সড়কে ঈদের বিষাদ|161627|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
সড়কে ঈদের বিষাদ

সড়কে ঈদের বিষাদ

আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও প্রতি বছর দুর্ঘটনার কারণে বিষাদে পরিণত হয় ঈদ উৎসব। ঈদের ছুটি শেষে আসছে একের পর এক দুর্ঘটনার সংবাদ। যারা দুর্ঘটনার কারণে স্বজন হারান, তারাই বোঝেন দুর্ঘটনাগুলো কত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। এমনিতেই প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ পালনের উদ্দেশে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘর ছেড়েছিলেন, তাদের যাত্রা নানা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে গেছে। মহাসড়কে যানজটের কমতি ছিল না, বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে। ঈদের পরে দুর্ঘটনার হার বেড়ে গিয়েছে। ঈদের আগে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন, নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু ফল একই, সড়কে ব্যাপক মানুষের প্রাণহানি এবং ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহন।

গত বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ২০ জন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে আরও ১৫০ জন, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঈদের ছুটির তিনদিনে সড়কে প্রাণ হারায় আরও ২৪ জন। এই নিয়ে গত চার দিনে ৪৪ জনের প্রাণ গেল। সরকারি হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। অবশ্য যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এই সংখ্যা আট হাজার। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে যানবাহনের অতিরিক্ত গতির কারণে। আর ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য তিনটি কারণকে দায়ী করেছেনÑওভারস্পিড, ওভারটেকিং এবং যানবাহন ও রাস্তার ত্রুটি। অন্যদিকে বুয়েটের এআরআই-এর পরিচালক মিজানুর রহমান বলেছেন, ঈদের পরে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাব। সাধারণত ঈদের আগে সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা তৎপরতা থাকে। কিন্তু ঈদের পর এটি শিথিল হওয়ায় যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা বাড়ে। ঈদে নগর পরিবহনের অনেক বাস দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এসব বাসের ফিটনেস থাকে না এবং চালকদের বেশিরভাগই অনভিজ্ঞ। একই রাস্তায় কম ও বেশি গতির গাড়ি চললে কম গতির গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস না পাওয়ার পেছনে রয়েছে চালকের লাইসেন্স প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে যানবাহনের ফিটনেস সনদ, গাড়ির অনুমোদন, সড়কের ত্রুটি, সঠিক তদারকির অভাবসহ নানা কারণ।

২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর জন্য সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গঠন করা হয়েছে ‘ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন’। কিন্তু তারপরও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ৩২ লাখ রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত গাড়ির বিপরীতে অবৈধ চালকের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। দেশের বিভিন্ন সড়কে ২৬০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আজও সরলীকরণ হয়নি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এবং সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্দেশনাগুলো হলোÑ দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প চালক রাখা, একজন চালকের পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো, চালক ও তার সহকারীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি করা, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা বা সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবহার এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কতটা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়েছে তা দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা দেখলেই বোধগম্য হয়।

অতি দ্রুত সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে যে মানুষটি মৃত্যুবরণ করেন, তিনি রেখে যান তার পরিবারের বুকফাটা কান্না। বহু মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাই সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করার জন্য সব পরামর্শ ও সুপারিশ কাজে লাগানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। এ ব্যাপারে শৈথিল্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।