চামড়ার দাম নিয়ে কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর|161623|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
চামড়ার দাম নিয়ে কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর
ফিরোজ আহমেদ

চামড়ার দাম নিয়ে কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর

বাংলাদেশে এমন একটা সময় ছিল (৮০-এর দশকেই) পত্রিকা খুলে নিয়মিত দেখতে পেতাম রাতের আঁধারে গোয়ালঘরে গরু জবাই করে ফেলে রেখে চামড়া খুলে নেওয়া হয়েছে। এমন সংবাদ অজস্র ছাপা হতো যে, গোয়ালঘরে রাত কাটিয়ে কৃষক গরু পাহারা দিচ্ছেন, কিংবা গরুটাকে নিজের ঘরেই রাখছেন চামড়াচোরদের ভয়ে। ভাবা যায়, ৮০-এর দশকে মানুষ ৭০০ টাকা দামেও চামড়া অহরহ বিক্রি করত, যখন মাংসের কেজি ৪০ টাকা ছিল! চামড়া দিয়ে যা যা বানানো হয়, সবকিছুর দাম বেড়েছে। চামড়ার জুতো, চামড়ার ব্যাগ, চামড়ার বেল্ট, চামড়ার জ্যাকেটের রমরমা বাজার। বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য চামড়াজাত বিবিধ বস্তু। তাহলে চামড়ার দাম কেন এবার পানিতে নামল? পত্রিকা সূত্রে আমরা যা যা জানি, তাতে কোনো একক সিদ্ধান্তে এখনো আসা যায়নি। বলা হয়েছে, রীতিমতো জোট বেঁধে সিদ্ধান্ত নিয়ে আড়তদাররা ঠকিয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে পথে বসিয়েছেন তৃণমূলের মৌসুমি কারবারিদের এবং বঞ্চিত হয়েছেন দরিদ্র মানুষ, এতিম শিশু আর উৎপাদকরা। একটি দৈনিকে হিসাব করে বলা হয়েছে, অন্তত ৫০০ কোটি টাকা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর হাত থেকে চলে গেল আড়াইশ আড়তদারের পকেটে। প্রশ্নগুলোকে একটা একটা করে ভাবা যাক।

১. চামড়া কি এত বেশি উৎপাদন হয়েছে, যে প্রতিযোগিতার কারণে দাম পড়ে যাচ্ছে?

উত্তর হলো, না। এমনকি ট্যানারি মালিকদের কল্যাণে যা জানা যায়, তা হলো, দেশে উৎপাদিত চামড়া দিয়ে তারা মাত্র কয়েক মাস চলতে পারেন। বাকি সময়ে তাদের চামড়া আমদানি করতে হয়। ফলে দেশে গবাদি পশুর সংখ্যা, কোরবানির সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও চামড়াশিল্পের চাহিদার ধারেকাছে তা এখনো নয়। এই দাম কমানো হয়েছে রীতিমতো জোট বেঁধে, পরিকল্পনা করে, গরিব ও অক্ষম মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ঠকানোর জন্যই।

২. ঠকিয়েছেন কারা?

নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে বেশি দায়ী আড়তদাররা, যারা লবণ মাখানো চামড়া মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেনেন। চামড়ার দাম তারা এ বছর গত বছরেরও অর্ধেক দিতে চেয়েছেন দিনের বেলা। আর রাতে যখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে অসহায় খুদে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে, যারা অনেকেই ধারদেনা করে পুঁজিটা জমিয়েছেন, তখন চামড়ার দাম আরও কমে যায়। দুপুরে যে চামড়ার দাম ৪০০ টাকা দিতে চাওয়া হয়েছিল, রাতে তা ২০০ টাকাতেও কিনতে রাজি হননি আড়তদাররা।

৩. আড়তদারদের যুক্তি কী?

পত্রিকাসূত্রে সমিতিভুক্ত আড়তদারদের সংখ্যা প্রায় ২৫০ জন। তাদের বক্তব্য হলো, প্রায় তিনশ কোটি টাকা তাদের পাওনা ট্যানারিগুলোর কাছে। ট্যানারিগুলো এই টাকা দিচ্ছে না বলে তারা টাকার অভাবে চামড়া কিনতে পারেননি এবং কোনো পত্রিকাতেই এই ভয়াবহ অভিযোগটির বিষয়ে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কোনো জবাব মেলেনি। এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, দরিদ্র মানুষগুলোর রক্তপাতে ট্যানারি মালিকদেরও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

৪. আড়তদারদের মুনাফার পরিমাণ কী?

মর্মান্তিক বিষয় হলো, বাংলাদেশে খোদ উৎপাদক সর্বদাই সবচেয়ে কম মুনাফা করেন। তাদের সংখ্যা বিপুল, তাদের বিনিয়োগ বেশি এবং তাদের পণ্যের সংখ্যা কম। ফলে ন্যায্যত মুনাফার সবচেয়ে বড় ভাগটা তাদের কাছেই আসার কথা। অন্যদিকে যার বিনিয়োগ কম, পরিমাণ বেশি, পণ্যপ্রতি তার মুনাফা তুলনামূলক কম হলেও সর্বমোট মুনাফা বিপুল হওয়ার কথা। ঠিক উল্টোটাই বাংলাদেশে ঘটে। পত্রিকাসূত্রেই জানা গেল, ৪০০ টাকা দামে কসাইয়ের কাছ থেকে যে চামড়াটা আড়তদার কেনেন, তাতে প্রতিটিতে তিনি মুনাফা করেন কমবেশি ৮০০ টাকা! এ হিসেবে এবারের কোরবানির বাজারে ৪২ লাখ গরুর চামড়া থেকে তাদের মুনাফা হওয়ার কথা প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা।

৫. এই কাণ্ডে ট্যানারি মালিকদের কি লাভ হওয়ার কথা ছিল?

প্রত্যক্ষ ঘাতক যদি আড়তদাররা হয়ে থাকেন, ট্যানারির মালিকরাও বসেছিলেন একটু দূরে। অপেক্ষা পরবর্তী ধাপের জন্য। আড়তদাররা কোটি কোটি মানুষকে বঞ্চিত করে এবং হাজার হাজার মাঠঘাটের মৌসুমি ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে সস্তায় চামড়াখানা জোগাড় যন্ত্র করে দেবেন। ফলাফল, খুব মোটা দাগের একটা হিসাবে, পত্রিকার সূত্রগুলোকেই যদি ঠিক ধরি, সাধারণ মানুষকে ঠকানো ৫০০ কোটি টাকা কম দিয়েই আড়তদারদের জন্য সাড়ে তিনশ কোটি টাকার মুনাফার বন্দোবস্ত করে ট্যানারির মালিকরা পেয়ে যেতেন তাদের কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় চামড়া।

৬. চামড়া রপ্তানির ফলাফল কী হতে পারে?

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, তাদের শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। সেটা পুরোপুরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। কারণ তারা নিজেরাই বারবার বলেছেন, আমদানি করা চামড়ার ওপর তারা নির্ভরশীল বছরের অধিকাংশ সময়। তবে স্থানীয় বাজারভিত্তিক এবং/অথবা ক্ষুদ্রকায় চামড়াশিল্পের ওপর নিশ্চয়ই বড় আঘাত আসবে। কিন্তু, প্রশ্নটা বরং এই যে, এখন চামড়া রপ্তানি করে কি এতিম শিশুটির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে? কিংবা যে মৌসুমি কারবারি এটাকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছিলেন, তার কোনো উপকার হবে? এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে খারাপ একটি দৃষ্টান্ত, কারণ এখন চামড়া রপ্তানি মানে একতরফা লাভটি আড়তদারের পেটেই যাবে। ট্যানারি মালিক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কিন্তু তাকে শায়েস্তা করা কি সরকারের অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্য হবে, বা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে?

৭. ট্যানারি মালিকরা কেন উদ্যোগী নন?

তারা নিজেরা সরাসরি চামড়া কেনেন না, এটুকু বলেই তারা খালাস, পাঁচ হাত ঘুরে তাদের হাতে চামড়া আসে বলে তারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী না এই হলো তাদের বক্তব্যের সারমর্ম।

৮. কেন তারা নিজেরা চামড়া কেনেন না?

এটা একটা রহস্য। ভেবে দেখুন, যে ট্যানারি মালিকরা হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্প যারা গড়েছেন, তারা নিজেরা কেন শুধু কোরবানির মৌসুমেই প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ভাগ আড়তদারদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন? কেন তারা নিজেরাই দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে মৌসুমি কারবারিদের কিংবা মাঠকর্মীদের মাঠপর্যায়ে নিয়োগ দেন না? এতে কয়েকটা উপকার হতে পারত। চামড়া নষ্ট হতো না, প্রশিক্ষণ আর প্রযুক্তির গুণে। মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত থেকে বড় অংশের রেহাই মিলত, ফলে হাজার হাজার মৌসুমি কারবারিকে বেশি মুনাফা দেওয়া যেত, মানসম্পন্ন চামড়া মিলত। অন্যদিকে দেশজুড়ে বছরব্যাপী চামড়া সংগ্রহেও অগ্রগতি হতো বিপুল। ভাবুন দেখি, তারা একবারে যে টনকে টন লবণ কিনতেনÑ যেটা মৌসুমি ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নাÑ তাতেই খরচটা বেশ খানিকটা কমে যেতে পারত। তারা স্থাপন করতে পারেন আধুনিক হিমাগার ও সংরক্ষণাগার। তারা ব্যাংক নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করতে পারতেন সহজেই। বস্তুত সব শিল্পের মালিকরাই চেষ্টা করেন কাঁচামাল পর্যায় পর্যন্ত

যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে যেন থাকে। চামড়ার বেলায় এটা খুব সহজ এবং খুব বিরাট প্রযুক্তির বিষয়ও এটা না। এটা কেন করেন না ট্যানারি মালিকরা, সেই রহস্য ভেদ করতে হলে আমাদের তাই হয়তো আরও কিছু তথ্য-উপাত্ত আর পরিসংখ্যান লাগবে, লাগবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। আপাতত যেটা সন্দেহ করা যায়, সেটা হলো চামড়াশিল্পে বৃহৎ ট্যানারিগুলো এত বিপুল মুনাফা করছে যে, সম্মিলিতভাবে ওই (মাত্র) কয়েকশ কোটি টাকার খরচ বাঁচানোর বিষয়ে তাদের মাথাব্যথা সামান্য।

৯. ট্যানারি শিল্প হুমকিতে পড়বে?

চামড়া রপ্তানির ঘোষণায় অধিকাংশ ট্যানারি বন্ধ কেন হবে না, তার ব্যাখ্যা আশা করি পাঠক এরই মধ্যে পেয়েছেন। রপ্তানির মতো প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে চামড়া কিনলেও তাদের ব্যবসায় মুনাফা কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু হুমকিতে পড়বে না। তারপরও, তাদেরই দায়িত্ব হবে চামড়ার জন্য একটা প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করা, নিজেরাই চামড়া সংগ্রহ করা, সংরক্ষণাগার স্থাপন করা। ট্যানারি শিল্প এখন আর কোনো শিশু শিল্প নয়। যথেষ্ট অভিজ্ঞতা তার হয়েছে, যথেষ্ট পুঁজিও এই খাতের ব্যক্তিদের আছে। বিকশিত শিল্প বলেই অবশ্য তাকে আমরা কোনো অন্যায় প্রতিযোগিতার মুখেও ফেলতে চাই না। কিন্তু বিকশিত শিল্পের কাছে মানুষের স্বাভাবিক, যা প্রত্যাশা থাকে, তাও পূরণে তাকে সচেষ্ট হতে হবে। মুনাফার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা করা যায়, সমমানের ভারতীয় ও বাংলাদেশি জুতোর একটা তুলনা করলে, বাংলাদেশে এই দাম দেড় থেকে কখনো প্রায় দ্বিগুণ। ট্যানারি শ্রমিকের মজুরি দুই দেশে কাছাকাছি (যদিও শ্রমিকের জীবনযাপন ব্যয় বাংলাদেশেই বেশি) এবং ট্যানারির পরিবেশ দূষণবিষয়ক আইনকানুন বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে বহু গুণ কঠোর বলে উৎপাদন ব্যয় ভারতেই বেশি হওয়ার কথা। আমরাও অবশ্যই চাইব দেশীয় ট্যানারি শিল্পের আরও বিকাশ ঘটুক। অবশ্যই, ট্যানারি হাজারীবাগের মতোই সাভারের নদীগুলোকে ধ্বংস করছে, তার থেকে দেশবাসীকে রেহাই দিয়ে এবং দ্বিতীয়ত, ট্যানারি বর্জ্যকে দেশে মুরগি ও মৎস্য খাতে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বন্ধ করে। অর্থাৎ ট্যানারির তরল ও শক্ত সব ধরনের বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত কিংবা শোধন করতে হবে।

১০. এই অপচয়ের মূল্য নাগরিকদের কাছে কি?

শুধু দরিদ্র মানুষ আর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত নন, পুরো রাষ্ট্রের কাছেই এটা রীতিমতো উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। আমরা দেখলাম, অর্থমন্ত্রী প্রশ্ন করছেন, ‘চামড়ার বিষয়টাও সরকার দেখবে?’ কেন দেখবেন না, তাই বরং প্রশ্ন। দেশের অন্যতম উন্নয়নশীল একটি শিল্প, যার আরও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তার বিষয়ে ভাবাটা তো দায়িত্ব হওয়ার কথা। অন্যদিকে লাখো উৎপাদকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাটা সরকারের ন্যূনতম কাজ। এর আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপচয়। যেমন শুধু চট্টগ্রামের কথাই ভাবুন, সেখানকার সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী মঙ্গলবার একটি দৈনিকে মন্তব্য করেন, ফেলে যাওয়া চামড়ার সংখ্যা এক লাখ হবে। এক লাখ। অবিশ্বাস্য একটি সংখ্যা। এবারের কোরবানির পর চামড়া পুঁতে ফেলার, রাস্তায় ফেলে যাওয়ার সংবাদ দেশজুড়েই এসেছে। সত্যি বলতে কী, চামড়াকে নিখুঁতভাবে সাবধানে আলাদা করতে বিশেষ একটু বাড়তি শ্রম দিতে হয়। চামড়ার দাম যদি হয় ৩০০ টাকা, সেই শ্রম পোষাবে না। ফলে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চামড়া পরিণত হবে একটি বর্জ্য হিসেবে। যদি শুধু প্রকৃতির দিক থেকে চিন্তা করা যায়, এই বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া যে খাদ্য-পানি-বায়ু-জ্বালানি-শ্রম এবং অন্যান্য সম্পদে গঠিত হয়েছে, এভাবে তা অপচয় করাটা প্রকৃতির প্রতি রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। যেন বাতাস-পানি সুলভে মিলেছে বলে তাকে ধ্বংস করা! মুফতে পাওয়া গেছে বলে মূল্যবান একটা সম্পদকে মাটি চাপা দিতে হয় যে দেশে, সেই অঞ্চলে প্রকৃতির অভিশাপ লাগবে, আগে কিংবা পরে। যেকোনো সম্পদের, যেকোনো পণ্যের, পরিবেশের যেকোনো উপাদানের বিনিময় মূল্যই একমাত্র মূল্য নয়, তার প্রকৃত মূল্যটার কথাও ভাবতে হবে।

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]