এই দখলের মানে কী|173929|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
এই দখলের মানে কী
শহীদুল ইসলাম শহীদ, পঞ্চগড়

এই দখলের মানে কী

পঞ্চগড় জেলার চারটি উপজেলায় বিভিন্ন মৌজার ৫৬০২ দশমিক ৭৩ একর জমি ৫৬ বছর দখলে রেখেছে বন বিভাগ। এই জমি বন বিভাগ প্রাইভেট ফরেস্ট অর্ডিন্যান্স-১৯৫৯ অনুযায়ী ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে গেজেটভুক্ত করে। এসব জমিতে কেবল সরকারিভাবে বনায়ন করার কথা থাকলেও কাগজে-কলমে দখলে রেখেছে। জমির মালিকদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এই জমির রেকর্ড পাচ্ছেন না বৈধ মালিকরা। ফরেস্ট সেটেলমেন্ট আদালতের রায় কার্যকর হয়নি ১৯ বছরেও। বন বিভাগ কর্র্তৃপক্ষ এসব জমির মালিকানা দাবি যারা করে আসছেন তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন আদালতে শতাধিক দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারাধীন মামলায় কয়েক হাজার মানুষ আসামি। জমির মালিকানা নিয়ে তাদের সংশয়ও রয়ে গেছে।

বোদা উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই জমির মালিকানা পেতে বছরের পর বছর এ-দপ্তর ও-দপ্তর করে বেড়াচ্ছেন প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ।

ভূমি অফিস ও বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বন মন্ত্রণালয় ১৯৯৯ সালে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য ফরেস্ট সেটেলমেন্ট আদালত স্থাপন করে। তৎকালীন জেলা প্রশাসককে সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে ক্ষমতা দেওয়া হয়। ২০০১ সালের ২৮ মার্চ পঞ্চগড়ের ফরেস্ট সেটেলমেন্ট অফিসার শুনানি শেষে এক রায়ে বলেন, জমিগুলো মালিকদের ফেরত দেওয়া যেতে পারে। বন বিভাগ ইচ্ছা করলে অংশীদারের ভিত্তিতে চা চাষের পরিকল্পনা নিতে পারে। অথবা বন বিভাগ সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পূর্বে জমির মালিকদের বিগত বছরগুলোর ক্ষতিপূরণসহ জমির মূল্য দিয়ে বনায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু ১৯ বছরেও ওই রায় বাস্তবায়ন হয়নি। ৫৬ বছর ধরে ৫৬০২ দশমিক ৭৩ একর জমি বন বিভাগ অবৈধ দখলে রেখেছে। অভিযোগ আছে, জরিপ বিভাগ বন বিভাগের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসব জমিতে মালিকদের বৈধতার রেকর্ড দিচ্ছে না। ১৯৬২ সালের পর এই এলাকায় বিএস জরিপ শুরু হয়েছে। সঠিকভাবে রেকর্ড করাতে না পারলে ভূমি মালিকদের যুগ যুগ ধরে দেওয়ানি আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হবে। এ নিয়ে এসব জমির মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। ২০১৭ সালের ৭ মে জেলা শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। জমির মালিকদের অভিযোগ, বন বিভাগ প্রাইভেট ফরেস্ট অর্ডিন্যান্স-১৯৫৯ অনুযায়ী পঞ্চগড় জেলার ৫৬০২ দশমিক ৭৩ একর জমি ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে গেজেটভুক্ত করে। বন বিভাগ শুধু ১৯২৭ সালের সংরক্ষিত বনভূমির মালিকানা ও ওয়ার্কিং প্ল্যান অনুযায়ী সরকারিভাবে গাছ লাগানোর কথা। কিন্তু ওই জমি কাগজে-কলমে দখলে রেখেছে। কিন্তু জমির মালিকদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এসব জমির মধ্যে অনেকের বসতবাড়ি রয়েছে। কিছু জমি বন বিভাগের নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের স্থানীয়ভাবে বর্গা দেওয়া হয়েছে। প্রাইভেট ফরেস্ট অর্ডিন্যান্স-১৯৫৯ আওতায় গেজেটভুক্ত এসব জমির মালিকানা বন বিভাগকে দেওয়া হয়নি। তবে ওই অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, গেজেটভুক্ত জমি মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে যেকোনো সময় ফরেস্ট সেটেলমেন্ট অফিসার সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা দিতে পারেন। আর বন বিভাগ এসব জমি কোনোভাবেই দাবি করতে পারে না। কিন্তু পঞ্চগড়ে এ আইন অনুসরণ না করে ভূমি মালিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় বিএস রেকর্ড প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে। এ জন্য বৈধ মালিকরা জমি রেকর্ডের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিচ্ছেন।

এসব জমির মালিকরা জমি রেকর্ডের জন্য ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাইভেট ফরেস্ট অর্ডিন্যান্স-১৯৫৯ পর্যালোচনা করে ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ এসব জমি মালিকদের নামে রেকর্ড প্রস্তুত ও খতিয়ানের মন্তব্যে বন বিভাগের ব্যবহার্য লেখা যায় বলে নির্দেশনা দেয়। বন আইনের ৬ ধারায় ঘোষিত বনভূমি সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা সংক্রান্ত ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাসিক সভায় সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব জমি বৈধ মালিকদের নামে রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য আদেশ প্রদান করেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বরের এক পত্রে এসব জমির রেকর্ড সংশোধন করার যোগ্য বলে মত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব নির্দেশনা ও আদেশ এখনো কার্যকর হয়নি।

এ নিয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলার ভূমি মালিক ইসমাইল হোসেন, নুরুল আমিন, মো. খোরশেদ আলম, বোদা উপজেলার মো. ওয়ালিউল ইসলাম মন্টুর সঙ্গে এ প্রতিনিধির কথা হয়। তারা বলেন, সরকার ইচ্ছা করলে যে কোনো সময় প্রচলিত আইনে ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এসব জমিতে সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা না করা পর্যন্ত কোনোভাবেই চলমান রেকর্ড ও খাজনা দেওয়া বন্ধ রেখে ভূমি মালিকদের এভাবে হয়রানি করতে পারে না। জরিপ অফিসে দিনের পর দিন ঘুরছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এ জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

দিনাজপুরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মো. শামছুল আজম বলেন, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব জমি বৈধ মালিকদের নামে রেকর্ড করা যায়। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তির কারণে তা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে দিনাজপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমান ফোনে বলেন, এসব জমি বন বিভাগ গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়েছে। জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে জমির রেকর্ড দেওয়া যাচ্ছে না। কিছু জমিতে বন আছে। কিছু অনাবাদি আছে। কিছু জমিতে বসতবাড়িও আছে।