কৃষক অ্যাপস ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা|179399|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
কৃষক অ্যাপস ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা
নিতাই চন্দ্র রায়

কৃষক অ্যাপস ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা

গত বোরো মৌসুমে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি কৃষক। প্রতিমণ বোরো ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য ছিল ১০৪০ টাকা। কিন্তু কৃষক তাদের কষ্টে উৎপাদিত ধান বিক্রি করেন প্রতিমণ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে। এতে তাদের মণপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লোকসান গুনতে হয়। উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় রাগে অভিমানে টাঙ্গাইলের এক কৃষক ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে প্রতিবাদ জানান। ঘটনাটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সারা দেশের ধান উৎপাদনকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

খাদ্য গুদামের একশ্রেণির অসাধু কর্মচারী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী মহলের কারণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সরকারি গুদামে বোরো ধান সরবরাহ করতে পারেনি। দেশের বেশিরভাগ কৃষকই হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণির। তাদের জমির পরিমাণ কম। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধানসহ নানা কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন। এই শ্রেণির কৃষকের হেক্টরপ্রতি ফলন বেশি। কারণ, তারা কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করেন। সময়মতো আগাছা, পোকামাকড় ও রোগবালই দমন করেন। তাদের কারণেই বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব কৃষকের স্বার্থের দিকেই নজর দিতে হবে সরকারকে। তারা যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। কৃষি প্রণোদনা পান। সেচ, সার ও কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি পান সে বিষয়টিও সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি শুমারি অনুযায়ী দেশে ১ কোটি ৪৫ লাখ কৃষকের কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড রয়েছে। সরকার ২ কোটি ৩০ লাখ কৃষকের ডাটাবেজ তৈরি করেছে। এর মধ্যে এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক।

সারা দেশে এখন আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকের মাঠে-উঠানে সোনালি ধানের ছড়াছড়ি। আগামী এক মাসের মধ্যেই পুরোদমে শুরু হবে আমন ধান কাটার উৎসব। দেশে উৎপাদিত চালের শতকরা ৩৯ ভাগ পাওয়া যায় আমন মৌসুমে। আমন ধান চাষের সুবিধা হলো বোরো ধানের মতো এই ধান উৎপাদনে তেমন সেচ ও সারের প্রয়োজন হয় না। আমন ধানের উৎপাদন খরচ কম। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে এ বছরও আমনের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। জানা যায়, এবার আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর। চাষাবাদ হয়েছে ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে। এ পরিমাণ জমি থেকে ১ কোটি ৫৩ লাখ টন চাল বা ২ কোটি ৫ লাখ টন ধান উৎপন্ন হতে পারে। গত বছর আমন উৎপাদিত হয় ১ কোটি ৪০ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, এ বছর প্রতিকেজি আমন ধানের উৎপাদন খরচ পড়েছে ২১ টাকা ৫৫ পয়সা। গত ৩১ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, আসন্ন আমন মৌসুমে ১০ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এর মধ্যে ছয় লাখ টন ধান সংগ্রহ করা হবে প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে, প্রতিকেজি ২৬ টাকা দামে। এ ছাড়া সাড়ে তিন লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ৫০ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে চুক্তিবদ্ধ মিলারদের নিকট থেকে। প্রতিকেজি সেদ্ধ চাল ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আগামী ২০ নভেম্বর থেকে ধান কেনা শুরু হবে। আর চাল কেনা শুরু হবে ১ ডিসেম্বর থেকে। এ কার্যক্রম চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০ নভেম্বরের মধ্যে কৃষকদের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিতে হবে, তারপর যাচাই-বাছাই করে তা চূড়ান্ত করা হবে। যদি কৃষকের সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন লটারির মাধ্যমে কৃষকের তালিকা তৈরি করা হবে। লটারির মাধ্যমে বাদ পড়া কৃষকরা বোরো মৌসুমে অগ্রাধিকার পাবেন। এর আগে ইউনিয়ন পর্যায়ে যারা এই ধানচাল সংগ্রহ করা নিয়ে দুর্নীতি করেছে, তাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে এবং কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে বলে জানা যায়। এ বিষয়ে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলে জানান কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। তার বক্তব্য থেকে আরও জানা যায়, গ্রাম পুলিশ বা চৌকিদাররা যাতে সারা বছর ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পারেন, সে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বৈঠকে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বছরে পাঁচ মাসের যে নিয়ম ছিল, তা বাড়িয়ে সাত মাস করা হয়েছে। সভায় খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানান, ১২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪৭ টন চাল এখন পর্যন্ত সরকারি গুদামে মজুদ রয়েছে। চলতি মৌসুমে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে কৃষকরা এবার ফসল নিয়ে আর বিড়ম্বনায় পড়বেন না। ধান চাষকে লাভজনক করতে হলে সেচ ও সারে সরাসরি প্রণোদনা দিতে হবে প্রান্তিক কৃষকদের। এতে ধনী, গরিব, প্রান্তিক সব কৃষকই উপকৃত হবেন। কৃষিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করতে হলে শস্য বহুমুখীকরণ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। এ বছর গতবারের চেয়ে তিন সপ্তাহ আগে ঘোষণা করা হলো আমন ধান-চালের সরকারি সংগ্রহ মূল্য। আগে আমন মৌসুমে ধান কেনা হতো না মোটেও। এ বছর প্রথম কেনা হচ্ছে। গত বোরো মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল দেড় লাখ টন। কিন্তু চাষিরা ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চার লাখ টন ধান কেনা হয়েছে কৃষকের কাছ থেকে। সরকারি গুদামে ধান সংগ্রহের তালিকায় যাদের নাম থাকবে, তারা সত্যিকারের কৃষক কি না তার মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে। কৃষকের ধান কাটার মেশিন দেওয়ার জন্য ৫০০ কোটি টাকা চেয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সারের দাম কমানোসহ উৎপাদন খরচ কমানোর কথা বিবেচনা করছে সরকার। চাষিরা যখন সরকারি গুদামে ধান নিয়ে যান, তখন গুদাম কর্মকর্তারা বলেন, ধানে আর্দ্রতা বেশি। ফলে কৃষককে হয়রানির শিকার হতে হয়। এ ধরনের হয়রানি থেকে কৃষকদের বাঁচানোর জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে একটি করে ময়েশ্চার মাপার মেশিন বা ধানের আর্দ্রতা পরিমাপের যন্ত্র সরবরাহ করবে সরকার। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ধানের আর্দ্রতা মেপে কৃষকদের সহযোগিতা করবেন। এ বছর আমনে পুরোটা না পারলেও আগামী বোরো মৌসুমে ধানের আর্দ্রতা নিয়ে যাতে কোনো সমস্যা না হয় বা কৃষকের যাতে ভোগান্তি না হয় সে জন্য ব্যবস্থা নেবে সরকার।

সরকারি গুদামে ধান-চাল-গম কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে খাদ্য অধিদপ্তর ‘কৃষি অ্যাপস’ নামে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। জানা গেছে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) ‘কৃষক অ্যাপস’ তৈরির কাজ শেষ করেছে। খাদ্য অধিদপ্তর এবার আট বিভাগে ১৬ উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এ অ্যাপস ব্যবহার করে আমন সংগ্রহ করবে। এর ফলে তালিকাভুক্ত যেকোনো কৃষক অ্যাপসে প্রবেশ করে জমির পরিমাণ, ফসলের নাম এবং সেই ফসল কী পরিমাণ বিক্রি করতে চান, তা জানাতে পারবেন। শস্য বিক্রির টাকা সরাসরি চলে যাবে কৃষকের অ্যাকাউন্টে। কৃষকদের আবেদনগুলো লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত করবে এ সংক্রান্ত কমিটি। কী পরিমাণ শস্য কেনা হবে তা জানিয়ে দেওয়া হবে মনোনীত কৃষককে এসএমএসের মাধ্যমে। জমির পরিমাণের তুলনায় বেশি ধান বিক্রি করলে তা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে। এজন্য দুর্নীতির মামলা মোকাবিলা করতে হবে সংশ্লিষ্ট কৃষককে। এ নতুন পদ্ধতিতে ধান-চাল-গম কেনা হলে পুরো ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হবে। সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য সরবরাহে কৃষকদের আর মধ্যস্বত্বভোগী, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারস্থ হতে হবে না। খাদ্যশস্যের বর্তমান ক্রয় পদ্ধতিতে প্রকৃত কৃষক তাদের ধান-চাল-গম ন্যায্যমূল্যে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। মিল মালিক, ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও মধ্যস্বত্বভোগীরাই এ পদ্ধতিতে বেশি লাভবান হন। ডিজিটাল পদ্ধতিতে এ অনিয়মের অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে কৃষকের দুর্নীতি করার সুযোগও থাকবে না, কারণ কোনো কৃষক জমির পরিমাণের তুলনায় বেশি ধান বিক্রি করলে সরকারি অর্থ আদায়ের জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। ‘কৃষক অ্যাপস’-এর মাধ্যমে খাদ্যশস্য কেনাকাটায় একটা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং সরকার ও কৃষক উভয় পক্ষের দুর্নীতি রোধে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীন ১৫টি চিনিকলে ই-পুর্জি ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আখের মূল্য প্রদানের কর্মসূচি চালু হওয়ার ফলে আখ চাষিরা যেমন আখ বিক্রি ও সময়মতো আখের মূল্য প্রাপ্তির ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন, তেমনি সারা দেশে ‘কৃষক অ্যাপস’ চালু হলে অবহেলিত কৃষক সমাজ প্রতিবছর তাদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য নিয়ে যে ভোগান্তির শিকার হন তার অবসান হবে। ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে। হেক্টরপ্রতি ফলন বাড়বে। টেকসই হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।

লেখক

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর

[email protected]