বখাটেপনা: পুলিশের ভূমিকা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা|165169|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৯:৫১
বখাটেপনা: পুলিশের ভূমিকা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা
রিপন দে

বখাটেপনা: পুলিশের ভূমিকা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা

দেশে হঠাৎ করেই সমাজবিজ্ঞানী হয়ে গেছেন কিছু কিছু পুলিশ অফিসার। তারা অপরাধ প্রবণতা থেকে দূরে রাখতে নতুন নতুন নিয়ম শেখাচ্ছেন, হুকুম দিচ্ছেন। তারা চুল কাটা থেকে চা চায়ের দোকান পর্যন্ত নিয়মের আওতায় নিয়ে আসছেন। কে কীভাবে চুল কাটবে, কোথায় কয়টার পর চা খেতে পারবে না, কয়জন একসঙ্গে বসতে পারবে না কিংবা পার্কে গিয়ে ছেলেমেয়ে বসতে পারবে কি না তা ঠিক করে দিচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশে- সন্ত্রাস, ছিনতাই, মাদক একটি বড় সমস্যা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ। লাইসেন্সবিহীন, কাগজপত্রবিহীন লাখ লাখ যানবাহন চলছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে যান চলাচলে সড়কে অবিরত মারা যাচ্ছে মানুষ। সাগর-রুনিসহ বিভিন্ন জটিল মামলার জট খুলতে না পারা পুলিশ এখন আবির্ভূত অপরাধ বিজ্ঞানী হিসেবে।

বখাটেপনা দূর করতে ছাত্র ও তরুণদের ফ্যাশনেবল চুল কাটা ও দাড়ি-গোঁফ কামানোর ওপর নিষেধ দিয়ে পুলিশের নির্দেশ নতুন সংজ্ঞা যে চুল স্টাইল করে কাটলে বখাটেপনা বাড়ে। এসব যুক্তি দেখে যখন একজন যুবক রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা এস এম সুলতানকে কল্পনা করবে চিন্তা করুন তার মধ্যে কেমন অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে?

বিবিসি বাংলার সূত্রে কয়েকটি সংবাদ থেকে জানা যায় ইভটিজিং প্রতিরোধে ফ্যাশনেবল চুল-দাড়ি ছাটার ওপর নির্দেশনা প্রথম এসেছিল গত মার্চে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায়।

এরপর সিলেটের কানাইঘাট বাজারের সেলুন ব্যবসায়ীদের নিয়ে এক বৈঠকে একই নির্দেশনা দিয়ে পুলিশ ।

এ ছাড়া ঝালকাঠি, ঢাকার সাভার এবং মাগুরা জেলা পুলিশও সেলুন মালিকদের ‘বখাটে স্টাইলে’ চুল কাটা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে মাগুরায় মাইকিংও করা হয়। বাঘা উপজেলার নির্দেশনাটি ইউএনও-এর পক্ষ থেকে দেওয়া হলেও বাকি সব নির্দেশনা এসেছে পুলিশের থেকে।

চুল কাটা বিতর্ক থামতে না থামতেই চুল কেটে বখাটেপনা রুখতে পারবে এমন ধারণা পোষণকারী পুলিশ এখন চায়ের দোকানমুখী। যদিও পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ‘কে কীভাবে চুল কাটবে এটা সম্পূর্ণ ওই ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়। এ নিয়ে পুলিশের কিছু বলতে পারবে না, করতেও পারবে না। যে নির্দেশনা এসেছে, সেগুলো কারো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়ে থাকতে পারে। আমরা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি’।

৩১ আগস্ট প্রকাশিত একটি সংবাদের তথ্য মতে, সুনামগঞ্জে রাত ৯টার মধ্যে সব চায়ের দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার।

একটি স্বাধীন দেশে পুলিশ ঠিক করে দেবে কে কীভাবে চুল কাটবে, কয়টার পর চায়ের দোকান খোলা থাকবে সেটা কী গণতন্ত্রে পড়ে? সামরিক শাসনে মন স্বেচ্ছাচারী হতেই পারে। যেমন পৃথিবীর বুকে অন্যতম স্বৈরশাসনের দেশ উত্তর কোরিয়ায় পুরুষরা চুল ৫ সেন্টিমিটারের বেশি লম্বা করতে পারেন না। নারীরা ১৪ ধরনের ‘হেয়ার কাট’ থেকে নিজের পছন্দেরটি বেছে নেন।

আমাদের দেশেও এমনটা ছিল সামরিক শাসনের আমলে, যখনই বাংলাদেশে সামরিক শাসন এসেছে তখনই দেখা যেত সেনা সদস্যরা লোকজনকে ধরে রাস্তার পাশে বসিয়ে চুল কেটে দিচ্ছেন! সেই সামরিক শাসন নামের জংলি আইনের মতো করে কেন এগোচ্ছে পুলিশ? নাগরিকের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া সেটাও তো অপরাধ।

বাংলাদেশের সংবিধানে, আইনে, বিধি-বিধান কোনো কিছুতেই ব্যক্তির বেশভূষার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়ে কিছু বলা নেই। পুলিশ, প্রশাসন কাউকে এমন অধিকার দেওয়া হয়নি। এটা যার যার স্বাধীনতা। এখানে বাধা দিতে গেলে সেটি হবে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।

কিন্তু এ বিষয়টি যারা নিশ্চিত করবেন সেই পুলিশের কিছু কর্মকর্তা নিজেই ব্যক্তিস্বাধীনতা অনিশ্চিত করছেন। যেহেতু দেশে মশা মারা থেকে আসামি গ্রেপ্তার পর্যন্ত সবকিছুর জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করি- তাই গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

একটি গণতান্ত্রিক সরকারের শাসন ব্যবস্থাকে স্বৈর‍শাসনের রূপ দিয়ে যারা পুরো শাসনব্যবস্থাকে বিতর্কিত করতে চায় তাদের ব্যাপারে এখনই সচেতন হওয়া উচিত।

এদের কারণে তরুণদের মনে গণতান্ত্রিক একটি দেশকে স্বৈরশাসন হিসেবে দাগ কাটবে যা সরকারের বদনাম। কারণ সবকিছুর পর সাধারণের চোখে সব দায় সহজেই যায় সরকারের ওপর।

কে কীভাবে চুল কাটল, দাড়ি কাটল সেটা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে না। বিষয়গুলোকে আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকে মনোযোগ না দিয়ে আপনারা চুল-দাড়ি কাটা নিয়ে বৈঠক করছেন। হঠাৎ একদিন চুল কেটে কেউ বখাটেপনা ছেড়ে দিয়েছে এমন হয়েছে কখনো?

বরং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে আপনাদের দুর্বল তদন্ত রিপোর্টের কারণে অনেক ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নেয় না । নিজেদের যে দায়িত্ব আছে সেটা পালন করতে না পেরে অপরাধ বিজ্ঞানী বা সমাজবিজ্ঞানী হওয়া তো হাস্যকর।

বখাটে তৈরি হচ্ছে কেন? কই ইউরোপের এত বখাটে নাই কেন? সেখানে চুলের বাহারি ফ্যাশন চলে। নাগরিক তার স্বাধীনতা নিয়ে কফি শপে বসতে পারে। কারণ সেখানকার পুলিশ সমাজকে সেই দিকে নিতে পেরেছে। ধর্ষণ হলে সঠিক তদন্ত করে, যার ফলে বিচার হয়। একটি ঘটনার বিচার আরেকটি ঘটনার ঘটানোর আগে অপরাধীদের ভাবায়। আর আমাদের এখানে উল্টো, যে ধর্ষিত হয় তাকেই বিপদে পড়তে হয়। এর ৯০% কারণ পুলিশের ব্যর্থতা।

সড়কে এত এত লাশ পড়ছে প্রতিদিন এর জন্য কি পুলিশ দায়ী না? হাইওয়ে পুলিশ যদি গাড়ি থেকে ঘুষ নেয়, সে কি আর ফিটনেস বা কাগজবিহীন গাড়ি আটকাবে? আমি না শুধু সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে এই দেশের পুলিশ তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করলে দেশের ৮০ ভাগ সামাজিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

দেশে সুস্থ বিনোদন নেই, লাইব্রেরি নেই । প্রতি বছর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জিপিএ ৫ কিন্তু শিক্ষিত নাই। কারণ লাইব্রেরি কই? যারা টুকটাক পড়েন তারাও শুধু বিসিএস আর চাকরির প্রতিযোগিতায় নিজেকে সেরা প্রমাণ করতে পড়ছেন।

সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা পারে আমাদের তরুণদের মানবিক এবং সভ্য হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু খেলার মাঠ কই? পৃষ্ঠপোষক কই? সাংস্কৃতিক চর্চা কই? মাঝে মাঝে কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় তাও চারদেয়ালের ভেতর। চারদেয়ালেও ৭০ ভাগ আসন খালি থাকে।

এ বিষয়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে না পারলে সমাজে বখাটেপনা কমবে না, সেই সঙ্গে দরকার পারিবারিক শিক্ষা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় দৃশ্যমান নরসুন্দর পুলিশ বা অপরাধ বিজ্ঞানী পুলিশ সেজে বাহবা পাওয়ার কিছু নাই। বরং এখান থেকে উল্টো হিতে বিপরীত হতে পারে। আপনি চাইলেই ৯টার পর গণহারে চায়ের দোকান বন্ধ করে দিতে পারেন না । আপনি হয়ত জানেন না অনেক নিম্নআয়ের মানুষ আছে, যারা ঘরে চা তৈরি করতে পারে না, পাড়ার দোকানে এসে পাঁচ টাকা দিয়ে এক কাপ চা খায়। অনেকে রাতে কাজ করে বা রিকশা চালায়। তারা এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটা বিস্কুটকেই তার নাশতা হিসেবে গ্রহণ করে। চায়ের দোকানের সঙ্গে যাদের জীবিকা জড়িত এদের একেকজনের আয়ে হয়তো ৫ থেকে ১০ জনের পরিবার চলে। তাদের কী হবে?

পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বখাটে থাকে না, বখাটে থাকে মনে । যদি সত্য এরা বখাটে বা চরিত্রহীন হয়ে এদের চায়ের দোকান থেকে ঘরে পাঠিয়ে বরং নীরব অপরাধ বাড়বে।

ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার করি। আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে তেমন চায়ের দোকান ছিল না, টিভি ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবে বিনোদনের অভাব ছিল। বিকেল পর্যন্ত খেলাধুলা করে কাটাতে পারলেও সন্ধ্যার পর ইয়ং ছেলেদের সময় কাটানোর জায়গা ছিল পাশের গ্রামের পরিচিত কারো বাড়ি বা নিজের প্রতিবেশীর ঘর।

একে তো সময় কাটানো একটা সমস্যা, তাই অলস বসে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুই হচ্ছে, বিনোদনের অভাব তাই অবচেতন মন বিনোদন খুঁজে। এই দুইয়ের মিশেলে প্রায়ই গ্রামে বিচার বসত। সেই বিচারের ৮০% যৌনতা নিয়ে।

অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা, সেটা চিরন্তন সত্য, সেই চিরন্তন সত্য মেনে এটা কী নিশ্চিত করতে পারবেন যে চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া ছেলেটা সময় কাটানোর জন্য লুকিয়ে আড্ডা দেবে না বা লুকিয়ে আড্ডা থেকে নেশা বা অনৈতিক বিনোদনে জড়াবে না? 

চুল কেটে বা চায়ের দোকান বন্ধ করে কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ হবে যারা মনে করেন, তাদের নিজের কাজ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে নিজের দায়িত্ব পালনে তিনি আসলেই ডাব্বা। কারণ হুকুম দিয়ে বখাটেপানা বন্ধ করে দেবেন সেটা অবান্তর চিন্তা।

প্রিয় প্রজন্ম ছেলেমেয়েদের কাকে কীভাবে ভালোবাসা দিয়ে ম্যানেজ করতে হয় এ নিয়ে যারা পড়াশোনা করেছেন তারা নিশ্চয় এ বিষয়গুলো নিয়ে অনেক ভালো জানেন। ইন্টারনেটের কল্যাণে তারা অনেক কিছু বয়সের তুলনায় অ্যানালগ সময় থেকে ভালো জানে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের কারণে ইয়াসমিন থেকে নুসরাত বা তরুণদের চোখের সামনে প্রভাবশালীদের সাহায্যে মাদক ব্যবসা, অহরহ ধর্ষণ মামলায় সঠিক ভূমিকা না নেওয়াসহ পুলিশের ভূমিকা কী তা তারা জানে। তাই পুলিশ সম্পর্কে তরুণদের মনে ভালো ধারণা নেই ।

সস্তা জনপ্রিয়তা আর মূল কাজ রেখে আকামের চেয়ে বরং পাড়ায় পাড়ায় খেলাধুলার ব্যবস্থা করুন, লাইব্রেরি গড়ে তুলুন। তরুণদের বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যবহার করুন, তাদের সঙ্গে আড্ডা দিন, তাদের ভেতরের মানবিক সত্তাকে জাগ্রত করুন।

তারা মানবিক হলে বখাটেপনায় মন থাকবে না। নিশ্চিত জেনে রাখেন, বখাটে চুলে বা চায়ের দোকানে থাকে না থাকে মনে। আর কোনো কিছু না পারলেও অন্তত আমরা যে স্বাধীন দেশের নাগরিক সেটা নিয়ে ক্ষত তৈরি করবেন না ।

লেখক: সাংবাদিক