লাশের সঙ্গে রাখা হয়েছিল : রুমা|162539|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
২১ আগস্টের ভয়াল সেই দিনের কথা
লাশের সঙ্গে রাখা হয়েছিল : রুমা
আলাউদ্দিন আরিফ

লাশের সঙ্গে রাখা হয়েছিল : রুমা

‘স্পিন্টারের অসহ্য ব্যথা। মনে হয় দা-বঁটি বা ব্লেড দিয়ে পা দুটা কেটে ফেলি। এই ব্যথা আর সহ্য হয় না। এই যন্ত্রণা সহ্য করার চাইতে সেদিন মরে যাওয়াও অনেক ভালো ছিল।’ চোখের পানি ছেড়ে কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আহত রাশেদা আক্তার রুমা। গ্রেনেড হামলায় ৫০ বছর বয়সী রুমার দুই পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশ-বিদেশে দীর্ঘ চিকিৎসাতেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। দুই পায়ে কয়েক হাজার স্পিøন্টারবিদ্ধ। তার ডান পায়ে এখনো দগদগে ক্ষত। গত সোমবার দুপুরে রুমা পুরান ঢাকার মাজেদ সরদার রোডে মায়ের বাড়িতে কথা বলেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে।

‘ওইদিন আইভী রহমানের পাশেই ছিলাম। প্রথম একটি গ্রেনেড আমার পাশে বিস্ফোরিত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারাই। জ্ঞান হারানোর আগে আমি হাত নেড়ে সাহায্যের জন্য আবেদন করেছিলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। পরে নিজেকে দেখি বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে’, হামলার বিষয়ে বলেন রুমা।

“জ্ঞান হারানোর পর পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে মৃত ভেবে লাশের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী ও মিরপুরের আওয়ামী লীগের নেত্রী চায়না সেখানে আমাদের দেখতে যান। চায়না সাবের ভাইকে ডেকে বলেন, ‘আমি এই মহিলার হেঁচকি শুনতে পেয়েছি। তিনি জীবিত।’ পরে সাবের হোসেন চৌধুরীর চেষ্টায় আমাকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আমার দুই পা কেটে ফেলার কথা বলেন চিকিৎসক। কিন্তু ওই সময় শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর ভাই বলেন, ‘আমি উনাকে চিনি। তিনি পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগের নেত্রী। উনার পা না কেটে চিকিৎসা করেন।’ পরে চিকিৎসকরা আমার পা না কেটে কয়েকটি অপারেশন করেন। ভেঙে গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যাওয়া পায়ের হাড্ডিগুলো জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন”, যোগ করেন তিনি।

রুমা জানান, তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার ইচ্ছাতেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তিনি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট দুপুর ১টার দিকে নাজিমউদ্দিন রোডের বাসা থেকে মহিলা আওয়ামী লীগের শতাধিক কর্মীসহ মিছিল নিয়ে বংশালের সুরিটোলা স্কুল মাঠে যান। সেখান থেকে মিছিলসহ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে যান। তিনি অবস্থান করেন মঞ্চের পাশেই। যেখানে আইভী রহমান ও মেয়র হানিফসহ অনেক লোকজন ছিলেন।

“গ্রেনেড বিস্ফোরণ হওয়ার এক মিনিট আগে পাঞ্জাবি পরা এক যুবক সবার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে ভেতরে ঢুকতেছিল। আমি তাকে বললাম, ‘তুমি এদিক দিয়ে কেন যাচ্ছ? তুমি ওই দিকে যাও ছেলেদের ওখানে।’ তখন ওই ছেলে নিজেকে র‌্যাবের লোক পরিচয় দিয়ে বলে, ‘ওই যে মার্কেটের ওপর থেকে আমাকে বলেছে, এখানে দাঁড়াতে।’ আমি আইভী আপাকে বললাম, ‘দেখেন আপা, ছেলেটা জোর করে এখানে ঢুকছে।’ তখন আমি ওপরে তাকিয়ে দেখি র‌্যাবের পোশাক পরা কিছু আছে। আমি আর তাকে কিছু বলিনি। ওই ছেলে কী যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে এক মিনিটের মধ্যেই সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গ্রেনেড বিস্ফোরণ হতে থাকে। প্রথম যে বিস্ফোরণ হলো, এরপর আমি জ্ঞান হারাই। অনেকক্ষণ পর আমি চোখ খুলে দেখি, চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি। আমি মাথা তুলে ‘বাঁচাও’ বলে ডাকলাম। ওইদিন আমি বোরকা পরা ছিলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। পরে লোকজনের কাছে থেকে শুনেছি আমাকে আর আইভী রহমানকে পুলিশের গাড়িতে করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেছে। সেখানে আমাকে মৃত ভেবে লাশের সঙ্গে রেখে দেওয়া হয়েছিল। পরে সাবের ভাই আমাকে তার নিজের গাড়িতে করে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান”, বলেন রুমা।

তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, গ্রেনেড হামলার পর তার দুই সন্তান জোবায়দা কুলসুম প্রিয়া (২১) ও জাহানারা ফাতেমা জয়ার (১৯) নামে ৫ লাখ টাকা করে ১০ লাখ টাকার এফডিআর করে দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট থেকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে ভাতা পান। প্রতি মাসে ওষুধ ও চিকিৎসা বাবদ প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। চিকিৎসার টাকা জোগাতে ২০০৮ সালে স্বামীর বাড়ি থেকে পাওয়া এক রুমের বাসাটি ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন, যার পুরোটাই চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন।