আইনের শাসন ও গণতন্ত্র ছাড়া দুর্নীতি দমন সম্ভব নয় |179344|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৮ নভেম্বর, ২০১৯ ১৮:২৬
আইনের শাসন ও গণতন্ত্র ছাড়া দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়

আইনের শাসন ও গণতন্ত্র ছাড়া দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খানের জন্ম ১৯৩৯ সালে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে কাজ করার পর তিনি সাংবিধানিক পদ মহা-হিসাব নিরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি থেকে অবসরের পর ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, সমাজের নানা পর্যায়ে দুর্নীতির বিস্তার এবং দুর্নীতি বন্ধের উপায় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এম হাফিজ উদ্দিন খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে এখন যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে জনগণ তার সুফল পুরোপুরি পাচ্ছে না সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কারণে। এমনকি সরকারের নীতিনির্ধারকরাও এ কথা বলছেন। তাহলে দুর্নীতি দূর না হওয়ার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
এম হাফিজ উদ্দিন খান : প্রথম কথা হলো দুর্নীতি আমাদের দেশে ছিল, আছে এবং থাকবে। দুর্নীতি দমন করার লক্ষ্যে আমরা বহুদিন ধরে লড়াই করছি, টিআইবি থেকে, সুজন থেকে। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনে না। যখনই দুর্নীতি নিয়ে আমরা কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করি, তখনই আমাদের সমালোচনা করা হয়। এটা একটা সমস্যা। কারণ সরকার যদি একসেপ্ট না করে যে, দুর্নীতি আছে তাহলে সেটা কীভাবে দূর করা যাবে? টিআইবি হোক বা অন্য কোনো সংস্থা, কেউ যখন দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিবেদন দিচ্ছে, তখন আগে সেটা শোনা প্রয়োজন, সেটার তদন্ত ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। তা না করে একে বিদেশি ষড়যন্ত্র বা এটা সেটা বলে খারিজ করে দিলে কীভাবে হবে। দ্বিতীয়ত, এখন দেশে যে অনেক বড় বড় দুর্নীতির কথা প্রকাশ হচ্ছে, গণমাধ্যমে একটার পর একটা খবর বের হচ্ছে এসব আসলে কতটা আমলে নেওয়া হচ্ছে? এত দিন কেন এসব ধরা পড়েনি, কীভাবে এসব হলো সেসব নিয়ে তদন্ত করা, দোষীদের খুঁজে বের করার ঘটনা কিন্তু আমরা খুব একটা দেখছি না। তাহলে দুর্নীতি বন্ধ হবে কীভাবে?

দেশ রূপান্তর : টিআইবির দুর্নীতিবিষয়ক নানা প্রতিবেদন নিয়ে একটা অভিযোগ রয়েছে যে, সংস্থাটি নিজে কোনো প্রাইমারি ডেটা সংগ্রহ করে না, বরং সেকেন্ডারি ডেটা নিয়ে কাজ করে থাকে। এই পদ্ধতি কি ত্রুটিপূর্ণ নয়। আপনি কী মনে করেন? এ বিষয়ে আপনাদের ব্যাখ্যা কী?
এম হাফিজ উদ্দিন খান : টিআইবি বাংলাদেশে নিজেরা যেসব কাজ করে থাকে, সেক্ষেত্রে আমরা প্রতিটি তথ্যের উৎস উল্লেখ করি। ধরুন ওয়াসা নিয়ে যে কাজ হলো বা পার্লামেন্টের কয়েকটি সেশন নিয়ে, এসব ক্ষেত্রে আমরা তাদের প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করেছি। আর করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) যেটা আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হয়, সেক্ষেত্রে যে দেশ সম্পর্কে প্রতিবেদন দেওয়া হয় সেদেশের চ্যাপ্টার ইনভলব থাকে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন আমরা থাকি না। কিন্তু এসব বিষয়ে ৫ থেকে ৯টি পর্যন্ত স্বীকৃত উৎস থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয় এবং প্রতিবেদনে সেসব উল্লেখ থাকে। কাজেই এই অভিযোগের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেই মনে করি।

দেশ রূপান্তর : এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকারি নানা প্রকল্পের পরিকল্পনা পর্বেই অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। রূপপুরের বহুল আলোচিত ‘বালিশ দুর্নীতি’র পরও চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয় প্রস্তাবে একই রকম ‘বালিশ দুর্নীতি’র অপচেষ্টা দেখা গেছে। ক্রয় প্রস্তাবে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর কারণে পরিকল্পনা কমিশন এমন কয়েকটি প্রকল্প সংশোধনের জন্য ফেরৎ পাঠায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি করার নীলনকশা হিসেবেই বিভিন্ন খাতে এমন মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়।
এম হাফিজ উদ্দিন খান : একটা সময় আমি দেখেছি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা যখন কোনো প্রকল্প প্রস্তাব করে তখন শুরুতে তার ব্যয় কম দেখায়, যাতে প্রস্তাবটা বাতিল না হয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে বলা হয় যে, প্রস্তাবনায় দাম সঠিকভাবে ধরা হয়নি, প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে করতে দাম বেড়ে গেছে, খরচ বেড়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিকাদাররা এর সুযোগ নেয়, সরকারি কর্মচারীরাও সুযোগ নেয়; বিষয়টা এমন যে, দাম যত বাড়ানো যাবে, ব্যয় যত বাড়বে ততই তাদের লাভ। এভাবে তারা ব্ল্যাক মানি আর্ন করবে, এসব ফ্যাক্টরও কাজ করে। এসব করে খরচ বাড়তে থাকে এবং প্রকল্পের মেয়াদও বাড়তে থাকে। কিন্তু কখনই এটা তদন্ত করা হয় না যে, কেন এমন হলো? কারা এজন্য দায়ী। আর দায়ীদের কোনো শাস্তির আওতায়ও আনা হয় না। আমাদের দুর্নীতির মূল কারণ তো এটাই যে, এখানে কোনো জবাবদিহি নেই। আর আপনি এখন যেটা বলছেন, প্রকল্প প্রস্তাবনাতেই মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছেÑ এটা হয়তো নতুন প্রবণতা। বিষয় হলো একটা প্রকল্পের প্রস্তাব থেকে শুরু করে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য অনেক সময় লাগে এবং অনেক ধাপেই এসব যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ থাকে। তাহলে আমাদের প্রশ্ন করা দরকার যে, এগুলো সে সময়ে ধরা পড়ছে না কেন বা অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে কেন। একটা বালিশের দাম যখন ২৭ হাজার টাকা ধরা হয়, তখনই তো তার চাকরি চলে যাওয়ার কথা!

দেশ রূপান্তর : বড় বড় প্রকল্পে যেমন দুর্নীতির কথা শোনা যাচ্ছে, তেমনি তার বাইরেও আমাদের দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিয়ে প্রায়ই কথা হয়। সহজে ব্যবসা করার সূচকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমমানের দেশগুলো থেকে পিছিয়ে আছে। এটাও কি দুর্নীতির কারণে হচ্ছে বলে মনে করেন?
এম হাফিজ উদ্দিন খান : দুর্নীতির তো অনেক মাত্রা আছেই। আর এ ছাড়াও এসব বিষয়ে অন্য কিছু সমস্যা আছে। বিনিয়োগের প্রশ্নে এখানে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা কাঠামোর কিছু সমস্যা আছে। একটা হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তাঘাটের সমস্যা; আরেকটা হলো আমাদের এখানে ব্যবসার অনুমোদন নিতে অনেক অনেক সময় লাগে। অনেক দুয়ারে যেতে হয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদি ইত্যাদি। বিভিন্ন সংস্থা থেকেও বলা হচ্ছে, আমাদের ব্যবসার পরিবেশ এখনো ভালো হয়নি। এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। সরকার যদি চায় যে, আমাদের ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হোক, তাহলে ভালো একটা তদন্ত কমিটি করে খতিয়ে দেখতে হবে- কেন এটা সম্ভব হচ্ছে না, কী কী করলে এটা অর্জন করা সম্ভব হবে। সরকার যদি এসব দূর করার জন্য উদ্যোগ নেয়, সেটা খুবই ভালো কথা।

দেশ রূপান্তর : একটা সময়ে বলা হতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথেষ্ট বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান না বলেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এ বছরের জুন মাসে ‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার : নীতি ও চর্চা’ শিরোনামে যে গবেষণা প্রতিবেদন টিআইবি প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও দুর্নীতি কমার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ বিষয়ে কিছু বলুন।
এম হাফিজ উদ্দিন খান : আমি তো একসময় অডিটর জেনারেল ছিলাম। সাংবিধানিক এই পদ থেকে আমি ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা বেতনে অবসরে গেছি। বিশ বছর আগে। আমি তো চুরি করিনি, দুর্নীতি করিনি। আমার প্রতিটা টাকা হালাল কামাই। এটা আসলে মানুষের নৈতিক অবস্থানের বিষয়। আমরা বা আমাদেরও আগের প্রজন্ম কত টাকা বেতনে চাকরি করেছে? কী সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে চাকরি থেকে? আর এখন কত বেতন পাচ্ছে, কী কী সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। এসব মেলালেই বুঝতে পারবেন সমস্যাটা কোথায়। প্রথমত, দুর্নীতির মনোভাব পরিবর্তন হয়নি। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহি করতে বাধ্য না হওয়া এবং কোনো রকম শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ভয়ভীতি যেখানে নেই, সেখানে তো মানুষ দুর্নীতি করবেই; কারণ মানুষের লোভের সীমা নেই। তৃতীয়ত, দুর্নীতি বন্ধের জন্য যেসব ব্যবস্থা থাকা দরকার সেসব ঠিক নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পর্কেই অভিযোগ আছে, তারা বেছে বেছে কাজ করে, সরকারি দল-বিরোধী দল এমন নানা বিষয় বিবেচনা করে তারা কাজ করে। দুর্নীতি দমনের সঙ্গে অনেক বিষয় সম্পর্কিত। কোনো এক-দুটি বিষয় নিয়ে কাজ করলেই চলবে না। দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজের পাশাপাশি নানারকম আইন সংস্কারের বিষয় আছে, বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্ন আছে, তারপর পার্লামেন্টারি ওয়াচ যাকে বলে সেটাকে সক্রিয় করতে হবে। এসব বিষয়কে একত্রে পরিচালিত করতে না পারলে তো হবে না। এর সঙ্গে আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের প্রশ্ন আছে, সেটা প্রতিষ্ঠিত না হলে বাকি কোনো কিছুই কাজ করবে না।

দেশ রূপান্তর : আমরা সরকারি প্রকল্প এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলছিলাম। আজকাল প্রায়ই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্বরত শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও এসব অভিযোগ আসছে। শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক দুর্নীতিও হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
এম হাফিজ উদ্দিন খান : এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তো একটা ধারণা ছিল যে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকবে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা যে এমনভাবে জেগে উঠবে এটা হয়তো তারা ধারণা করেননি। আমরা ষাটের দশকের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, সে সময় এটা ভাবাই যেত না শিক্ষকরা দুর্নীতিতে জড়াবেন। আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন, আমি নিজে শিক্ষকের ছেলে। দেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজে সার্বিকভাবে যে নৈতিক অবক্ষয় ঘটে গেছে, এটা তারই আরও একটা দৃষ্টান্ত। সমাজের সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এখন মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পৌঁছে গেছে, শিক্ষকরাও এই অবক্ষয়ের আক্রান্ত হয়ে গেছেন। এ কারণেই বলছিলাম, দুর্নীতি দমন একটা সামগ্রিক বিষয়। রাষ্ট্র ও সমাজে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে, বিশ্ববিদ্যালয় বা সমাজ সবকিছুকেই এটা গ্রাস করে নেবে।