মাঠের ক্রিকেটাররা রাস্তায়|175641|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
মাঠের ক্রিকেটাররা রাস্তায়
১১ দাবিতে ধর্মঘট
মোহাম্মদ খাইরুল আমিন

মাঠের ক্রিকেটাররা রাস্তায়

দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা শীর্ষ ক্রিকেটারদের ক্ষোভ প্রকাশ পেল বিস্ফোরণের চেহারা নিয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছ থেকে বঞ্চিত হতে হতে শেষে প্রবল প্রতিবাদে তারা ঘুরে দাঁড়ালেন। গতকাল, ১১ দফা দাবির ঘোষণা দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ক্রিকেটাররা। সোজা কথায় ধর্মঘট। আর তা বিসিবি তাদের দাবিগুলো মেনে না নেওয়া পর্যন্ত।

গতকাল দুপুরে মিরপুরের ইনডোর স্টেডিয়ামে নিজেদের দাবি নিয়ে আলোচনায় বসেন ক্রিকেটাররা। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান এই আন্দোলনে সামনে আছেন। ইনডোরের শলাপরামর্শ সেরে অ্যাকাডেমি মাঠে আসেন ৫৫/৬০ জন ক্রিকেটার, যাদের মধ্যে জাতীয় দলের সর্বকনিষ্ঠ থেকে সিনিয়র খেলোয়াড়টিও ছিলেন। অবশ্য ছিলেন না ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, যিনি এখন সংসদ সদস্যও।

জাতীয় দলের সাবেক-বর্তমান ১০ খেলোয়াড় ১১ দফা দাবি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরার পর চ‚ড়ান্ত ঘোষণাটা দেন সাকিব, ‘যতদিন পর্যন্ত আমাদের এই দাবিগুলো পূরণ না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমরা আর ক্রিকেটের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকতে চাচ্ছি না।’ খেলোয়াড়রা সরাসরি বোর্ডের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের খেলা          

থেকে সরিয়ে নিলেন। তাতে করে ২৫ তারিখ থেকে শুরু জাতীয় ক্যাম্প, চলমান জাতীয় লিগ এবং ৩ নভেম্বর শুরু প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভারত সফরও অনিশ্চিত হয়ে গেল।

ক্রিকেটারদের এই আন্দোলন আসলে নিজেদের প্রাপ্য সম্মান বোর্ডের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়ার। যোগ্য পারিশ্রমিক-বেতনভাতা নিশ্চিত করার। এর সঙ্গে আছে বিপিএল, ঘরোয়া ফার্স্টক্লাস ক্রিকেট, প্রিমিয়ার লিগ, এবং নিচের সারির লিগগুলোর অবকাঠামো ঠিক করার দাবি। ম্যাচ ফিক্সিং বন্ধ করার হুঁশিয়ারি। আরও আছে অনেক কিছু।

১৯৯৯ সালে নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে আকরাম-বুলবুল-ফারুকসহ দেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা ধর্মঘটে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার সাকিব-মুশফিক-তামিম-মাহমুদউল্লাহ-ইমরুল-সৌম্য-লিটন-মিরাজ-আফিফদের মতো জাতীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের সব খেলোয়াড় যেভাবে একাত্মতা প্রকাশ করে বিপ্লবের সূচনা করলেন তা বাংলাদেশের ক্রিকেটে একেবারে নতুন।

বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে অনূর্ধ্ব-১৯ দল এবং অন্য বয়সিভিত্তিক দলকে বিপ্লবী ক্রিকেটাররা তাদের সঙ্গে যুক্ত করেননি। কিন্তু নারী জাতীয় ক্রিকেট দলসহ নারী ক্রিকেটারদেরও তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহŸান জানিয়ে রেখেছেন সাকিবরা। ‘মহিলা দলের খেলোয়াড়দের আমরা যুক্ত করতে পারিনি কারণ এটা হঠাৎ নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। তাদের যদি কোনো দাবি-দাওয়া থাকে তাহলে আমাদের সঙ্গে একাত্মতা জানাতে স্বাগত জানাই। আমি নিশ্চিত তাদের কিছু দাবি-দাওয়া থাকবে। তারা যদি আসে, একাত্মতা প্রকাশ করে তাহলে পরবর্তী সময়ে তাদের দাবি-দাওয়াগুলো আমরা তুলে ধরতে পারব।’ সাকিব নির্দিষ্ট করে বলে দিলেন, ‘অনূর্ধ্ব-১৯, বয়সভিত্তিক দল বাদে ফার্স্টক্লাস, জাতীয় দল সব এর মধ্যে যুক্ত এবং সেটা আজ (সোমবার) থেকে। জাতীয় লিগ থেকে শুরু করে জাতীয় দলের প্রস্তুতি থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বলেন সব এর সঙ্গে যুক্ত।’

এর আগে সাকিব যখন ধর্মঘটের ডাক দিলেন তখন ক্রিকেটারদের তুমুল তালিতে কেঁপে ওঠে অ্যাকাডেমি মাঠ। সাকিব শেষ টানতে গিয়ে বিসিবিকে কোনো সময়সীমা  বেঁধে দেননি। তবে দৃপ্তকণ্ঠে সমাধানের পথে আসার উদ্যোগ নেওয়ার আহŸান ঠিক জানিয়েছেন, ‘স্বাভাবিকভাবে দাবিগুলো যখন মানা হবে, আলোচনা সাপেক্ষে অবশ্যই সবকিছু সমাধান হবে। এই দাবিগুলো যখন মানা হবে তখন আমরা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যাব।’

নতুন প্রজন্মের জন্য, আগামী দিনের ক্রিকেটারদের জন্য স্বাস্থ্যকর একটা ক্রিকেট সংস্কৃতি রেখে যাওয়ার পণ বিদ্রোহে ফেটে পড়া ক্রিকেটারদের। সাকিবের উচ্চারণ, ‘আমরা সবাই চাই ক্রিকেটের উন্নতি হোক। একজন খেলোয়াড় তিন বছর, চার বছর, দুই বছর খেলবে, কেউ দশ বছর.. .কিন্তু যারা ভবিষ্যতে আসবে তাদের জন্য আমরা একটা ভালো পরিবেশ রেখে যেতে চাই যেখান থেকে আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেট সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।’

সাকিবের হাতে ছিল তাদের দাবি-দাওয়ার পয়েন্ট আউট করা কাগজটা। আর একজন একজন করে খেলোয়াড় এগিয়ে এসে একেকটা দাবি তুলে ধরছিলেন। প্রথম দাবি তুলে ধরেন নাঈম ইসলাম।

দাবি ১: বোর্ড ক্রিকেটারদের যোগ্য সম্মান দেয় না এবং সেটা দিতে হবে। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব যেহেতু খেলোয়াড়দের পক্ষ নেয় না তাই সেটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে। ক্রিকেটাররা নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গড়বেন।

মাহমুদউল্লাহর কণ্ঠে উঠে আসে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে দ্বিতীয় দাবিটা।

দাবি ২: ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ও দল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে হবে। খেলোয়াড় নিজে ঠিক করবেন তার দল। বোর্ড হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

মুশফিকুর রহিম বিপিএল নিয়ে তুলে ধরেন তৃতীয় দাবি।

দাবি ৩ : আগামী মৌসুম থেকে বিপিএল যেভাবে চলছিল সেভাবে চলতে দিতে হবে। দেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিদেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকে সামাঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় খেলোয়াড়দের যোগ্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। দেশের খেলোয়াড়রা নিজেদের গ্রেড নিজেরা নির্ধারণ করবেন।

সাকিব চতুর্থ ও পঞ্চম দাবিতে তুলে আনেন ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটকে দীনতা থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়।

দাবি ৪ : ফার্স্টক্লাসে খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফি ১ লাখ টাকা করতে হবে। প্রথম শ্রেণির খেলোয়াড়দের বেতন অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোতে অনুশীলনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে সব। সারা বছরের জন্য কোচ, ফিজিও, ট্রেনার নিয়োগ দিতে হবে।

দাবি ৫ : ফার্স্টক্লাসে আন্তর্জাতিক মানের বল দিতে হবে। ডেইলি অ্যালাউন্স ১৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে যৌক্তিক অঙ্কে নির্ধারণ করতে হবে। খেলোয়াড়দের বিমানে ভ্রমণের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। জিম, সুইমিংপুল আছে এমন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। হোটেল থেকে মাঠে যাতায়াতের বাস আধুনিক করতে হবে।

ছয় নম্বরে এনামুল হক জুনিয়র তুলে আনলেন জাতীয় দলের বঞ্চনার কথা।

 

দাবি ৬ : বোর্ডের সঙ্গে জাতীয় দলের চুক্তিভুক্ত খেলোয়াড়ের সংখ্যা ৩০ জন করতে হবে। তিন বছর ধরে বাড়ছে না যে বেতন তা বাড়াতে হবে।

তামিম ইকবাল দেশের অবহেলিত গ্রাউন্ডসম্যান, কোচ, আম্পায়ার, ফিজিও, ট্রেনারদের কথা বললেন সাত নম্বরে।

দাবি ৭ : গ্রাউন্ডসম্যানদের সম্মানজনক এবং যৌক্তিক বেতন দিতে হবে। দেশের কোচদের উন্নতির সুযোগ দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। বেতনও দিতে হবে ভালো। আম্পায়ার, ফিজিও, ট্রেনারদেরও ভালো বেতন নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশিদের ওপরে দেশিদের প্রাধান্য দিতে হবে।

এনামুল হক বিজয় আট নম্বর দাবিতে আরও বেশি লিগের কথা বললেন।

দাবি ৮ : আরেকটি ওয়ানডে টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করতে হবে। আগের মতো চারদিনের টুর্নামেন্টের পর ওয়ানডে ম্যাচ থাকতে হবে। বিপিএলের আগে আরেকটি টি-টোয়েন্টি আসর নিশ্চিত করতে হবে।

 

নুরুল হাসান সোহান নয় নম্বর দাবিতে নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডারের প্রসঙ্গ তুললেন।

 

দাবি ৯ : ঘরোয়া আসরে নির্ধারিত ক্যালেন্ডার থাকতে হবে। খেলোয়াড়রা যাতে এভাবে সারা বছর ক্রিকেটের মধ্যে থাকতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

জুনায়েদ সিদ্দিকির দশ নম্বর দাবিটা নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের পারিশ্রমিক পাওয়ার।

 

দাবি ১০ : শেষ প্রিমিয়ার লিগেও একটা দল খেলোয়াড়দের পুরো পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দেয়নি। বোর্ডের কাছে বারবার গিয়েও লাভ হয়নি। প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিগের পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টা বোর্ডকে নিশ্চিত করতে হবে।

 

১১ নম্বর দাবিতে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার নিজস্ব স্বাধীনতার কথা বললেন ফরহাদ রেজা।

দাবি ১১ : দুটির বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে বারণ। জাতীয় দলে না থাকলে অবসর সময়ে বাইরে খেলতে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

শেষটায় আরও একবার সামনে এগিয়ে আসেন সাকিব। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্নীতি যে শুধু ক্রিকেটকে কলুষিত করে তা নয়, খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারও ধ্বংস করে। রাখঢাক না রেখে প্রত্যয়ী উচ্চারণে সাকিব বললেন, ‘ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড ডিভিশনের মান আমরা সবাই জানি। ম্যাচে যাওয়ার আগে অনেক সময় জেনে যাওয়া হয় যে কোন দল জিতবে, কোন দল হারবে। এটা আসলে আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। এটা ঠিক করা জরুরি বলে আমরা মনে করি।’ এসব ক্ষেত্রে আম্পায়ারদের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারে বলে সাকিব জানিয়ে গেলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের উঠে আসতে দিতে হলে পাইপলাইনের এই জায়গাটা ঠিক করা খুবই জরুরি।’

দেশের ক্রিকেটাররা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, ক্রিকেট বোর্ড আসলে ডুবে আছে অন্ধকারে। সেই আঁধার থেকে আলোর পথে বেরিয়ে আসার পথনির্দেশও রইল এই দাবি-দাওয়ার মধ্যে। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে এখন বিসিবি। বলও তাদের কোর্টে। এরপর? সময় বলবে সব। তবে দীর্ঘসূত্রতায় সর্বনাশ নিশ্চিত।