টলে না পড়া পর্যন্ত মার|173324|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
টলে না পড়া পর্যন্ত মার
প্রতীক ইজাজ ও ওমর হায়দার

টলে না পড়া পর্যন্ত মার

বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের যে ওয়েবপেজটি বন্ধ করে দিয়েছে বিটিআরসি, সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বুয়েট ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনের তথ্য উঠে এসেছে। গত কয়েক বছর ধরেই র‌্যাগিংয়ের নামে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে টর্চার রুমে ডেকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেধড়ক পেটানোসহ নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে আসছে। এমনও হয়েছে, নির্যাতনের পর কখনো ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, কখনো শিক্ষার্থীর নিস্তেজ দেহ ফেলে রাখা হয়েছে ছাদে, সিঁড়িতে বা বারান্দায়। এমনকি নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্যাতনের কথা অস্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছে।

ওই ওয়েবপেজে শিক্ষার্থীরা এ কথাও বলেছেন, নির্যাতনের বেশিরভাগই করা হয়েছে ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার অপরাধে। ডেকে ডেকে শিক্ষার্থীদের ফেইসবুক পরীক্ষা করা হতো। সরকারবিরোধী কোনো স্ট্যাটাস পাওয়া গেলে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যেত। এছাড়া হাফপ্যান্ট পরা, চুলের কাটিং, সালাম না দেওয়া, স্মার্ট হয়ে চলাফেরা করা ও বেশি পড়ালেখা করাকেও দোষ হিসেবে ধরা হতো।

শিক্ষার্থীরা এমনও অভিযোগ করেছেন, বাড়ি থেকে বাবা-মা, ভাইবোন বা কোনো আত্মীয়-স্বজন দেখা করতে এলে তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘বড় ভাইদের’ যদি সালাম না দেওয়া হতো, সেটাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। পরের দিন পরীক্ষা জেনেও সন্ধ্যা থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা,

 

কখনো কখনো ভোর পর্যন্ত কথা বলার নাম করে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। ল্যাপটপ নিয়ে নেওয়া হতো। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চাঁদা নেওয়া হতো। এমনও হয়েছে, র‌্যাগিংয়ের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে দিয়েছেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে অন্যত্র ভর্তির ঘটনাও ঘটেছে।

পেজে জমা হওয়া অভিযোগে দেখা গেছে, আবাসন ও ক্যান্টিন সমস্যা, শিক্ষকদের ক্লাসের উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এসব অভিযোগে বর্তমান ছাত্রলীগ কমিটির পাশাপাশি এর আগের তিনটি কমিটির বিভিন্ন নেতাদের নামেও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আবরার হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ও বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রাসেলসহ অন্যান্য অভিযুক্তের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের নানাভাবে নিপীড়ন করার অভিযোগ রয়েছে। গতকাল আবরার হত্যাকা-ে অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার অমিত সাহার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে ওয়েবপেজে।

ওয়েবপেজে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনকে জানানো হলেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো এমনও হয়েছে যে, ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ও হল প্রভোস্টরা হলে উপস্থিত থাকার সময়ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তারা জেনেও সংশ্লিষ্ট কক্ষে আসেননি। নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করেননি।

এমনটি কেন হচ্ছেÑ জানতে চাইলে গতকাল বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি তিন মাস আগে এ দায়িত্ব পাই। আমার সময়ে পাওয়া তিনটি অভিযোগ উঠলে তা তিনটি আলাদা তদন্ত কমিটি করি। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য বিষয়গুলো উপাচার্যের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কমিটি হয়নি। তবে এর আগে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা সে সময়ের পরিচালকরা বলতে পারবেন।

বুয়েটে বর্তমানে র‌্যাগিং ভয়ংকর অবস্থায় গেছে বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষক। তিনি দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, র‌্যাগিং শুধু যে রাজনৈতিক তা নয়, সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এর সঙ্গে যুক্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত সিনিয়ররা জুনিয়রদের র‌্যাগিং করতে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ক্ষোভ থাকে। এভাবেই র‌্যাগিং ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। তবে বর্তমানে ভয়ংকর অবস্থায় যাচ্ছে। এ র‌্যাগিংয়ের কারণে বুয়েটের মতো একটি সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে বাজে অবস্থার তৈরি হয়েছে। অবশ্যই এই র‌্যাগিং প্রথা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করা উচিত।

তবে ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন ওয়েবপেজটি দেখভাল করা বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (সিএসই)। সেই বিভাগের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ওয়েবপেজে জমা পড়া অভিযোগগুলো দুই মাস আগে প্রিন্ট করে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্টদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এই ওয়েবপেজে ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ থেকে সর্বশেষ গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১৬৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে গত রবিবার রাতে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর বেশকিছু নতুন অভিযোগ জমা পড়ে। ওয়েবপেজে দেখা গেছে, সর্বশেষ গত ৯ অক্টোবর ২৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সেখানে বিভিন্ন সময়ের র‌্যাগিংয়ের নামে ছাত্রলীগ নেতাদের দ্বারা ভয়াবহ নির্যাতনের কথা বলেছেন শিক্ষার্থীরা।

একজন লিখেছেন, ‘যখন জুনিয়র ছিলাম তখন আহসানউল্লাহ হলে সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছি শাওন সাহা (মেকানিক্যাল-১৫) ভাইয়ের কাছে। রাতের পর রাত বিভিন্ন কারণে আমাকে আর আমার ফ্রেন্ডদের স্টাম্প দিয়ে পিটিয়েছে। আহসানউল্লাহর অনেক ছেলেই এখনো চুপ করে আছে শুধু শাওন ভাইয়ের ভয়ে।’ এই শাওন সাহা বুয়েট বর্তমান ছাত্রলীগ কমিটির দ্বিতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক।

আরেকজন লিখেছেন, ‘শেরেবাংলা হলের নির্বাচনের সময়ের ঘটনা। ঘটনার দিন রাতে আনুমানিক ১০-১১টার দিকে আমাদের ১৭ ব্যাচকে ডাকা হয়। তারপর প্রশ্ন করা হয় কে কে যায় না লীগের মিটিংয়ে আর কে কে সম্পূর্ণ সময় ছিল না। তারপর একে একে মুহতাসিম ফুয়াদ (সিভিল-১৪), মাহমুদ সেতু (কেমিক্যাল-১৪), ইফতেখার ফাহাদ (ইইই-১৪) থাপ্পড় দেয়। খুব জোরে মারছিল। আর ওইদিনই রাত ২টার দিকেই আবার ১৬ ব্যাচের পলিটিক্যালরা ছাদে তুলে আবার মারে। আর ওই সময় অমিত সাহা (সিভিল-১৬) আমাদের একজনের হাত ভাঙে। ওইদিন আশিকুল ইসলাম বিটু (কেমিক্যাল-১৬), মুজতাবা রাফিদ (কেমিক্যাল-১৬), ফারহান জাওয়াদ চৌধুরী (ইলেকট্রিক্যাল-১৬), আসিফুর রহমান মিনার (১৬-ব্যাচ), মুজাহিদ (ইলেকট্রিক্যাল-১৬ ব্যাচ), শুভসহ (ইলেকট্রিক্যাল-১৬) আরও কয়েকজন ছিল। এরা সবাই মোটামুটি মারছে স্টাম্প আর বেল্ট দিয়ে।’

একই দিন আরেক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘আমরা তিতুমীর হলের ১৮ ব্যাচ। একবার আমাদের হলমেটদের ছাদে ডাকা হয়। একজনের দোষ ছিল কমনরুমে বড় ভাইদের না বলে মা-বাবা নিয়ে বসেছে। আরেকজন লীগের মিছিলে না গিয়ে মুভি দেখতে গিয়েছিল, একজন টিউশনিতে ছিল, একজন ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইকে সালাম দেয়নি। এরপর ১৭-এর ভাইরা আমাদের সবাইকে অমানবিকের মতো স্টাম্প দিয়ে মারতে থাকে। আমাদের ইইই’র একজনকে সবচেয়ে বেশি মারে কারণ সে মার খেয়ে টলে পড়ছিল না। ভাইয়েরা এটাও বলে যে, শালা ব্যায়াম করে, ব্যায়াম করা শরীরে পিটায়া শান্তি এরপর আমাদের সবাইকে একে একে সবাই কেঁদে ফেলি। তবুও ভাইরা থামে না।’

এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ঘটনাটি ২০০৯ সালে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ দাপট দেখানো শুরু করে। বর্তমানের নির্মমতার শুরু সেখানেই। তুচ্ছ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ইন্ধনে ব্যাচ ০৭-এর একটি ছেলেকে নজরুল ইসলাম হল থেকে এক সেমিস্টারের জন্য হলে না থাকার নির্দেশ দেয় তখনকার র‌্যাগ ব্যাচ-০৪। এ ঘটনায় হল প্রভোস্টের কানে দেওয়ায় ব্যাচ ০৭-এর ছেলেদের হল ক্যান্টিনে ডেকে মারধর করা হয় হল ছাত্রলীগ সভাপতি তালাশের (ব্যাচ-০৩) নেতৃত্বে। ছাত্রলীগের এই দাপট তৎকালীন ভিসির ছত্রছায়ায় হয়। পরবর্তী সময়ে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে যে আন্দোলন হয় সেটাও একই কারণে।’

আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ‘আমি নজরুল ইসলাম হলের ছাত্র ছিলাম। তখন রুম নাম্বার ১০৫ আর ৩০৫ ছিল ছাত্রলীগের টর্চার সেল। নজরুলের সব মদ-গাঁজার আসর বসত এই দুটি রুমে। রড, কাঠ, লাঠি কোনো কিছু বাদ রাখেনি তারা তখন। নজরুল হলের পুরো ব্যাপারটা নেতৃত্বে ছিল আনোয়ার হাবিব অনিক। সে এ ঘটনার মাত্র ছয় মাস পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক পায়। ছাত্র মারধরে এই হলে অন্যান্য সক্রিয় ছাত্রলীগার ছিলÑ সুজিত সাহা, সজল আহমদ শুভ, শুভেন্দু বিশ্বাস, অনির্বাণ শাহা, নাহিদ আদনান, বিজয় সাহা, রাজিব শাহা, জয় প্রকাশ নন্দী, সাইফ অভি, সুলতানুল আরেফিন রিদম, মতিউর রহমান টিপু, নাসির আহমেদ, মাহমুদুল হক মুরাদ। সে সময় বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি ছিল শুভ্রজ্যোতি টিকাদার, সম্পাদক কনক আহমেদ। তাদের নেতৃত্বে বুয়েটে সব হলে তল্লাশি চলেছিল। শিবির সন্দেহে প্রত্যেক হলে পিটিয়েছিল। কাউকে পুলিশে দিয়েছিল, কাউকে বুয়েট প্রশাসনে হাতে তুলে দিয়েছিল। অনেককে মেরে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। অনেকে এ ঘটনায় হল থেকে নিজেরাই ভয়ে চলে গিয়েছিল। বুয়েট প্রশাসন সব ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত নিরপরাধ ছাত্রদের কয়েকজনকে এক টার্মের জন্য বহিষ্কার করে। তাদের হল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে এবং কয়েকজনকে সতর্ক করে।’

আরেক শিক্ষার্থী লেখেন, ‘গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের ইশতেহার আসার পর যখন সমাবেশ করা হয়, তখন আমি যাইনি। অনেকেই যায়নি ১৭ ব্যাচের। তাই সবাইকে ছাদে তোলা হয়েছিল। যারা বলেছিল টিউশনিতে গেছে তাদের প্রচুর মারছে। সকাল নামে একজন আমার চুল ধরে টান দিল। আর ফারহান জাওয়াদ নামে একজন স্টাম্প দিয়ে তিন-চারটা বাড়ি দিল।’

আরেকটি অভিযোগে দেখা যায়, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে এমএ রশিদ হলের ৪০৫ নম্বর কক্ষে একজন ছাত্রকে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। মারধরের কারণে ওই ছাত্রের পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়। ওই ঘটনার অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের কমিটিতে পদধারী।