পাতাল রেল প্রকল্প একনেকে উঠছে কাল|173923|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
পাতাল রেল প্রকল্প একনেকে উঠছে কাল
মামুন আব্দুল্লাহ

পাতাল রেল প্রকল্প একনেকে উঠছে কাল

দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে কাল। রাজধানীতে মেট্রোরেলকে আরও বিস্তৃত করতে ৫১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার নতুন লাইন নির্মিত হবে। এর বড় অংশ হবে মাটির নিচ দিয়ে বা পাতাল রেল। এজন্য মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫ নামে দুটি প্রকল্পে ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় জনভোগান্তির বিষয়টি আমলে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য শামীমা নার্গিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, নগরবাসীর যাতায়াত সহজতর করতে মেট্রোরেল প্রকল্প দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পাতাল রেলের যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সে আলোকে এবার চূড়ান্ত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প দুটি একনেকের আগামী সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার। এর আওতায় রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার হবে মাটির নিচ দিয়ে। বাকিটুকু হবে এলিভেটেড বা মাটির ওপর দিয়ে হবে। অন্যদিকে মেট্রোরেল লাইন-৫-এর আওতায় সাভারের হেমায়েতপুর থেকে সেনানিবাস হয়ে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৪ কিলোমিটার হবে পাতাল রেল। বাকি ছয় কিলোমিটার থাকবে এলিভেটেড বা উড়ালপথ।

তারা আরও জানিয়েছেন, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এজন্য বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা দেবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি সহায়তাও দেবে সংস্থটি। মেট্রোরেল লাইন-১-এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, বাকি ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করবে সরকার। চলতি বছর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ধরা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদকাল। এ পথে প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন ১৪ লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারবে, যা পরে উন্নীত হবে ১৯ লাখে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেট্রোরেল লাইন-৫-এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হবে ১২ হাজার ১১২ কোটি টাকা আর জাইকা ঋণ হিসেবে দেবে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২৮ সাল নাগাদ এ কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

বর্তমানে উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্পের কাজ চলছে। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর প্রকল্পের কাজ কিছুটা ব্যাহত হয়। তবে ২০২১ সাল নাগাদ এ প্রকল্পের প্রথম অংশ উদ্বোধন করা হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এদিকে এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ে জনভোগান্তি চরমে উঠবে বলে মনে করছেন অনেকে। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে দুটি বিষয় দেখতে হবে। প্রথমত আন্তঃসংযোগ হচ্ছে কি না। আন্তঃসংযোগ না থাকলে জনজট তৈরি হবে। মেট্রোর উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না। দ্বিতীয়টি হলো মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রাধান্য না দিয়ে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে যাওয়াই উচিত নয়। চলমান মেট্রোর অভিজ্ঞতা নিয়ে জনদুর্ভোগ কমাতে অবশ্যই পদক্ষেপ থাকা উচিত। এ ছাড়া দ্রুত ও যথাসময়ে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে। মনিটরিং ঠিকঠাক হলে জাপানকে দিয়ে এটা সম্ভব।’

নতুন দুই পথে যা থাকছে : মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্প: এ প্রকল্পের প্রথম ধাপ হবে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। দ্বিতীয় ধাপটি হবে কুড়িল-বসুন্ধরা হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত। এ রুটে ১২টি স্টেশন হলোÑ শাহজালাল বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, বারিধারা (নতুনবাজার), উত্তর বাড্ডা, গুলশান ১, বাড্ডা (হাতিরঝিল), রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।

এ প্রকল্পে নতুনবাজার স্টেশনের সঙ্গে এমআরটি-৫-এর রুটের আন্তঃসংযোগ থাকবে। এজন্য শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত পর্যন্ত এলিভেটেড বা ওপর দিয়ে মেট্রোরেল হবে। দ্বিতীয় ধাপে খিলক্ষেত স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক এবং বারিধারা (নতুনবাজার) পর্যন্ত থাকবে আন্ডারগ্রাউন্ড বা পাতাল রেল। এছাড়া বারিধারা এলিভেটেড স্টেশন থেকে উত্তর বাড্ডা, গুলশান-১, বাড্ডা, রামপুরা পর্যন্ত এলিভেটেড এবং রামপুরা থেকে মালিবাগ, রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত হবে পাতাল রেল।

পূর্বাচল রুটে ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার পথে থাকবে ৯টি স্টেশন। পূর্বাচলগামী অংশটি হবে বারিধারা নতুনবাজার থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা (পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি), মাস্তুল, পূর্বাচল পশ্চিম, পূর্বাচল সেন্ট্রাল, পূর্বাচল টার্মিনাল (পূর্বাচল সেক্টর-৭) পর্যন্ত। এ পথে নতুনবাজার (বারিধারা) এলিভেটেড স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক হয়ে বসুন্ধরা পর্যন্ত হবে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল। তবে বসুন্ধরা স্টেশনটি হবে এলিভেটেড। এছাড়া মাস্তুল, পূর্বাচল ওয়েস্ট পয়েন্ট, পূর্বাচল সেন্ট্রাল ও পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত হবে এলিভেটেড মেট্রোরেল। ফলে এ রুটে নতুনবাজার ও যমুনা ফিউচার পার্ক স্টেশন দুটো আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে এবং বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত সাতটি স্টেশন হবে এলিভেটেড।

মেট্রোরেল লাইন-৫ : এটি হবে দ্বিতীয় আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল। এ পথে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে থাকবে দুটি রুট। উত্তরের ২০ কিলোমিটার পথে থাকবে ১৪টি স্টেশন। এগুলো হলো হেমায়েতপুর (সাভার), বলিয়াপুর, বিলামালিয়া (মধুমতি), আমিনবাজার, গাবতলী, দারুসসালাম (টেকনিক্যাল), মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুনবাজার ও ভাটারা। এর মধ্যে আমিনবাজার থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার পথজুড়ে ৯টি স্টেশন হবে আন্ডারগ্রাউন্ডে। বাকি ছয় কিলোমিটার পথে পাঁচটি স্টেশন হবে এলিভেটেড।

অপরদিকে দক্ষিণে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে থাকবে আটটি স্টেশন, যার পুরোটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে হবে। এগুলো হচ্ছেÑ গাবতলী, আদাবর, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, দক্ষিণ বাড্ডা ও আফতাবনগর।