সুদীপের লড়াই পথ দেখাক |179173|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
সুদীপের লড়াই পথ দেখাক

সুদীপের লড়াই পথ দেখাক

অদম্য প্রাণশক্তি দিয়ে যে কোনো প্রতিকূলতা বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করা যায়, তার বহু দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে রয়েছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে লুই ব্রেইল নামে এক দৃষ্টিহীন ফরাসি বালক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের লেখাপড়ার পদ্ধতি আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। তার আবিষ্কৃত ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশুনা করে ১৯০৪ সালে প্রথম স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন হেলেন কেলার। শুধু প্রথম স্নাতক ডিগ্রি অর্জনই নন, হেলেন কেলার স্মরণীয় হয়ে আছেন আরও নানা কারণে। বাংলাদেশেও সুদীপ দাস নামে এক অদম্য মেধাবী তরুণের সন্ধান মিলেছে, যিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। শুধু তাই নয়, বিচারক হওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএস) ১৩তম সহকারী জজ নিয়োগের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু শ্রুতি লেখকের অনুমতি না থাকায় তাকে শেষ পর্যন্ত আশাহত হতে হয়েছে।

ময়মনসিংহের সন্তান সুদীপের দুবছর বয়স থেকেই দৃষ্টিশক্তি কমে আসতে থাকে। রেটিনায় সমস্যার কারণে প্রায় অন্ধ হয়ে গেছেন। শ্রুতিলেখকের সহায়তা নিয়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে বন্ধুদের সহায়তায় ২০১৪ সালে স্নাতক এবং ২০১৬ সালে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর বিচারক হওয়ার ইচ্ছেপূরণ করতে তিনি ২০১৭ সালে বিজেএস পরীক্ষায় আবেদন করেন। প্রবেশপত্র পেলেও শেষ মুহূর্তে নিয়মে নেই বলে অভিমানে পরীক্ষা দেননি। ২০১৮ সালে পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলেও সুযোগ না মেলায় প্রতিবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসেন। এবারও তিনি বিজেএস পরীক্ষায় আবেদনের পর শ্রুতিলেখকের সুযোগ চেয়ে গত ৪ নভেম্বর জুডিশিয়াল কমিশনে আবেদন করেন। আইনি সহায়তা নেওয়ার প্রচেষ্টাও চালান। সুদীপের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কুমার দেবুল দে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটটি গ্রহণ করার পর গতকাল বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালত এই বিষয়ে রুল বা নির্দেশনা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের এই সংক্রান্ত যে বিধান রয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য আবেদন করতে বলেছে।

২০০৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রবেশ পদে নিয়োগ বিষয়ক আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর

কৃতকার্যদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হবে। সেখানে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যদি কাউকে শারীরিক বৈকল্য বলে প্রতিবেদন দেন, তবে তিনি নিয়োগের যোগ্য হবেন না।’ স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই আদেশে চোখের কোনো রোগ বা অস্বাভাবিকতা আছে কি না তা পরীক্ষা করানোর কথা বলা আছে। তির্যক দৃষ্টিসম্পন্ন বা চোখের এমন কোনো রোগ বা সমস্যা যা প্রার্থীকে ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালনে অক্ষম করে তুলতে পারে সেই প্রার্থীকেও অযোগ্য বলে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।

সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে আছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী ও পুরুষভেদ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে। ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের ১৬ ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সম্পর্কে ঝ উপধারায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে নিযুক্তিতে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। সেক্ষেত্রে বিজেএসের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য শ্রুতিলেখক নেওয়ার বিধান না থাকা সংবিধান এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে তাদের জন্য সুযোগ না থাকাটা প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষা থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য শ্রুতিলেখকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা বিচারক নিযুক্ত হয়েছেন। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীকে বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাই বাংলাদেশেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সকল প্রতিবন্ধীর জন্য সমান সুযোগের দ্বার অবারিত করা প্রয়োজন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮ জন। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৭ ভাগেরও অধিক প্রতিবন্ধী। এর মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৫৪। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতে কোনো বৈষম্যের শিকার না হন, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এক্ষেত্রে সুদীপ প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে একটা দৃষ্টাান্ত রেখে গেলেন। তিনি আপাত সফল না হলেও তার এই দৃষ্টান্ত রাষ্ট্রকে পথ দেখাবে।