সাকিবের শাস্তি নিয়ে আবেগ ও যুক্তির বিবেচনা|177887|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
সাকিবের শাস্তি নিয়ে আবেগ ও যুক্তির বিবেচনা
এ কে এম খাদেমুল হক

সাকিবের শাস্তি নিয়ে আবেগ ও যুক্তির বিবেচনা

‘সাকিবের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি কার বিপক্ষে দাঁড়াবেন সেটাও বলুন? পাপন ও মাশরাফিকে বিডি ক্রিকেট থেকে কিক-আউট করার সময় অনেক আগেই হয়েছে। ক্রিকেট আর রাজনীতি একসঙ্গে চলে না।’

এটা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের একজন ‘রাজনীতিসচেতন’ ছাত্রের ফেইসবুক স্ট্যাটাস। বাজিকরের সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনা কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বাংলাদেশের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিষিদ্ধ করার পর এমন স্ট্যাটাসে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি সম্ভবত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন; অভিযোগ, ইগোর লড়াইয়ের কারণে সাকিবের শাস্তির ব্যবস্থাটা তিনিই করেছেন! কেউ কেউ আবার একধাপ এগিয়ে এখানে আইসিসির ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন। দীপক আগারওয়াল নামে যে বাজিকরের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল সাকিবের, তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কারও কারও তো শঙ্কা তিনি আইসিসিরই এজেন্ট, সাকিবকে বিপদে ফেলতে গোপন মিশনে নেমেছিলেন। মোদ্দা কথা, সাকিব আসলে ষড়যন্ত্রের শিকার, বিসিবির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানোর কারণেই হঠাৎ করে এমন কঠোর শাস্তি পাচ্ছেন। বাজিকর প্রস্তাব দিয়েছে, সাকিব সম্মত হননি, তাহলে এত কঠোর শাস্তি কেন, তা-ও আবার ঠিক ভারত সফর শুরুর আগে এই প্রশ্নে ঝড় উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

একজন আইনজীবী তো একধাপ এগিয়ে আইন বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন, যে আইনের ধারায় সাকিবকে শাস্তি দিচ্ছে আইসিসি, সেই আইনে নাকি তার বিচারই হতে পারে না! আসলেই কি তাই? আসল ঘটনাপ্রবাহে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক আগে। আইসিসির তদন্তে খুঁজে পাওয়া এবং সাকিবের স্বীকারোক্তিতে প্রমাণিত অভিযোগগুলো এ রকম

১. ২০১৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) চলাকালে আগারওয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ হয় সাকিবের। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ বিনিময়ের একপর্যায়ে সাকিব তার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হন।

২. দ্বিতীয় দফা যোগাযোগ ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে, বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে-শ্রীলঙ্কা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের সময়। ওই সময় আগারওয়ালের পাঠানো মেসেজ, ‘আমরা কি কাজটা এইবারেই করব, নাকি আমি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করব?’

৩. চার দিন পর আরেক মেসেজে আগারওয়ালের প্রশ্ন, ‘ভাই, এই সিরিজে কি কিছু হবে?’

৪. এরপর আইপিএল। টুর্নামেন্ট চলার মধ্যে ২৬ এপ্রিল দীর্ঘ বার্তাবিনিময়, যেখানে দলের একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় সম্পর্কে স্পর্শকাতর তথ্য চাওয়া থেকে শুরু করে বিট কয়েন, ডলার অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ চলে। আগারওয়াল সাকিবের কাছে তার অ্যাকাউন্ট নম্বর চান, সাকিব জানান তিনি ‘আগে দেখা করতে’ চান।

৫. এ ঘটনাবলির মাঝপথে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এমসিসির ক্রিকেট কমিটির সভায় যোগ দিয়েছিলেন সাকিব। সেই সভায় দীপক আগারওয়ালের ছবি দেখিয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছিল তার পরিচয় এবং রহস্যজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে।

পাঁচ মাস ধরে চালিয়ে আসা এই যোগাযোগ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে কিছুই জানাননি সাকিব। অন্তত আইসিসির তদন্ত দলের কাছে তিনি নিজে স্বীকার করেছেন এ রকম। সেটা কখন? সাকিব আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন ইউনিট আকসুর জেরার মুখোমুখি হয়েছেন ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি এবং ২৭ আগস্ট। বাংলাদেশে এসেই এই জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা। দ্বিতীয় দফার জেরার সময় সাকিবকে জানানো হয় তার সম্ভাব্য শাস্তির কথা, তিনি সবকিছু স্বীকার করে তা মেনে নেন। তাকে এটাও জানানো হয়, এই সম্মতির অর্থ তিনি আপিল করার সুযোগ পাবেন না। আকসুর প্রতিবেদন আইসিসির সভায় উপস্থাপন করতে হয়, শাস্তিটা নিশ্চিত করা হয় সেখানেই। ২৭ আগস্টের পর আইসিসির প্রথম সভা ছিল ২৯ অক্টোবর, সেখানেই নিশ্চিত হয় সাকিবের শাস্তি। এর মাঝখানে, ২১-২৪ অক্টোবর ঘটে যায় অন্য একটি ঘটনা, সাকিবের নেতৃত্বে আন্দোলনে নেমেই হঠাৎ করে খেলা বয়কটের ডাক দেন বাংলাদেশের পেশাদার ক্রিকেটাররা। বিসিবি দাবি মেনে নেওয়ায় মিটেও যায় সবকিছু। কিন্তু বয়কটের মধ্যে বিসিবির নিয়ম উপেক্ষা করে সাকিব ব্যক্তিগত চুক্তি করেন একটি মোবাইল কোম্পানির সঙ্গে, জানতে পেরে বিসিবিপ্রধান গণমাধ্যমকে বলেন, এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে সাকিবের কাছে।

দুই. একটু মনোযোগ দিয়ে পুরো ঘটনাপ্রবাহ খেয়াল করলে, মগজটাকে একটুখানি ব্যবহার করলে পরিষ্কার বোঝা যাবে, এ ঘটনায় সাকিব, আইসিসি, আকসু এবং বিশেষ করে বিসিবি এবং বিসিবিপ্রধানের ভূমিকা কী! সাকিব বুদ্ধিমান, যে কারণেই হোক তিনি যে ভুল করেছেন সেটা অকপটে মেনে নিয়েছেন। আকসুর কাছে বলে এসেছেন, সংবাদমাধ্যমকেও একই কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা সেটা মানতেই চাইছি না। চিহ্নিত বাজিকরের সঙ্গে মাসের পর মাস সাকিবের মেসেজ বিনিময় আমাদের কাছে ‘নির্দোষ’ ভুলমাত্র, এরপরও আমাদের সংবাদমাধ্যম লিখছে তিনি আগারওয়ালকে পাত্তাই দেননি, তার প্রস্তাব গ্রহণও করেননি, তাহলে তাকে কেন শাস্তি পেতে হবে? আইসিসির আইনে যদি এটা থেকে থাকে, তাহলে আইনটাই ভুল। আর এই ভুল আইনে তার শাস্তিটা নিশ্চিত করতে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন পাপন। ঘটনা আগের? তাতে কী! তিনি তো জানতেন, এত দিন চেপে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন, সময়মতো পকেট থেকে বের করে নিয়েছেন।

কেন এমন হচ্ছে? কারণ আর কিচ্ছু না, বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্রিকেট একটা আবেগের নাম। স্বাধীনতার পর এই একটা জায়গায়ই আমরা কেবল বিশ্বসেরাদের কাতারে যেতে পেরেছি। বিশ্বকাপ না জিতলেও অন্তত নিয়মিত খেলছি, মাঝেমধ্যে দু-একবার বিশ^ চ্যাম্পিয়নদের হারিয়েও দিয়েছি। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি দিয়ে শুরু, এরপর গত দুই দশকে রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষকে নির্মল আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে এই ক্রিকেট। তাই আমরা ক্রিকেট খেলাকে অনুসরণ করার সময় মগজকে ব্যবহার করি না, ব্যবহার করি হৃদয়কে। আবেগের কাছে এখানে যুক্তি অসহায়!

আর যুক্তিগুলোও এমন, যে আমাদের কাছে সেগুলো তুচ্ছ ব্যাপার মনে হতেই পারে। এটা তো সেই দেশ, যে দেশে ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাওয়ার পর মন্ত্রী বলেন ‘সামান্য ব্যাপার’; শেয়ারবাজারের নিরীহ বিনিয়োগকারীদের শতকোটি টাকা মেরে দেওয়ার অপরাধে চিহ্নিত হওয়ার পরও কারও বিচার হয় না, পাঁচশ টাকার বালিশ বেয়াল্লিশ হাজার টাকায় কেনা হয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্রদের ন্যায্য দাবির পক্ষে কথা বললে তাকে শাসায় আদুভাই ছাত্রনেতারা, সহকর্মীরা তারই বিরুদ্ধে মানববন্ধন করলে বলা হয় তারা ষড়যন্ত্র করছেন; প্রতিবাদ করলে পুরনো মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। এমন সব কর্মকাণ্ডে অভ্যস্ত চোখে তাই সাকিব ‘নির্দোষ’। তার দোষ একটুখানি, ‘ছেলেটা একটু বেয়াড়া’। মাথা নোয়াতে জানে না। আইসিসির আইনে যা-ই থাকুক, যতবারই তাকে সেই আইনের ব্যাপারে সতর্ক করা হোক, সাকিব চাইলে সেটা মানবেন, না চাইলে না। ইচ্ছে হলে তিনি বাজিকরকে বাজিয়ে দেখবেন নিজস্ব পদ্ধতিতে, মাসের পর মাস হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ রাখবেন, চাই কি ডলার অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে ‘আগে দেখা করে’ কথা বলবেন, এটা এমনকি দোষের? টাকা নিয়েছেন এটা তো আর প্রমাণিত হয় নাই, নিয়ে অন্যায় কিছু করেছেন তা-ও না। তার এত বড় শাস্তি কী করে হতে পারে?

তিন. এই যে ধারণাতত্ত্ব, যা আমাদের ভক্তকুলের চোখে ঠুলি পরিয়ে রেখেছে, সেটা কিন্তু এমনি এমনি গড়ে ওঠেনি। সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটতে দেখেই গড়ে উঠছে আমাদের দেখার চোখ। আর সেটাকে উসকে দিয়েছে বিসিবিপ্রধান এবং আইসিসির কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা। বিসিবিতে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে রেখে, আর দিনের পর দিন সংবাদমাধ্যমে ক্রিকেট নিয়ে, ক্রিকেটারদের নিয়ে অযাচিত, অপেশাদার মন্তব্য করে বিসিবিপ্রধান নিজেকে প্রায় কৌতুক অভিনেতার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। এই যেমন, এই সাকিব প্রসঙ্গেই তিনি দাবি করেছেন ২৯ অক্টোবরের আগে কিছুই জানতেন না। আইসিসির তদন্ত দল দেশে এসে দুবার সাকিবের মতো ক্রিকেটারকে জেরা করেছে, আর বিসিবিপ্রধান সেটা জানেন না, এ-ও কি সম্ভব? তার এই রকম অপেশাদার আচরণের কারণেই লোকে ভুলে যায়, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সময়টা পার করেছে তার সময়েই।

আইসিসির ব্যাপারে বাংলাদেশি ক্রিকেটভক্তদের বিরাগ-বিতৃষ্ণার মূলেও রয়েছে ক্রিকেটের এই বিশ্ব সংস্থার কিছু একপেশে নীতি। কিন্তু সেটাকে আসলে উসকে দিয়েছে বাঙালির আবেগ। ক্রিকেট যে হয়ে উঠেছে আমাদের জাতীয়তাবাদী প্রচারণার হাতিয়ার! এ এমনই এক মতবাদ, যেখানে কেবল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রচারণাই যথেষ্ট নয়, সঙ্গে দরকার একটা প্রতিপক্ষও। বাংলাদেশি ক্রিকেট-জাতীয়তাবাদীদের কাছে সেই প্রতিপক্ষ যুগপৎ আইসিসি এবং ভারত। এই দুই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণার বেসাতি খুব চলে, কারণ ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে হলেও সে ঘৃণা ছড়ানোর উপকরণ বের করা সম্ভব। এই যেমন, সাকিবের বিরুদ্ধে ২২ মাসের পুরনো অভিযোগ কেন ঠিক বাংলাদেশের ভারত সফরের আগেই উন্মোচিত হলো, সেই প্রশ্ন তোলা যায়! আইসিসি যতই বলুক, অভিযোগ খুঁজে বের করতে, সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে সময় লাগে। সেটা সত্যি হলেও এ প্রশ্নটা উঠবেই, কেন বারবার ঠিক ভারত সফরের আগেই কাকতালীয়ভাবে প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ করার একটা না একটা উপায় বের হয়েই যায়! তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, সাকিবকে তো শাস্তি দিল; দীপক আগারওয়ালদের মতো বাজিকরদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে আকসু? আইসিসির বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, সাকিবসহ বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে আগারওয়ালের যোগাযোগ ঘটেছিল একজন ‘পরিচিত ব্যক্তি’র মাধ্যমে। রহস্যময় এই লোকটির পরিচয় কিন্তু প্রকাশ করা হয়নি, যদিও তার শাস্তি হওয়াটা আরও জরুরি ছিল। এসব প্রশ্নের যত দিন যুক্তিসংগত উত্তর না মিলবে, তত দিন যুক্তির ধার ধারবেন না ভক্তরা। আবেগ দিয়েই বিচার করবেন সবকিছু।

মুশকিল হচ্ছে, তাতে সাকিবদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই হচ্ছে বেশি নিজেকে যতই পেশাদার দাবি করুন, ভক্তদের এই অন্ধ ভালোবাসার ভুল বার্তাই তো তাদের এমন অপেশাদার ভুলের পথে নিয়ে যায়!

লেখক

সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]