তুরস্কের কুর্দিবিরোধী অভিযান|175133|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
তুরস্কের কুর্দিবিরোধী অভিযান
জি কে সাদিক

তুরস্কের কুর্দিবিরোধী অভিযান

গত ৯ অক্টোবর থেকে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুর্দি জনগোষ্ঠীর ওপর তুরস্ক সামরিক অভিযান শুরু করে। ১৯২৩ সালের পর থেকে তুরস্কের সঙ্গে কুর্দিদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। ১৯২৩ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে স্বাধীন কুর্দিস্তানের দাবিতে কুর্দিরা ১৬ বার বিদ্রোহ করে। এখনো কুর্দিদের লড়াই চলছে। তবে এখন তারা স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে এসে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়ছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াতে আইএসবিরোধী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে এবং গত ৭ অক্টোবর সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এরপরই ৯ অক্টোবর থেকে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কুর্দি সন্ত্রাসীদের নির্মূলের জন্য এই তুরস্ক সামরিক অভিযান শুরু করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সিরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাকে তুরস্কের সামরিক অভিযানের জন্য ‘সবুজসংকেত’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। কারণ তুরস্ক অনেক আগে থেকে এই অঞ্চলের সিরিয়ায় আইএসবিরোধী যুদ্ধের সময় কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ সশস্ত্র বাহিনী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের কথা বলে আসছিল। তুরস্ক মনে করে, এসডিএফের সঙ্গে তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সুসম্পর্ক রয়েছে এবং এসডিএফ তুরস্কে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে পিকেকেকে সহযোগিতা করছে। তাই তুরস্ক পিকেকের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস বন্ধের জন্য সশস্ত্রগোষ্ঠী এসডিএফকে নির্মূল করতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। এ ছাড়া অন্য আরেকটি কারণ হচ্ছে, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৩৬ লাখ উদ্বাস্তু সিরিয়ান তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। এখন তুরস্ক চাচ্ছে স্বীয় সীমান্ত অঞ্চল থেকে এসডিএফের সম্ভাব্য হুমকি গুঁড়িয়ে দিয়ে এবং কুর্দিদের হটিয়ে একটা ‘সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠা করে ২০ লাখ সিরিয়ান নাগরিকের পুনর্বাসন করতে। দৃশ্যত এসব কারণে গত ৯ অক্টোবর থেকে সিরিয়ার সীমান্ত পার হয়ে তুর্কি সামরিক বাহিনী সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্থল ও আকাশপথে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। নিত্য চলমান এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সমন্বয়কারী বিভাগের (ওসিএইচএ) তথ্য মতে, দুই পক্ষের সংঘর্ষে এই কয়েক দিনে শরণার্থীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, এই সংখ্যা কমপক্ষে চার লাখ।

মধ্যপ্রাচ্যে জনসংখ্যার হিসাবে কুর্দিরা চতুর্থ বৃহৎ জনগোষ্ঠী। বর্তমানের তুরস্কে ২০ শতাংশ, ইরাকে ১৫ শতাংশ, সিরিয়াতে ১০ শতাংশ, ইরানে ৭-১০ শতাংশ এবং কিছু কুর্দি আর্মেনিয়ায় বাস করছে। ইরান ও আর্মেনিয়া বাদে বাকি তিনটি দেশেই কুর্দিরা একটি নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। সময়ে সময়ে এরা বিভিন্নভাবে স্বার্থের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু কুর্দিদের স্বাধীনতার দাবি বা বর্তমানে তাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি কখনো পুরনো হয়নি বা কোনো পক্ষই কুর্দিদের দাবির প্রতি শক্ত অবস্থান নেয়নি। তুরস্কের কুর্দিরা তাদের দেশের জনসংখ্যার হিসাবে ২০ শতাংশ। তা সত্ত্বেও তুরস্কে কুর্দিরা নির্যাতিত জনগোষ্ঠী এবং নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তুরস্ক সব সময় কুর্দিদের দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে এবং তাদের ভাষা, পোশাক ও জাতি-পরিচয়ও মুছে দিতে চেষ্টা করছে। বর্তমানে তুরস্ক তাদের দেশে বসবাসরত কুর্দিদের স্বীয় জাতিসত্তার পরিচয় অস্বীকার করে ‘পাহাড়ি তুর্কি’ নামে অভিহিত করে। তুরস্কে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কুর্দিদের মাতৃভাষার ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল।

তুরস্কের কুর্দি নেতা আবদুল্লাহ ওকালান ১৯৭৮ সালে মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের আদর্শের বিশ্বাসী কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) গঠনের মাধ্যমে স্বাধীন কুর্দিস্তানের দাবি জোরালো করে তোলেন। ১৯৮৪ সাল থেকে পিকেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। তখন পিকেকের হামলার লক্ষ্য ছিল সরকারি স্থাপনা, সরকারি কর্মকর্তা, কুর্দি অঞ্চলে বাসকারী তুর্কি জনগণ এবং তুরস্কের সরকারের সঙ্গে সাহায্য করে চলা কুর্দিরা। তখন তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পিকেকেকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত কুর্দিদের এবং তুরস্কের মধ্যে লড়াইয়ে ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। সব শেষ ২০১২ সালে তুরস্ক পিকেকের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসে এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। আবার নতুন করে পিকেকে সংঘাত শুরু করে ২০১৫ সালে আইএসের হামলায় ৩৩ জন কুর্দি রাজনৈতিক কর্মী নিহত হওয়ার পর। পিকেকে মনে করে তুরস্কের সহায়তায় আইএস এই হামলা চালিয়েছে এবং এরপর থেকে পিকেকে তুর্কি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে। শুরু হয় সংঘাতের নতুন মাত্রা।

তুরস্ক বর্তমানে সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, পিকেকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০০৩ সালে গঠিত ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টির (পিওয়াইডি) সামরিক শাখা পিপলস প্রোটেকশন ইউনিটের (ওয়াইপিজে) নেতৃত্বে ২০১৫ সালে সিরিয়ায় আইএসবিরোধী যুদ্ধের সময় কয়েকটি আরব এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) বিরুদ্ধে। এই এসডিএফ ২০১৫ সালে সিরিয়ার কোবানিকে আইএসমুক্তকরণে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের স্থলবাহিনীর অন্যতম সহযোগী ছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র এসডিএফের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। পিওয়াইডি ২০১৪ সালে কুর্দি সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে কুর্দিস্তান ন্যাশনাল কাউন্সিলের (কেএনসি) প্রধান ছিল। যারা সিরিয়ার আলেপ্পো, রাক্কা ও হাসাকার অংশবিশেষ নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত গণতান্ত্রিক সরকারের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পিওয়াইডি সিরিয়ান সরকারের বিরুদ্ধে তুরস্কের পিকেকের মতো সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়নি এবং সিরিয়াও এদের সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করে না। তুরস্কের অভিযোগ ওয়াইপিজের নেতৃত্ব গঠিত এসডিএফ তুরস্কের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর জন্য পিকেকেকে সাহায্য করছে।

বরাবরই তুরস্কের কুর্দি দমনাভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়রা নিশ্চুপ। বিশেষ করে গত শতকে আশির দশকে ইরাক এবং তুরস্ক দুটি রাষ্ট্রই কুর্দিদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চালায়। তখন আমেরিকা এবং ইউরোপীয়রা ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক কুর্দি দমনাভিযানের তীব্র বিরোধিতা করে এবং ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলকে ‘নো-ফ্লাই জোন’ বলে ঘোষণা করে। কিন্তু তুরস্কের ক্ষেত্রে তারা এটাকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে চলে। কারণ তুরস্ক তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ানদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। তবে বর্তমানের কুর্দিদের ওপর সামরিক অভিযানের নিন্দা করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তুরস্কের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তথাপি তুর্কি প্রেসিডেন্ট স্বীয় অবস্থানের অনড়। তুরস্ক চাচ্ছে দ্রুত এই অভিযান সমাপ্ত করে ‘সেইফ জোন’ প্রতিষ্ঠা করে ২০ লাখ সিরিয়ান অভিবাসীকে স্থানান্তর করতে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট ইউরোপিয়ানদের হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘ইউরোপীয়রা যদি সিরিয়ায় আমাদের মিশন পছন্দ না করে, তাহলে তুরস্কে থাকা ৩৬ লাখ শরণার্থীকে ইউরোপের দিকে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।’ তাই ইউরোপীয়রা এ মুহূর্তে শরণার্থীর হুমকির মুখে আছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে আপসের সুরে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের অর্থনৈতিক অবরোধের সঙ্গে তাল মেলাননি। এমনকি ট্রাম্পের এই অবরোধের সঙ্গে স্বীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সুর মেলাননি। সংবাদমাধ্যম পিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাইক পম্পেও তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে পিকেকের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে তুরস্কের দুশ্চিন্তার কথা তুলে ধরেন এবং তিনি জানান তার সরকার তুরস্কের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। যাতে তুরস্কের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা বন্ধ করা যায় এবং সিরিয়াতে আইএসবিরোধী যুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে তুরস্ক ন্যাটো সদস্য। যার ফলে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো তুরস্কের বিরুদ্ধে তেমন কিছু করবে না। কারণ এটা ন্যাটো সংবিধানের ৫ নম্বর ধারারবহির্ভূত হবে। রাশিয়ার সঙ্গেও তুরস্কের সখ্য রয়েছে। একটি জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে কেন্দ্র করে দুদেশের সম্পর্ক অবনতি হবে, এমনটা দুই পক্ষই চাইবে না। এখন পরিস্থিতির আলোকে বলতে গেলে তুরস্কের সামরিক অভিযানের মুখে সিরিয়ান কুর্দিরা নিঃসঙ্গ। তাদের সামনে আশার আলো তেমন একটা নেই বললেই চলে।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ই-মেইল  : [email protected]