পাওনা আদায়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হোক |174892|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
পাওনা আদায়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হোক

পাওনা আদায়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হোক

দেশে ব্যবসারত দুই শীর্ষ মোবাইল টেলিফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটার কাছ থেকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পাওনা আদায় নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা চলছেই। বিষয়টি ইতিমধ্যে নিম্ন  আদালতের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ আদালতেও গড়িয়েছে। কিন্তু সেখানেও বিষয়টি ঝুলে আছে। এ অবস্থায় সরকারের সায়ে বহুজাতিক কোম্পানি দুটিতে প্রশাসক বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিটিআরসি। এ সিদ্ধান্ত সরকারের কঠোর পদক্ষেপের পরিচায়ক। তবে, এর মধ্য দিয়ে গ্রামীণ ও রবির কাছ থেকে পাওনা আদায়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা দৃশ্যত ব্যর্থ হলো।  এদিকে, গ্রামীণফোনের এক আবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট পাওনা আদায়-সংক্রান্ত পদক্ষেপের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অবশ্য রবির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

বিটিআরসির দাবি অনুযায়ী, রাজস্বের ভাগাভাগি, কর ও অন্যান্য খাতে গ্রামীণফোন ও রবির কাছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পাওনা ১৩ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। গ্রামীণফোনের ওপর ১৯৯৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষার ভিত্তিতে বিটিআরসির পাওনা ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।  রবির ওপর ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষার ভিত্তিতে বিটিআরসির পাওনা ৮৬৭ কোটি টাকা। অবশ্য গ্রামীণফোন ও রবি সব সময় বলে আসছে, তাদের যুক্তি নিরীক্ষায় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। সেক্ষেত্রে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, মোবাইল অপারেটর কোম্পানি দুটো কেন নিজেদের যথাযথ হিসাব নিরীক্ষা বা নিয়মানুসারে যথাযথ হিসাব নিরীক্ষক দ্বারা পরীক্ষা করানো হিসাব দাখিলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সন্তুষ্টি আদায় করতে পারল না।  অর্থাৎ এই বিষয়টি স্পষ্ট যে প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই হিসাব নিরীক্ষার বিষয়ে গ্রামীণফোন বা রবি আজিয়াটার পর্যাপ্ত উদ্যোগ ছিল না। একই কথা প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয়েও বিটিআরসি কেন কোম্পানি দুটির হিসাব নিরীক্ষা এবং তাদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের বিষয়ে

যথাসময়ে উদ্যোগ নেয়নি।    

এখন সরকার গ্রামীণফোন ও রবিতে প্রশাসক বসালে সেটি হবে নজিরবিহীন ঘটনা। অবশ্য এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, গ্রামীণফোন নি¤œ আদালতে মামলা করে হেরে যাওয়ায় উচ্চ আদালতে গিয়েছে। আদালতেই বিষয়টি মোকাবিলা করা হবে। তবে এজন্য প্রশাসক বসানোর প্রস্তুতি থেমে থাকবে না। এমন প্রশাসক বসানোর বিষয়ে সরকারের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় এতে সময় লাগতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বৃহস্পতিবার বিটিআরসির পাওনা আদায়-সংক্রান্ত পদক্ষেপের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে আগামী ৫ নভেম্বর আপিল শুনানির জন্য দিনও ধার্য করেছে হাইকোর্ট। গ্রামীণফোনের কর্মকর্তারা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে গ্রামীণফোনের ওপর আরোপিত বিরোধপূর্ণ নিরীক্ষা দাবিটির পাওনা আদায়ে বিটিআরসির যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলো। একই সঙ্গে সরঞ্জাম ও সফটওয়্যার আমদানি, নতুন সেবা ও প্যাকেজ ঘোষণার ক্ষেত্রে অনাপত্তিপত্র প্রদান স্থগিত করে বিটিআরসির দেওয়া চিঠিটির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে আদালতের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, গ্রামীণফোন ও রবির ওপর আদালতের রায় অনুযায়ী নিরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে।  এরপর যে পাওনা দাঁড়িয়েছে, সেটা উদ্ধারেই এই পদক্ষেপ।

 

দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বড় ব্যবসা পরিচালনাকারী বহুজাতিক কোম্পানি দুটির কাছ থেকে বিটিআরসির পাওনা আদায় নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি না সেই প্রশ্নও উঠছে। অবশ্য ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী জাতীয় রাজস্ব তথা জনগণের অর্থ আদায়ের যে যুক্তি দিয়েছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তার যুক্তি হলো, কোম্পানি দুটির সঙ্গে কোনো অন্যায় বা অবিচার করা হলে বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা নিয়ে কথা উঠতে পারে, কিন্তু কোনো অন্যায় না হলে এই শঙ্কা অযৌক্তিক। তবে প্রশাসক বসানো হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভুল সংকেত পাবে বলে  উল্লেখ করে অনেক বিশ্লেষকই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা বা সালিশের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে কোম্পানি দুটি।  গ্রামীণফোন ও রবি শুধু টেলিযোগাযোগ খাতের বড় প্রতিষ্ঠানই নয় উভয়েই বড় কোম্পানি; বিশেষ করে গ্রামীণফোনকে বাংলাদেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বলা যায়।  তাদের সঙ্গে বকেয়া পাওনা আদায়ের ফয়সালা না হলে বিদেশি বিনিয়োগ শুধু নয়, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যদি গায়ের জোর দেখাতে চায় সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশিই হোক কিংবা বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর জন্য ব্যবসার ন্যায়সংগত সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার যেকোনো পদক্ষেপ স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার পথ ধরে এগোবে এবং দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে সেটাই কাম্য।