকারি কেনাকাটার দায়িত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরে সরকারি কেনাকাটায় এক পয়সারও দুর্নীতি হয়নি। যতদূর মনে পড়ে, একদিন জাহাজ কেনার বিষয়ে একটি ফাইল আসছে। বঙ্গবন্ধু মনোয়ার, মনোয়ার বলে ডাকছিলেন। উনি ওইদিন ছুটিতে ছিলেন। পরে উচ্চস্বরে আমাকে ডাকলেন। গেলাম। বললেন, মনোয়ারকে তো পাই না। ফাইলটা পড়তো। যদি মাথায় কিছু ঢুকাতে পারিস, তাহলে এসে বলবি যে ঠিক আছে। আর না বুঝলে একটা ড্রয়ারে তালা দিয়ে রাখবি। মনোয়ার কাল আসলে তার কাছে দিবি। কিন্তু অমুক অমুক যেন জানতে না পারে। তার সচিবালয়ের লোক যে চোর, এটা উনি জানতেন। অমুক অমুক বলে যাদের নাম বলেছেন তাদের নাম মুখে আনার সাহস আমার নেই।