৭১ বছর শিশুদের হাতে যে রেলস্টেশন|179423|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
৭১ বছর শিশুদের হাতে যে রেলস্টেশন
আরফাতুন নাবিলা

৭১ বছর শিশুদের হাতে যে রেলস্টেশন

সুউচ্চ ভবন, এয়ারপোর্ট, মার্কেটসহ পৃথিবীর বুকে কত সুন্দর সুন্দর স্থাপনা তৈরি করেছে মানুষ। অনেক স্থাপনা বেশ নজরকাড়া আর নান্দনিক। নানা ধরনের স্থাপনার মধ্যে আছে পাহাড় ও সবুজ অরণ্যে ঘেরা রেলওয়ে স্টেশনও। এর মধ্যে একটি স্টেশনের গল্প সবার থেকে ভিন্ন। ব্যতিক্রম এই স্টেশন নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

পাহাড় অরণ্যে ঘেরা সবুজের মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে ট্রেনে চেপে বসেছেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার পাশাপাশি আপনি এখন বিস্মিত হচ্ছেন রেলস্টেশনটি দেখে। অন্যসব রেলস্টেশনের মতো এর কাজকর্ম স্বাভাবিক হলেও আপনি অবাক হচ্ছেন স্টেশন পরিচালনাকারীদের দেখে। কারণ এখানে যারা ট্রেন পরিচালনা করছে তারা সবাই শিশু! আর এদের সবার বয়স ১০-১৪ বছরের মধ্যে!

রেলওয়েতে রেল পরিচালনা ছাড়াও আরও নানা ধরনের কাজ থাকে। এর মধ্যে আছে ট্রেন ছাড়ার সময় থেকে শুরু করে খাবার দেওয়া, কোনো যাত্রীর সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখা, টিকিট দেওয়া, টিকিট চেক ইত্যাদি। যদি ভেবে থাকেন শিশুরা এই কাজগুলো ছাড়া রেলওয়েতে ছোট ছোট কাজের জন্য নিয়োজিত, তবে কিন্তু‘ ভুল ভাববেন। মূলত তারাই রেলস্টেশনের এই কাজগুলো করছে নিয়মিতভাবে! আর এ কাজে তারা সমানভাবে দক্ষ ঠিক বড়দের মতোই। তাদের কাজে ভুল ধরার কোনো উপায় নেই।

রেলস্টেশনের অবস্থান

রেলে শিশুদের সার্ভিস দেওয়ার এই দৃশ্যের দেখা মেলে পূর্ব ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে। সেখানকার এক পাহাড়ি এলাকার নাম বুদা-হিলস। সেখানে সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হয়েছে মাত্র ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘জায়ারমেকভেসাট’ নামের ছোট্ট রেলওয়ে। নামটি একটু অদ্ভুত, কারণ শব্দটি উচ্চারণ করা হয় হাঙ্গেরিয়ান ভাষায়। এই শব্দটির ইংরেজি অর্থ হচ্ছে ‘দ্য চিলড্রেনস রেলওয়ে’। বাংলায় যার অর্থ ‘শিশুদের রেলওয়ে’।

ট্রেনের সঙ্গে মিলিয়ে পোশাক

এই রেলওয়েতে চকচকে যে ট্রেনগুলো চলে সেগুলো মূলত সাদা, নীল আর লাল রঙের। ট্রেনের সঙ্গে মিলিয়ে শিশুদের পোশাকটাও এই রঙেরই। ট্রেনগুলোতে রয়েছে সাধারণ আর প্রথম শ্রেণির দুই ধরনের বগি। প্রথম শ্রেণির বগির সিটগুলো সবুজ ভেলভেট দিয়ে মোড়ানো। আর সাধারণ শ্রেণিতে বসার জন্য রয়েছে কাঠের বেঞ্চ। প্রতিটি বগিই বেশ সুন্দর করে অলংকরণ করা। রেলওয়েতে মোট সাতটি স্টপেজ আছে। প্রতিটিই বেশ আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো। ১০-১৪ বছর বয়সী এই শিশুরা বিভিন্ন এলাকার স্কুলে পড়ে। সাদা-কালো ইউনিফর্ম পরা ছোট শিশুরা যখন রেললাইনের নানা কাজে ছোটাছুটি করে বেড়ায়, কাজকর্মে বড়দের মতো আচরণ করে, মনের ভুলে কখনো কাজের ফাঁকে খুনসুটিতে মেতে ওঠে, তখন এই জায়ারমেকভেসাট রেললাইনটিই হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রেলওয়ে।

রেলস্টেশনে যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়

শিশুরা চেয়েছে আর মন ভোলাতে তাদের কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এমনটি মোটেই নয়। এখানে যুক্ত হতে হলে সবাইকেই যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। এই রেলওয়ে সার্ভিসে যে শিশুরা যুক্ত আছে, তাদের সবাইকে নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের মেধার ওপর ভিত্তি করে। নিয়োগের পর তাদের চার মাসের একটি ট্রেনিং দেওয়া হয়। এরপর রেলওয়ে ম্যানেজমেন্টের সব কাজে দক্ষতা প্রমাণের জন্য তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে তবেই মেলে রেল পরিচালনার কাজে নিযুক্ত হওয়ার সার্টিফিকেট। অর্থাৎ কাজের জন্য তাদের দেওয়া হয় এক বছরের লাইসেন্স। 

অল্প বয়সে রেলওয়েতে পেশাদারদের মতো কাজ করলেও পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। শিশুরা চাইলে একজন আরেকজনের সঙ্গে রাতের কাজ ভাগ করে নিতে পারে যেন পরদিন স্কুলে যেতে সমস্যা না হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা এখানে কাজ করলে তাদের স্কুল বা বাড়ি থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় না। বরং মাঝেমধ্যে স্কুলে যেতে না চাইলেও সেটাও বিবেচনায় রাখা হয়।

দ্য গ্রেটেস্ট চাইল্ড টয় ট্রেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড

শিশুদের দ্বারা পরিচালিত এই রেলওয়েকে অনেক সময় ‘দ্য গ্রেটেস্ট চাইল্ড টয় ট্রেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ও ডাকা হয়। তবে একে মোটেও খেলনা ট্রেন ভেবে ভুল করবেন না কিন্তু! কারণ অন্য ট্রেনগুলোর মতোই এটি পরিচালনার জন্যও মানা হয় কঠিন সব নিয়ম। হাঙ্গেরির অন্য সব রেলের নিয়মের চেয়ে এই নিয়মগুলো কোনো অংশেই কম নয়। রেলওয়েতেও যাত্রীরা নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন। যেহেতু সব সময় রেলওয়ে সচল থাকে, কাজেই শুধু যাত্রীদের ট্রেনে ওঠানামার মধ্যেই সব কাজ সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ে ঘেরা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন শত শত যাত্রী আসে এখানে। তারা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যাতায়াত করেন আর তাদের সেবায় নিয়োজিত শিশুরাও।

শিশুরা কাজ করছে বলে তাদের কাজগুলো খুব সাধারণ ভাবার কিছু নেই। সঠিকভাবে রেলওয়ে পরিচালনার জন্য যাত্রীদের টিকিট চেক, যথাযথ নিয়মে যাত্রীদের হাতে টিকিট দেওয়া, হুইসিল বাজানো, ট্রেনের ইঞ্জিনে ডিজেল দেওয়া, পতাকা উঁচিয়ে ট্রেনের সিগন্যাল দেওয়া, স্টেশনমাস্টারের কাজসহ অনেক কাজই করতে হয়। জায়ারমেকভেসাটে এসব কাজে বড়দের চেয়ে কোনো অংশেই শিশুরা পিছিয়ে নেই। প্রতিটি কাজই শিশুরা করে নিখুঁত দক্ষতায়। এই কাজে নিযুক্ত প্রতিটি শিশুই নিজ কাজের প্রতি যথেষ্ট যতœশীল। মেধার ভিত্তিতে বাছাইয়ের পর ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তাদের আরও বেশি দক্ষ করে তোলা হয়। তবে সব কাজ শিশুরা করলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রেন চালানোর জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকেই। এ ছাড়া রেলের তত্ত্বাবধানের জন্য নিযুক্ত আছেন প্রাপ্তবয়স্ক কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার। শিশুরা তাদের কাজ ঠিকমতো করতে পারছে কি না অথবা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে কি না সেটাও নিয়মিত তদারকি করেন তারা।

রেলওয়েবিষয়ক তথ্য

বছরের প্রায় পুরোটা সময়ই জায়ারমেকভেসাট রেলওয়ে চালু থাকে সর্বসাধারণের জন্য। তবে সেপ্টেম্বর-এপ্রিল মাসের প্রতি সোমবার এখানে রেল চলাচল বন্ধ থাকে। গ্রীষ্মের সময় সকাল ৯টা-বিকেল ৭টা পর্যন্ত এবং শীতের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৭টা পর্যন্ত ট্রেন চালু থাকে। পুরো জায়ারমেকভেসাট রেললাইন ঘুরে আসতে একটি ট্রেনের সময় লাগে ৪০-৫০ মিনিট। ট্রেনের টিকিটের দাম রাখা হয় কয়েকশ ফরেন্ট (হাঙ্গেরির মুদ্রা) বা ২-৩ ডলার। ট্রেনের এই খরচ কারও কাছে কিছুটা বেশি লাগে আবার এ বিষয় নিয়ে চিন্তিত নন অনেকেই। কারণ খরচ আদতে কম বা বেশি যাই মনে হোক না কেন, অর্থের ব্যাপারটি না ভাবলে যাত্রীরা আনন্দিতই হন অনেক বেশি। শিশুরা রেলওয়ে পরিচালনা করছে এ বিষয়টিতে ভালো লাগার সঙ্গে সঙ্গে এখানে আনন্দিত হওয়ার আরও একটি কারণ আছে। কারণটি হচ্ছে এই ট্রেনে চড়লেই আপনি ঘুরে আসতে পারবেন বুদাপেস্টের সর্বোচ্চ বিন্দু এলিজাবেথ লুকআউট থেকে। পুরো বুদাপেস্ট শহরকে এক নজরে আপনি এই ট্রেনে বসা অবস্থায় দেখে নিতে পারবেন। এই রেলওয়েতে ট্রেনে উঠে পুরো পথটাই যেমন আপনি দেখে আসতে পারেন, তেমনি চাইলেই মাঝপথে রোমাঞ্চকর অভিযানের আশায় নেমেও পড়তে পারেন সবুজে ঘেরা পাহাড়ের বুকে।

কেন শিশুদের দ্বারা পরিচালিত হয়

পুরো বিশ্বে যেখানে সব রেলওয়ে পরিচালিত হয় বড়দের দ্বারা, সেখানে কেন এই রেলস্টেশনটি ছোটদের দ্বারা পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এর ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ৭১ বছর পেছনে।

৭১ বছর (২০১৮ সালে এটির ৭০তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠিত হয়) আগে নয়নাভিরাম এই রেলস্টেশনের যাত্রা শুরু হয়। চিলড্রেন’স রেলওয়েকে কখনো কখনো বলা হয় ‘অগ্রগামী রেলওয়ে’ নামেও। এই রেলস্টেশন তৈরির পেছনে মূলত কাজ করেছিল কিছু তরুণ।

যাদের উদ্দেশ্য ছিল শিশু-কিশোরদের রেলওয়ের কাজ বিষয়ে জানানো এবং শেখানো। তারা চেয়েছিল রেললাইন পরিচালনার মাধ্যমে অল্প বয়সেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে টিমওয়ার্ক আর দায়িত্ববোধ তৈরি করতে। শুধু তাই নয়, কমিউনিস্টদের নীতিশিক্ষা এবং কায়িক শ্রমের শিক্ষা দেওয়াও ছিল এর উদ্দেশ্য। ১৯৪৮ সালে হাঙ্গেরি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন এই রেলওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৫০ সালে। প্রথমদিকে রেলওয়ে স্টেশনটার অন্য নাম থাকলেও পরে এই নামটাই স্থায়ী হয়ে যায়।

বুদাপেস্টে রেলওয়ে তৈরির কারণ

মজার বিষয় হচ্ছে এই রেলওয়ে কিন্তু শুরুতে এখানে তৈরি হওয়ার কথা ছিল না। এর জন্য কমিউনিস্টরা আগে বেশ কিছু জায়গা বেছে নিয়েছিল। তার মধ্যে ছিল হাঙ্গেরির গডোলোতে অবস্থিত রয়্যাল প্যালেস, দানিউবের মার্গারেট আইল্যান্ড এবং বুদাপেস্টের সবচেয়ে বড় পাবলিক পার্ক পিপল’স পার্ক। তবে পরবর্তী সময়ে পাহাড়ি এলাকা আর প্রাকৃতিক দৃশ্যের মোহনীয়তার জন্য বুদাহিলসকেই বেছে নেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে সেখানে প্রায় ৫০টিরও বেশি রেলওয়ের খোঁজ পাওয়া যায়, যার বেশির ভাগেরই অবস্থান ছিল দেশের পূর্বপাশে।

সেই কমিউনিস্ট শাসনের সময় থেকে আজ অবধি সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট মানুষদের দ্বারা পরিচালিত এই রেলওয়েটি। শিশুদের টিমওয়ার্ক আর দায়িত্ববোধের শিক্ষা আজও দেওয়া হয় সেখানে। তবে কমিউনিস্টদের নীতিশিক্ষার ব্যাপারটা বাদ পড়েছে হাঙ্গেরি স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বেশির ভাগ রেলওয়েই এখন ঐতিহাসিকভাবে পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ইতিহাসসমৃদ্ধ বুদাপেস্টের পাশাপাশি আরও অনেক ইতিহাস জানানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে এখনো রয়ে গেছে মিনসক, ড্রেসডেন, বার্লিন, বেলারুস, তিলিসিসহ আরও বেশ কিছু শহর।

রেলওয়েতে জাদুঘর

সবুজে মোড়ানো আর পাহাড় ঘেরা পুরো এলাকায় ট্রেনে চেপে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে ভীষণ ভালোবাসেন এখানে আসা যাত্রীরা। তবে শুধু ট্রেনে ভ্রমণ করেই যাত্রার শেষ হয় না এই জায়ারমেকভেসাটে। ট্রেনে ভ্রমণের পাশাপাশি এই রেলস্টেশনে আপনি আরও দেখতে পাবেন জাদুঘর। রেলওয়ের সেই জাদুঘরে আছে হাঙ্গেরিতে কমিউনিস্ট শাসনের চিহ্ন বয়ে বেড়ানো সেই আমলের পুরনো জিনিসপত্র, যন্ত্রপাতি, লোহালক্কড়সহ নানা জিনিস। এমনকি বাচ্চাদের মনোরঞ্জনের জন্যও জাদুঘরে রাখা আছে নানা জিনিসপত্র। অন্যান্য রেলস্টেশন থেকে একদম আলাদা আর এত সুন্দর একটা জায়গায় এসে ফিরে গিয়ে অবশ্যই জায়গাটি নিয়ে আপনি গল্প করবেন অন্যের সঙ্গে।

রেলওয়েতে ট্রেন এলে কচিকণ্ঠে যখন পুরো প্ল্যাটফরম জেগে ওঠে, হাতের রঙিন পতাকাটা নেড়ে যখন কোনো শিশু গম্ভীর মুখে ট্রেন আসার হুইসিল দেয়, টিকিট কাউন্টারে যখন শিশুরাই বড়দের মতো করে যাত্রীদের টিকিট দেয় অথবা সব ছাপিয়ে শিশুরাই যখন টিকিট চেকার হয়, ছোটাছুটি করে শিশুরাই যখন ট্রেনের ইঞ্জিনে ডিজেল দেয়Ñ সেসব দৃশ্যই হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর আর বেশ উপভোগ্য।