সড়ক দুর্ঘটনা বনাম উন্নত দেশের স্বপ্ন|177888|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
সড়ক দুর্ঘটনা বনাম উন্নত দেশের স্বপ্ন
সালেক খোকন

সড়ক দুর্ঘটনা বনাম উন্নত দেশের স্বপ্ন

সড়ক দুর্ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনা দিয়েই শুরু করছি। ঘটনাটি পুরনো হলেও এর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তার প্রিয়জনরা। ছেলেটির নাম ইসমত মনি। পড়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়, ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগে। প্রতিভাবান শিল্পী ও কবি ছিল সে। তার বন্ধুসুলভ আচরণে অল্প সময়েই সে সবার মধ্যমণি হয়ে ওঠে। কিন্তু একদিন হঠাৎ সবাইকে ফাঁকি দিয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয় মনিকে। কিন্তু তার মৃত্যু নিয়ে অগণিত প্রশ্ন থেকেই যায়। আজও সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন তার বন্ধু ও প্রিয়জনরা। কী ঘটেছিল ইসমত মনির জীবনে?

বন্যায় তখন আক্রান্ত ঢাকার আশপাশ। মনির বাড়ি বাসাবোতে হলেও ক্লাস করার সুবিধার্থে চলে আসে বোনের বাসায়, ইন্দিরা রোডে। চিত্র প্রদর্শনীর একটি আয়োজন চলছিল তখন। তাই কিছু কেনাকাটার জন্য বের হয় মনি। দুপুরের ঠিক পরে হেঁটে চলে ফার্মগেটের পথে। হঠাৎ বিকট শব্দ! পেছন থেকে দ্রুতবেগে এসে একটি প্রাইভেট কার ধাক্কা দেয় তাকে। ছিটকে পড়ে মনি। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে রাস্তায়। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় ক্রমাগত। প্রথমে কেউই এগিয়ে আসে না। পরে এক ছাত্রী উদ্যোগী হয়ে মনিকে নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেলে। হাসপাতালের বিছানায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ছটফট করে সে। অতঃপর রাতেই মারা যায় চারুকলার এই মেধাবী ছাত্র।

মনিকে নিয়ে এরপর যা ঘটেছে তা আরও বেদনাবহ। বাহাত্তর ঘণ্টা অতিবাহিত হয়নি তখনো। তবু অজ্ঞাত কারণে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা পরই মনির লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। ৪৩০ নম্বর বেওয়ারিশ লাশ হিসেবেই তাকে দাফন করা হয় আজিমপুরে। শেষবারের মতো সন্তানের মুখটিও দেখতে পারেনি বাবা-মা। যে ছেলেটির জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই ঢাকা শহরেই, তাকেই হতে হয়েছে বেওয়ারিশ লাশ। প্রিয়জনদের কাছে এর চেয়ে কষ্টের আর কি হতে পারে!

ওই সময় মনির জন্য পথে নামেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা। দুর্ঘটনাকে হত্যা উল্লেখ করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেন তারা। সে সংবাদ প্রকাশিত হয় তখনকার গণমাধ্যমগুলোতে। এটুকুই। এরপর কেটে যায় প্রায় একুশ বছর। নানা ঘটনার ডামাডোলে অন্তরালে চলে যায় মনির মৃত্যুর ঘটনাটিও। কিন্তু তার সহপাঠীরা আজও মেনে নিতে পারেননি সড়কে প্রিয় বন্ধুর প্রাণ হারানো ঘটনাটিকে। মনিকে তারা বাঁচিয়ে রেখেছেন তাদের সত্তায় ও কাজে।

কানাডায় বসবাসরত ভিজুয়াল আর্টিস্ট আসমা সুলতানা মিতা, মনির সহপাঠী ও বন্ধু। তার শিল্পকর্মে তিনি নানাভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন প্রয়াত বন্ধুর না বলা কথাগুলো। মনিকে নিয়ে সেসব চিত্রকলার বর্ণনা শুনতে গিয়েই জানা হয় সড়কে তার অকালপ্রয়াণের ঘটনাটি।

সড়কে মৃত্যুর ঘটনা কি কমেছে? উত্তরটি সবারই জানা। সম্প্রতি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন বলছে, গত বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ। যার ৪২ শতাংশের মৃত্যু ঘটেছে গাড়িচাপার ঘটনায়। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে সারা দেশে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪ হাজার ৪৩৯ জনের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪২৫ জন। ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকায়। ৩৩৯টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩৪৬ জনের। আবার যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান মতে, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৭ হাজার ২২১ জনের মৃত্যু ঘটেছে। সড়কে মৃত্যুর পর মনির মতো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে কতজনকে? সে হিসাব জানা নেই আমাদের। বেওয়ারিশ লাশের হিসাবটা জানানো হয় না কোনো জরিপ বা প্রতিবেদনে। ফলে ঘটনার পেছনের ঘটনাটি চাপাই পড়ে থাকে।

গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হয়। ফলে সারা দেশে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে নজিরবিহীন আন্দোলন শুরু করে। ওই সময় পরিবহন খাতের বিভিন্ন স্তরে বিশৃঙ্খলার বিষয়গুলো গণমাধ্যমে উঠে আসে। সরকারেরও টনক নড়ে তখন। দাবির মুখে সড়ক ও পরিবহন আইনপ্রণয়নের কাজ শুরু করে তারা। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সড়ক পরিবহন আইনটি সংশোধন করে সরকার। পহেলা নভেম্বর থেকে তা কার্যকরও করা হয়েছে। তাই বলা যায়, এটি অবশ্যই সরকারের প্রশংসিত উদ্যোগ।

এই সংশোধিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৩০৪ বি ধারাতে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। আইনের ১১৪ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদিও ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮) প্রযোজ্য হবে।

কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইন সংশোধন করাই কি যথেষ্ট? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের দুর্ঘটনা কমাতে সবাইকেই সচেতন হতে হবে। গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি স্কুলের পাঠ্যসূচিতেও সড়ক দুর্ঘটনা রোধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যা করা হয়নি এখনো। এ ছাড়া ট্রাফিক নির্দেশনা অমান্য করা, যত্রতত্র গাড়ি রাখা, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া যাত্রী তোলা বা নামানো, ওভারটেক করা, প্রতিযোগিতা বা বেপরোয়া গাড়ি চালনা, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস বা জেব্রাক্রসিং থাকার পরও তা ব্যবহার না করার প্রবণতা প্রভৃতি বিষয়ে প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে। নাগরিকদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আইন মানার মানসিকতা তৈরি হতে হবে। অন্যথায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বিশেষ প্রয়োজন।

আবার সড়কে নিরাপদ রাখতে যে আইনগুলো ইতিমধ্যেই প্রণীত হয়েছে এবং ট্রাফিক চলাচলের জন্য যেসব সুবিধাদি আমাদের রয়েছে, সেটাকেই আমাদের মেনে চলতে হবে। এ দেশে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকে। আবার যেকোনো অজুহাতেই তারা স্ট্রাইক করে বসে। ফলে পুলিশ বা প্রশাসন যে আইন সাধারণ মানুষের প্রতি প্রয়োগ করতে পারে সহজে, সে আইন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে ভয় পায়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে রাজনৈতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে জিরো টলারেন্সের ঘোষণাও দেওয়া প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রে আইন সমানভাবে কার্যকর করা উচিত। পাশাপাশি বাস-ট্রাকের দক্ষ ড্রাইভার তৈরিতেও সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘ পথে শিফটিং পদ্ধতিতে দুজন ড্রাইভার নিয়োগের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

সড়কে একের পর এক জীবন যাবে আর আমরা উন্নত বাংলাদেশের দাবি করবÑ এটা হাস্যকর বিষয় ছাড়া আর কিছুই হবে না! উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নের পথে চলতে যে করেই হোক সড়কে মৃত্যুর ঘটনাকে কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। পাশাপাশি সচেতন হতে হবে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও সব নাগরিককেই। প্রতিটি মানুষেরই মৃত্যু হবে। তবে সেটা হোক স্বাভাবিক নিয়মে। কারও শেষ বিদায় দিনটি যেন মনির মতো না হয়। সড়কে মানুষের জীবন হোক নিরাপদ। মানুষের মৃত্যু যেন সড়কে না হয়। বরং মৃত্যু হোক সড়ক দুর্ঘটনার।

লেখক : লেখক ও গবেষক

[email protected]