অরাজনৈতিকতার দণ্ড ও বিপজ্জনক ঐকমত্য |174027|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
অরাজনৈতিকতার দণ্ড ও বিপজ্জনক ঐকমত্য
আ-আল মামুন

অরাজনৈতিকতার দণ্ড ও বিপজ্জনক ঐকমত্য

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার এই সহজ ও প্রায় সর্বসম্মত ঐকমত্য বিপজ্জনক চিন্তার ফসল।  ভুলে যাবেন না, আবরারকে খুন করা হয়েছে দেশের প্রতি তার ভালোবাসা রাজনৈতিকভাবে আর্টিকুলেট করতে শিখে ফেলার কারণে।

‘শিবির’ ট্যাগ শুধু শিবির সন্দেহে তল্লাশির মামলা নয়; যদিও একইসঙ্গে এ কথাও মনে রাখা দরকার, কোনো অপরাধ না করলে কেবল ছাত্রশিবির করার কারণে বা মতামত প্রকাশের কারণে তল্লাশি করার বা পেটানোর বা মেরে ফেলার বা জেলে ঢোকানোর অধিকার এমনকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও জন্মায় না, কোনো ছাত্র সংগঠনের তো নয়ই।

‘শিবির’ ট্যাগের শেকড় গাড়া হয়েছিল ১৯৯০’র দশকে, যদিও ‘শিবির’ ট্যাগ দেওয়ার প্র্যাকটিস প্রবলভাবে চালু হয়েছে ২০০৭-২০০৮ সাল থেকে, মূলত অনলাইনে। তার পর থেকে এর প্রসার ঘটেছে, পসারও হয়েছে- ২০১৩ সালের কিছুকাল আগে থেকে এখন পর্যন্ত আমরা এর বিকৃতি ও সর্বব্যাপী আগ্রাসী চর্চা হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি।  সরকারি নীতি ও কর্মকাণ্ডের যেকোনো সমালোচনা, এমনকি যেকোনো রকম ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ‘শিবির’ ‘জামাতি’ ‘ছাগু’ ‘ছুপা ছাগু’ ইত্যাদি প্রত্যয়গুলোর ব্যবহার বারবার হয়ে আসছে।

ভিন্নমত প্রকাশকারীরা সবাই অসৎ উদ্দেশে সমালোচনা করেন বা প্রশ্ন তোলেন, তারা দেশবিরোধী এই রকম অবাস্তব স্বৈর কল্পনা প্রমাণ করার জন্য তাদের চৌদ্দপুরুষ ধরে টানাটানিও শুরু হয়েছে।  এবং আমরা দেখতেই পাচ্ছি, দিনে দিনে এই চর্চা আরও প্রকট ও প্রাণঘাতী হয়েছে। এ রকম অনেক উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে আছে, একটু চোখ কচলে নিয়ে তাকালেই আমরা সেসব দেখতে পাব।  আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যেমন সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনামূলক ভিন্নমত দমনের উদ্দেশে এ ধরনের ‘ট্যাগিং’ বা এমন প্রত্যয়গুলো বারবার প্রয়োগ করেছে, তেমনই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সহযোগী সংগঠনগুলো, মিডিয়া ও থিংকট্যাংকগুলোও নানাভাবে এসব ব্যবহার করেছে ভিন্নমত দমিয়ে রাখতে। যাকে দমন করতে চাও, তার নামে প্রথমে দুর্নাম ছড়াও এভাবেই তারা এই প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিকতা দান করেছে।  

বুয়েট ছাত্রলীগের ‘শিবির সন্দেহ’ তল্লাশির তৎপরতাগুলো ছিল প্রথমত এবং প্রধানত ‘অফিশিয়াল সত্য’-কে প্রশ্নকারী, সরকারের জন্য অস্বস্তিকর, কিংবা যেকোনো ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যপ্রসূত।  অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ রকম একই বাস্তবতা জারি আছে হলে হলে গেস্টরুম, হলরুম বা ছাত্রলীগ ব্লকগুলোতে গড়ে তোলা ‘টর্চার সেলে’ শিক্ষার্থীদের গগনবিদারী চিৎকার এই দগদগে ঘায়ের চিহ্ন বহন করছে। আমরা কানে তুলা দিয়ে ছিলাম।

বুয়েট ছাত্রলীগের ছেলেগুলো এমন এক প্যাথলজিকাল জিঘাংসা চর্চায় লিপ্ত থাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এবং এমন এক অলীক বাস্তবতায় বাস করে যে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে উঠেছে জাতীয় প্রশ্নে ‘অফিশিয়াল বক্তব্য’র বাইরে আর কোনো সত্য নেই, এবং তা সকল আলোচনা-সমালোচনা ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। তাদের মনে হতে থাকে, যেসব শিক্ষার্থী সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে কিংবা প্রতিবাদ করে, এমনকি ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ এই রকম নিরীহ প্রশ্ন তোলে, তারা নিশ্চিতভাবেই শিবির করে কিংবা অন্তত শিবিরভাবাপন্ন।

ফলে, প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নীতি, জাতির প্রশ্ন, ভাষার প্রশ্ন, ইতিহাসের প্রশ্ন, উন্নয়নের প্রশ্ন কোনো কিছু নিয়েই কোনো আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক বা সমালোচনার চর্চা  নেই, প্রতিবাদ তো একেবারেই নেই। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেই, দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষকদের মধ্যেও  নেই কবরের নীরবতা চারদিকে। এ এক স্বৈরতান্ত্রিক বাস্তবতা। এ বাস্তবতা রাজনীতিহীনতার কারণেই তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, এই বাস্তবতা সহিংসতা উৎপাদন করে, এবং সহিংস উপায়েই কেবল এই বাস্তবতা টিকিয়ে রাখা যায়। সহিংস উপায়েই তৈরি হতে পারে এ রকম নীরবতার কুণ্ডলি।                           

কোনো ভিন্নমত বা কোনো তর্কবিতর্ক নেই মানেই কোনো রাজনীতি নেই। তর্কবিতর্ক করার ও স্বাধীনভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করার রাজনৈতিক বাস্তবতা যদি থাকত তাহলে হয়তো আবরারকে খুন হতে হতো না। ছাত্রলীগ বলপ্রয়োগ ও সহিংসতাকেই প্রতিরোধের একমাত্র ভাষা হিসেবে গ্রহণ করত না।  সেহেতু প্রশ্ন করা যায়, ছাত্রলীগ কি রাজনীতি করত? আমি একবাক্যে বলব, না।  তারা পালন করত দলনীতির আধিপত্য জারি রাখার মাঠকর্মী লাঠিয়ালের ভূমিকা এবং একইসঙ্গে তারা পুলিশি দায়িত্ব পালন করত।

আবরারকে খুন করা হয়েছে রাজনীতিহীনতার পরিস্থিতিতে, এবং রাজনীতিহীনতার বাস্তবতা জারি রাখতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি থাকবে না আজ আমরা যখন এরকম সর্বসম্মত ঐকমত্যে অবলীলায় পৌঁছে যাই, তখন আবরারের দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে। কেননা, আবরার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন তুলেছিল, আবরার নতজানু পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেছিল, আবরার নিজের মতামতকে রাজনৈতিকভাবে আর্টিকুলেট করতে শিখে নিয়েছিল। ছাত্রলীগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো রাজনীতিহীনতা চাপিয়ে দিয়েছে। আর আগামীতে সেই রাজনীতিহীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক করে তুলবে আমাদের সর্বসম্মত ঐকমত্য। ক্ষীণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এভাবেই আমরা আবরারের উচ্চারণের রাজনৈতিকতাকে অপমান করি। যেন আমরা চাই, আমাদের সন্তানেরা সব বোবা-কালা হয়ে ‘বেঁচেবর্তে’ থাক কেঁচোর মতো।

লেখক : বিভাগীয় সভাপতি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]