গ্রামের চেয়ে অসহায় ঢাকার গরিব|169007|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
গ্রামের চেয়ে অসহায় ঢাকার গরিব
আশরাফুজ্জামান মণ্ডল

গ্রামের চেয়ে অসহায় ঢাকার গরিব

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আসমা বেগম বাস করেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধসংলগ্ন হাজি লাটমিয়া বস্তিতে। মৃতপ্রায় জাফরাবাদ খালের ওপর বাঁশের খুঁটি গেড়ে তার ওপর বানানো হয়েছে ঘর। ঝুলন্ত বস্তিতে খালের নোংরা পানি ও আবর্জনার দুর্গন্ধ। মেঝের ফাঁক দিয়ে ঘরে উঠে আসে মশা-মাছি। ওপরে টিনের ছাউনিতে মরিচা ধরে হয়েছে অসংখ্য ফুটো। সেই ফুটো দিয়ে দেখা দেয় রোদ, বৃষ্টি, আকাশ। এই ঘরে গতি সাত বছর স্বামী ও তিন শিশু সন্তানের সঙ্গে বাস করছেন আসমা। তিনি গৃহকর্মী। তার স্বামী মতিউর রহমান দিনমজুর। তার কাজ থাকে না প্রতিদিন। আর কাজ না থাকলে খাবার জোগাড় করতে কষ্ট হয়।

লাটমিয়া বস্তিতে মোট ঘর ১৫টি। প্রতিটির ভাড়া সাড়ে ৩ হাজার। বস্তির শতাধিক লোকের জন্য টয়লেট আছে দুটি। সেগুলোর বেহাল অবস্থা। মলমূত্র পড়ছে ঘরের নিচের খালে। এই পরিস্থিতিতে শিশু-বৃদ্ধ সবার জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন অসুখ লেগে থাকে বছরজুড়ে। সামান্য অসুখ হলেও বস্তিবাসীকে ঋণের জন্য হাত পাততে হয়। অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন গবেষকরা বলছেন, অভিন্ন চিত্র ঢাকার ৪০ লাখ বস্তিবাসীর। অভাবে পড়ে দলে দলে ঢাকায় আসছে গরিব মানুষ। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের পরিবেশ, মানবিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন সূচকে নগর দারিদ্র্যের অবস্থা অনেক খারাপ হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রামের চেয়েও এ অবস্থা খারাপ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ও বেসরকারি কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থার জাতীয় ও শহরের দারিদ্র্য নিয়ে করা বিভিন্ন জরিপ ও শুমারি বিশ্লেষণ করে এর সত্যতা মিলেছে।

নগর দারিদ্র্যের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর, চাঁদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যানসহ গত পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন হাউজিং এলাকাগুলোর দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, হোটেলকর্মী, চা দোকানদার, রিকশাচালক, ভিক্ষুকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ প্রতিবেদক। এসব এলাকার শতকরা প্রায় ৯০ জন ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা উপকূলীয় জেলা ভোলা থেকে এসেছেন। উপকূলীয় অন্যান্য জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো থেকেও রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক মানুষ এসেছেন। ঢাকায় আসার প্রধান কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাব। নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটে-মাটি হারানো, কৃষি ফসলের দাম না পাওয়া, নদীতে মাছ কম পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণকে দায়ী করেছেন তারা। উন্নত জীবনের আশায় ঢাকায় এলেও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে তুলনা করে হতাশায় ভুগছেন বেশিরভাগ মানুষ।

জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাসের গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা শহরের বাসিন্দা ১ কোটি ৭০ লাখ। ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে ২ কোটি ৭৪ লাখ দাঁড়াবে বলে ওই প্রসপেক্টাসে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী ১০ বছরে আরও এক কোটির বেশি মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করবে। বিশ্বব্যাংকের করা আরেক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি বছর ঢাকায় প্রবেশ করছে অন্তত সাত লাখ মানুষ। ১৯৯১ থেকে ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে নগর দরিদ্রের সংখ্যা ৬০ লাখ থেকে বেড়ে ৮০ লাখ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪০ লাখ বাস করছে ঢাকায়। আর এ সময়ে গ্রামীণ দরিদ্রের সংখ্যা ৫ কোটি ৫০ লাখ থেকে কমে ৪ কোটি ৬০ লাখ হয়েছে। ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত আরবান স্ল্যাম সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে বস্তিবাসীদের প্রতি ১০ জনে ৯ জনের জন্ম ঢাকার বাইরে, এর মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ দরিদ্র।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকায় যে মাত্রায় দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে তা ভয়াবহ। মূলত দুটি কারণে এটি হচ্ছে। গ্রামের বিভিন্ন সংকট মানুষকে শহরে ঠেলে দিচ্ছে। আরেকটি কারণ শহরের কাজের আকর্ষণ। শহুরে দরিদ্রদের আয় বেশি। তবে অধিকারের বিভিন্ন সূচকে তারা গ্রামের চেয়ে পিছিয়ে। এতে শহরে কমেছে দরিদ্রের হার।

বস্তি এলাকার বাসস্থান, কর্ম ও পরিবেশ, খাদ্যগ্রহণ, চিকিৎসা, শিক্ষা, মাসিক আয়-ব্যয় ইত্যাদি ভিত্তি বিবেচনায় দেখা গেছে, গ্রামের চেয়ে শহরে কাজের সুযোগ বেশি। তবে অন্য কোনো সূচকে উন্নতি হয়নি। শহরের গরিবের আয় বেশি। কিন্তু তারা স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করেন। শারীরিক শক্তি বেশি ব্যয় করতে হয়, এমন পেশায় যুক্ত হতে হয়। অভাবের কারণে শিশুশ্রমে জড়িয়ে সন্তানরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রতিবেদক রাজধানীর বস্তিবাসীর যাদের সঙ্গেই কথা বলেছেন তাদের বেশিরভাগই শারীরিকভাবে অসুস্থ। তারা প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুদিন শরীরিক দুর্বলতা ও জ্বর-সর্দির কারণে কাজে যেতে পারেন না জানিয়েছেন।

শহুরে গরিবদের বিবিএসের শুমারি থাকলেও গ্রামের গরিবদের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থাটির করা জাতীয় দারিদ্র্যের সঙ্গে নগর দরিদ্রদের শুমারি ও বেসরকারি কয়েকটি সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শহরে বাস করা দরিদ্রদের আয়-ব্যয়, খাদ্য গ্রহণের অবস্থা, বাসস্থানের পরিবেশ, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থানের ঝুঁকি সব ক্ষেত্রে গ্রামের দরিদ্রদের চেয়ে ভয়ানক অবস্থায় রয়েছে। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনিসেফ ও বিবিএস যৌথভাবে ঢাকার বস্তিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এক জরিপ করে। চাইল্ড ওয়েল বিয়িং সার্ভে ইন আরবান এরিয়াজ অব বাংলাদেশ শিরোনামের এই জরিপে বলা হয়েছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস, অমানবিক পরিশ্রম, পুষ্টিকর খাদ্য না খাওয়াসহ নানা কারণে বছরব্যাপী নানা রোগে ভোগেন বস্তিবাসী। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। এছাড়া অন্তত ৬৪ শতাংশ নারী অন্তঃসত্ত্বা সেবা থেকে বঞ্চিত। নির্দিষ্ট করে গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিতের পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও এটি ৬০ শতাংশের নিচে বলে জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।

বিবিএসের ২০১৪ সালে করা কনসেনসাস অব সøাম এরিয়াজ অ্যান্ড ফ্লোটিং পপুলেশন শুমারিতে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে দেশে জাতীয় স্তরে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা জনসংখ্যা ছিল ৪১ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা নেমে আসে ২৫ ভাগে। এরপরও নদীভাঙন, গ্রামীণ অনিরাপত্তা, দুর্ভিক্ষ, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্যসহ নানা কারণে প্রায় ২২ লাখ মানুষ ঢাকায় এসে বস্তিতে বাস করছেন। এসব মানুষের শতকরা ৮০ ভাগ ভাড়া বাসায় থাকেন। এদের ৯০ ভাগ কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কর্ম হিসেবে যা অমানবিক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান। নগর দরিদ্রদের ৪২ শতাংশ অস্বাস্থ্যকর ঝুলন্ত টয়লেট ব্যবহার করেন। অন্যদিকে হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে নামে ২০১৬ সালে করা বিবিএসের একটি জাতীয় জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে স্যানিটারি টয়লেট ব্যবহার করা মানুষের সংখ্যা ৬২ শতাংশ, এর মধ্যে গ্রামও যুক্ত। বস্তির শিশুদের মধ্যে প্রাথমিকে যাওয়া শিক্ষার হার ৪২ শতাংশ। বিভিন্ন জরিপের ফল বলছে, গ্রামের ৯৫ ভাগ শিশু প্রাথমিক স্তরে স্কুলে যায়। গ্রামে সাক্ষরতার হার ৬৫ শতাংশ হলেও বস্তিতে এই হার মাত্র ২৮ শতাংশ। রাজধানীর বস্তিবাসীদের ৪৮ শতাংশ এখনো রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করেন। পানযোগ্য পানি পান ৩০ শতাংশ বস্তিবাসী। গ্রামে এই হার ৮৫ শতাংশ।

নগর দরিদ্রদের পরামর্শদানকারী বেসরকারি সংস্থা কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওরের (সিইউপি) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রামের চেয়ে শহরের গরিবদের আয় বেশি হলেও তাদের জীবন অমানবিক। বিশেষ করে বাসস্থানের পরিবেশ ভয়ানক। তারা সুষম খাদ্য পায় না আর পেলেও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করায় অসুখ-বিসুখে স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে। তাদের কোনো সঞ্চয়ও নেই। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ কোনো সেবাই নগর দরিদ্রদের জীবনে নিশ্চিত নয়, তবে তাদের খরচ বহন করতে হয়। গ্রামে এসব লাগে না। গ্রামের প্রায় শতভাগ শিশু স্কুলে যাচ্ছে। তবে নগর দরিদ্রদের বাচ্চারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ দারিদ্র্য উন্নতির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গ্রামে সরকারের অন্তত ১৪০টি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প রয়েছে। শহরে সেটা নেই। সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামের অনেক মানুষ ঘর পেয়েছে। কিন্তু বস্তিবাসীকে উচ্চ ভাড়ায় থাকতে হয়।

অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, শহর ও গ্রামের অর্থনৈতিক পার্থক্য বাড়ায় এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দুই অঞ্চলের দারিদ্র্যের ধরন আলাদা, তাই আলাদা করে এগুলো মোকাবিলা করতে হবে। গ্রাম থেকে মানুষ যাতে শহরে না আসে তার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রাম ও শহরের মাঝামাঝি অকৃষিজ কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক এলাকাগুলো ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল বানানোর ক্ষেত্রেও পুরনো পদ্ধতিতে ঢাকা-চট্টগ্রামকেন্দ্রিক করা হচ্ছে। এতে শহরে দরিদ্র আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। যত দ্রুত সম্ভব শহরমুখী অর্থনীতি থেকে আমাদের বের হতে হবে।