বরিস জনসনের প্রত্যাশার গুড়ে আবার বালি|175344|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
বরিস জনসনের প্রত্যাশার গুড়ে আবার বালি
আবু ইউসুফ

বরিস জনসনের প্রত্যাশার গুড়ে আবার বালি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদপ্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকটাই যেন ব্যক্তিগত অস্বস্তির কারণ। ক্ষ্যাপাটে কিন্তু বলিষ্ঠ, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ভাবমূর্তির নেতা বরিস জনসনের ম্যারাথন ব্রেক্সিট অভিযাত্রাকে খুব ঝামেলাপূর্ণ বিবাহবিচ্ছেদ মামলার সঙ্গে তুলনা করলে খুব একটা অতিশয়োক্তি হবে না বোধহয়। তফাত একটাই মামলার একপর্যায়ে এসে শর্তটর্ত নিয়ে বিচ্ছেদকামী স্বামী বা স্ত্রীর পরস্পরের মধ্যে যতটা না মতবিরোধ, তার চেয়ে বেশি মতান্তর দেখা যাচ্ছে একটি পক্ষের নিজেদের একান্নবর্তী সংসারে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট নিয়ে একেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের রোজনামচার অবধারিত শিরোনাম তাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ গোছের কিছু একটা।

৩৭ বছরের মধ্যে প্রথমবার বন্ধের দিন শনিবার বিশেষ অধিবেশনে বসেছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পাদিত নতুন ব্রেক্সিট চুক্তি অনুমোদন নিয়ে এদিনের নির্ধারিত ভোট শেষ পর্যন্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টিরই আইনপ্রণেতা অলিভার লেটউইনের তোলা একটি সংশোধনী প্রস্তাব পার্লামেন্টে পাস হওয়ায় আটকে যায় ভোটাভুটি। এর ফলে ব্রেক্সিট নিয়ে জটিলতা আরেক দফা বাড়ল। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে বরিস জনসন নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে ব্রেক্সিটের দিনক্ষণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছেন ইইউর কাছে। অথচ শনিবার কাজটি করার কিছু আগেও বলেছিলেন, তিনি দিনক্ষণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করবেন না। এ মাসের শেষদিকেই নতুন আইনের প্রস্তাব করবেন।

কনজারভেটিভ পার্টির এমপি অলিভার লেটউনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে ভোটের আগেই ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদ কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইনগুলো পাস করতে হবে। তাতে ব্রেক্সিটের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে হলেও তা-ই সই। লেটউইনের প্রস্তাবটা অল্প ভোটের ব্যবধানে জিতে যায়। এর পক্ষে ৩২২ এবং বিপক্ষে ৩০৬ ভোট পড়ে। পূর্ব ঘোষণামতো সরকারের অংশীদার উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) ১০ জন এমপিই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। দলটি আগেই বলেছিল তারা প্রধানমন্ত্রীর সম্পাদিত চুক্তি সমর্থন করবে না।

অলিভার লেটউইনসহ ভোটাভুটি বিলম্বিত করার পক্ষের রাজনীতিকরা অনেকে বলেছেন, তারা বরিস জনসনের চুক্তিতে সমর্থন দেবেন। কিন্তু তার আগে প্রয়োজনীয় আইনপ্রণয়নের কাজ শেষ করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে আইনপ্রণয়নের কাজ শেষ না হলে চুক্তি ছাড়াই বিচ্ছেদ কার্যকর করার সুযোগ নিতে পারে সরকার। সে ঝুঁকিটা নিতে চান না তারা।

পার্লামেন্টে শনিবারের সর্বশেষ দফা ধাক্কার পর প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইন পাসের অঙ্গীকার করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তারা ব্রেক্সিট চুক্তির ওপর ভোটাভুটি সারতে চান।

ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদ কার্যকর করতে নতুন একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিকদের উভয়পক্ষ। গত বৃহস্পতিবার ইইউ সম্মেলন শুরুর আগে এই সমঝোতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। তবে চুক্তিটির সহজে পার্লামেন্টের অনুমোদন পাওয়া নিয়ে সংশয় ছিলই। সরকারের অংশীদার ডিইউপি দল আগেই বলেছিল, তারা এই চুক্তিতে সমর্থন দেবে না। খোদ সরকারি দলের ভেতরে ব্রেক্সিট নিয়ে বিদ্রোহের ঝড়ের মধ্যে দশ এমপির আঞ্চলিক দলটির অবস্থান ছিল বোঝার ওপর শাকের আঁটি। ব্রেক্সিট নিয়ে মতান্তরের কারণেই কনজারভেটিভ দলের ২০ জন আইনপ্রণেতাকে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ কারণে পার্লামেন্টে কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। বৃহস্পতিবার নতুন চুক্তি নিয়ে মতৈক্যের পর খুব আশা নিয়ে বলেছিলেন তিনি, ‘দারুণ একটি চুক্তি হয়েছে। এটি দেশের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ফিরিয়ে আনবে।’ ইইউর প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ জাঙ্কারও চুক্তিটিকে ‘ন্যায্য আর ভারসাম্যপূর্ণ’ বলেই আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু দুদিনের মধ্যেই নতুন বাধার মুখে পড়ল এটি।

ব্রিটিশ ভাষ্যকাররা বলছেন, বরিস জনসনের আশার বেলুন ভালোভাবেই চুপসে গেছে ‘অপয়া’ শনিবারে। তিনি বরাবরই বলে আসছিলেন, যা-ই হয়, অক্টোবরের শেষে ইউরোপীয় জোট যুক্তরাজ্য ছাড়বেই ছাড়বে। বিচ্ছেদ বিলম্বিত করার আবেদনের চেয়ে বরং লড়াই করে প্রাণ দিতেও রাজি তিনি।

বরিস জনসনের আগে ইউরোপবিরোধী প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মের ওপর দিয়ে কম ঝড় যায়নি। টেরিজা মের সম্পাদিত চুক্তি পার্লামেন্ট প্রত্যাখ্যান করে তিন তিনবার। যার জেরে বিচ্ছেদের তারিখ ২৯ মার্চ থেকে দুবার পিছিয়ে ৩১ অক্টোবর করা হয়। ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় ব্যর্থতার পরিণতিতেই প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন টেরিজা মে।

টেরিজা মের সময়ের চুক্তি নিয়ে বিরোধের মূল কারণ ছিল উত্তর আয়ারল্যান্ড সীমান্ত। ইইউর সদস্য দ্বীপদেশ স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত উš§ুক্ত রাখতে চুক্তিবদ্ধ যুক্তরাজ্য। টেরিজা মে সম্পাদিত চুক্তিতে আয়ারল্যান্ডের উত্তরের ছয়টি কাউন্টি নিয়ে গঠিত উত্তর আয়ারল্যান্ডকে (যা যুক্তরাজ্যের অংশ) ইইউ আইনের অধীনে রাখার কথা ছিল। এ কারণে বিরোধী দলগুলো তো বটেই, সরকারি দলেরও কট্টর ব্রেক্সিটপন্থিরা তখন সেটি মেনে নেননি। বরিস জনসন বিতর্কিত ওই ধারা বাদ দিয়ে নতুন চুক্তির খসড়া করেন। তারপরও তা অনেককেই সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ। প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের ভাষ্য, নতুন চুক্তিটি টেরিজা মের চুক্তির চেয়েও খারাপ।

চুক্তি কার্যকর তৃতীয় দফা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করে ইইউকে চিঠি লিখতে বরিস জনসন বাধ্য হয়েছেন। কৌতূহলকর বিষয়, ওই চিঠিতে তিনি স্বাক্ষর করেননি। আবার দ্বিতীয় আরেক চিঠিতেই লিখেছেন, তার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, চুক্তি কার্যকর পিছিয়ে দেওয়া হবে ভুল। সেটিতে আবার তার স্বাক্ষর রয়েছে! ব্রাসেলসে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি স্যার টিম ব্যারোর লেখা ‘কভার নোটে’ আবার বলা হয়েছে, আইনের সঙ্গে সংগতি রেখেই প্রথম চিঠিটি পাঠানো হয়েছে। বিবিসির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক লরা কুয়েন্সবার্গের পর্যবেক্ষণ : তিন তিনটি দলিল পাঠানোর সিদ্ধান্তটি বিতর্কের সূত্রপাত করবে। বলা হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী আদালতের রায়কে এড়ানোর চেষ্টা করছেন। তার মতে, শিগগিরই পুরো ব্যাপারটি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত উঠতে পারে। লেবার ও এসএনপি দলের অন্তত দুজন নেতা আইনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দিয়েছেন।

পুরো ব্যাপারটা যে ইউরোপীয় নেতাদের খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। জোটে থাকার জন্য দীর্ঘদিনের সহযোগী ব্রিটিশদের একসময় বেশ সাধাসাধি করা ইউরোপীয়রা দৃশ্যত ক্লান্ত। ইইউ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক বরিস জনসনের চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে বলেছেন, তিনি এখন তাদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন পরবর্তী করণীয় নিয়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বরিস জনসন যেভাবে বিচ্ছেদ বিলম্বিত করার আবেদনে সরকারপ্রধান ও নাগরিক হিসেবে দুই ধরনের মত দিয়েছেন, তা ইইউ নেতাদের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ করে দেবে। তারা প্রথমে এ নিশ্চয়তা চাইবেন, গত সপ্তাহে হওয়া চুক্তিটি পার্লামেন্টে অবশ্যই পাস হবে বলে বরিস জনসন যে অঙ্গীকার করেছেন তা তিনি পালন করবেন। কিন্তু আদৌ কোনো চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত না-ও হয়, তারা এ মুহূর্তেই যুক্তরাজ্যের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেবেন, তা মনে হয় না। বরং তারা ধৈর্য ধরেই হয়তো বিলম্বিত করার আবেদনের কারণগুলো জানতে চাইবেন।

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিকবিষয়ক লেখক