সেনা পাহারায় শেষ ছবির প্রিন্ট|161331|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
সেনা পাহারায় শেষ ছবির প্রিন্ট

সেনা পাহারায় শেষ ছবির প্রিন্ট

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তাদের ছবিগুলো কারা তুলেছিলেন? কীভাবে তুলেছিলেন? কীভাবেই বা প্রিন্ট হয়েছিল? সেই দুঃসহ স্মৃতির সাক্ষী এ ওয়াসে আনসারীর জবানে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আমার আত্মীয়। তার সবচেয়ে ছোট বোন খাদিজাকে বিয়ে করেছেন আমার চাচা শ^শুন সৈয়দ হোসেন। তিনি এই নামে পরিচিত হলেও পুরো নাম সৈয়দ সায়ীদ হোসেন। যুগ্ম সচিব পদে অবসর নিয়েছেন। ফলে আত্মীয়তার সূত্রে বঙ্গবন্ধুর তিনি বোনের জামাই। বিদ্বান লোক ছিলেন, এলাকার লোক হিসেবেও শেখ সাহেবের নজরে পড়েছেন। তাদের বিয়ে ১৯৭০ সালে। এরপর থেকে ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বিখ্যাত বাড়িটিতে আমাদের পারিবারিক সূত্রে আরও বেশি যাতায়াত শুরু হলো। আমার শাশুড়ির সঙ্গে বেগম মুজিব  শেখ ফজিলাতুন্নেছার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। শেখ সাহেবের ছেলের জন্মদিনে, তাদের বাসার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছবি তুলতে আমন্ত্রিত হতাম। আগেই তো স্বাধীনতার আন্দোলনে তিনি, ভুট্টো, ইয়াহিয়া খানের বৈঠকের ছবিগুলো মোহাম্মদ আলম, আফতাব আহমেদ, রশীদ তালুকদারসহ আমরা তুলতাম। তখন দৈনিক আজাদের আলোকচিত্র সাংবাদিক। শেখ মুজিব আমাকে ‘ছোকড়া’ বলে ডাকতেন। আলাদা চোখে দেখতেন, ছবি তুলতে দিতেন। নিজে ডেকে নিয়ে কী তুলেছি বলে দেখতেন।

প্রধানমন্ত্রী হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের, তখন গণভবনের ভেতরের পুকুরের পাশে সিঁড়িতে বসে আমার সঙ্গে আলাপ করতেন। এতই গভীর ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক হলো। ততদিনে তার প্রতাপশালী রক্ষী বাহিনী তৈরি হয়েছে। এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারপরও বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের, সাধারণ মানুষকে খুব আপন করে নিতে পারতেন এই পুরনো গুণটি বরাবরই দেখেছি। একদিন আলাপ প্রসঙ্গে বলে ফেললেন, ‘অনেকে দেখি অনেক কথা বলে। উল্টোপাল্টা বলে; তাহলে আমি লাল ঘোড়া দাবড়াই দিব।’ তিনি তার হাতের লাঠিটি তুলে কথাগুলো বলেছিলেন। পরে জিজ্ঞেসও করেছিলেন, ‘ছবিটি কোথায় ব্যবহার করবি?’ তবে তখনো রাষ্ট্রপতি যেভাবে চলেন, তাকে সেভাবে চলতে দেখিনি। কোনো সময় কারও এই বিষয়ে পরামর্শ নিতেন না। বললেই বলতেন, ‘কী মুশকিল, আমাকে কিমেরে ফেলবে? আমাকে মেরে ফেলার সাহস কি বাঙালির আছে?’ পরে সেটিই হলো। সারা জীবন মনে হয়েছে, তিনি মানুষ হিসেবে অসম্ভব সুন্দর একজন মানুষ ছিলেন। এমন ভালো মানুষ দেখা যায় না। তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। ভালোবাসার মতো মানুষ ছিলেন। তবে তার ও বাঙালির জীবনের সবচেয়ে দুঃখময় স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছি। তখন ১৯৭৫। আজাদ থেকে এসেছি সরকারি পত্রিকা দৈনিক বাংলায়। আমাদের ফটোগ্রাফি বিভাগের প্রধান তখন গোলাম মাওলা। তিনি এখন প্রয়াত।

সেদিন শেষ রাতে, ভোর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রপতি সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজীবন সদস্য করা হবে, সংবর্ধনা দেওয়া হবে। তবে রেডিও শুনে দেখি, একটি কণ্ঠস্বর ভাসছেÑ ‘আমি মেজর ডালিম বলছি, স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে। স্বৈরাচারী সরকার এখন আর নেই। আপনারা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারবেন।’ বারবার এই কথাগুলোই বলছেন। ভয়ে বাড়ি থেকে বেরুলাম না। বারবার রেডিওতে শুনলাম, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ভোর হচ্ছে। সকাল সাতটা সাড়ে সাতটার দিকে গুঞ্জন শুরু হলো। সবাই হতবাক! অসম্ভব ঘটনা কীভাবে ঘটল? এরপর গেলাম কর্মস্থলে। সেখানে মাওলা ভাই, আমি, কামরুজ্জামান আলোকচিত্র সাংবাদিক। একটু পর আর্মির গাড়ি এলো। একজন ড্রাইভার ও একজন আর্মি অফিসার। তারা সেনাবাহিনীর পোশাক পরে অফিসে এসে মাওলা ভাইকে বললেন, চলেন, আমাদের সঙ্গে চলেন। তিনি ক্যামেরা হাতে নিয়ে তাদের সঙ্গে গেলেন। ফিরে এসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ভয়ংকর বিবরণ দিয়েছিলেন। তাদের হাতে স্টেনগান ছিল এবং তারা তাক করে বলেছিলেন, একটি একটি মানুষের একটি একটি করে ছবি তোলেন। তিনি সবার আলাদা ছবি তুলেছেন। ছবি তুলতে তুলতে দুপুর। অফিসে ফিরে এলেন এবং বমি করতে লাগলেন। পুরো পরিবেশের বিবরণ দিলেন। বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা লাশ সিঁড়িতে পড়ে আছে। শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামাল সবার কথাই বললেন। বেগম মুজিব বিছানার পাশে লাশ হয়ে পড়ে আছেন, মায়ের কাছে রাসেল, শেখ কামাল তার ঘরে সুলতানা কামালের সঙ্গে পড়ে আছেন। এসবের কিছুই কিন্তু আমার স্ত্রী জানতেন না। তিনি কেবল খবরটি রেডিওতে শুনে বলেছিলেন, ‘বেগম মুজিব তাহলে বিধবা হয়ে গেলেন।’ কিন্তু তাদের পুরো পরিবার যে প্রায় শেষ হয়ে গেছে এই খবর কিন্তু জানেন না। পরে শুনেছিÑ রেডিওতে তারা বলেছেন, শেখ মুজিবের পরিবারের শয়তানগুলোকে আমরা শেষ করতে পেরেছি। মাওলা ভাই আমাকে বললেন, আনসারী ওরা সব ছবি প্রিন্ট করে নিয়ে নেবে। আমার শরীর কাঁপছে, সবগুলো ছবি তোমাকে বানাতে হবে। সব ছবি দৈনিক বাংলার অফিসে ডেভেলপ করতে নিয়ে গেলাম। দুইজন আর্মি অফিসারও এলেন। তারা সামরিক পোশাকে আছেন, স্টেনগান হাতে। বললেন, আমরা ছবি নিতে এসেছি। বললাম, ছবি বানাতে হবে। বললেন, আমাদের সামনেই বানান। বললাম, রুমে তো অন্ধকার থাকবে। তারপরও তারা সেখানে থাকতে জোরাজুরি করছিলেন। তারা হালকা নীল আলোতে রুমে বসে আমার সামনেই ছবি ডেভেলপ করা দেখলেন। আমাদের ডার্করুমে কিন্তু বসার জায়গাও নেই। তারা দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সামনেই ফুল সাইজ ছবি একটি একটি করে তৈরি করে প্রিন্ট করলাম। তারা সবগুলো নেগেটিভও নিয়ে গেলেন। বলেছিলাম সাহস করে, ‘নেগেটিভ তো আমাদের।’ তবে তারা সেগুলোও নিয়ে গেছেন। একটি ছবি নিচে ফেলে দিয়েছিলাম। তারা বলেছিলেন, ‘কী ফেললেন?’ বলেছি, ‘এটি তো নষ্ট হয়ে গেছে।’ ‘আমরা নষ্টটাও নেব। দিন।’ পরে তুলে দিতে হয়েছে। সবগুলো ছবি মুড়িয়ে তাদের শেষ বার বলেছিলাম, ‘দিন হিটারে দিয়ে দিই। তাহলে ছবিগুলো উজ্জ্বল হবে।’ কিন্তু তারা করতে দেননি। মুড়িয়ে সব ছবি নিয়ে গেলেন। তবে আমাদের অফিসের কেউ এই নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। কবি শামসুর রাহমান তো নিরীহ ধরনের মানুষ। যদি অন্য কিছু ঘটে যায়Ñ এই ভয়ে তাদের কারও কোনো কথা ছিল না। দৈনিক বাংলা তখন সবচেয়ে ভালো বেতন দেয়।

দুই দিন পর তারা মাওলা ভাইয়ের খোঁজে এলেন। বলেছেন, আপনি ছবি বাইরে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে জীবনের পরোয়া না করে তিনি চিৎকার করলেন, ‘সব ছবি আপনারা নিয়ে গিয়েছেন, কে বাইরে ছবি দিয়েছে?’ তিনি তাদের সঙ্গে তুমুল চোটপাট করলেন। তারা কোনো উত্তর করতে না পেরে চলে গেলেন।      

অনুলিখন : ওমর শাহেদ