শক্তি নিয়ে ‘বুলবুল’ বাংলাদেশমুখী|179438|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
শক্তি নিয়ে ‘বুলবুল’ বাংলাদেশমুখী
নিজস্ব প্রতিবেদক

শক্তি নিয়ে ‘বুলবুল’ বাংলাদেশমুখী

বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। এটি আরও শক্তি সঞ্চয় করে ভারতের ওড়িশা এবং বাংলাদেশের খুলনা ও বরিশাল উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর প্রভাবে সমুদ্র ব্যাপক উত্তাল রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টি আজ শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ খুলনার সুন্দরবন উপকূল অতিক্রম শুরু করতে পারে। এ সময় এটি বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করতে রবিবার পুরোদিন লেগে যেতে পারে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ঘণ্টায় ১২৫ কিলোমিটার বেগে বাতাসের শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে উপকূলের দিকে, আপাতত এর গতিমুখ সুন্দরবনের দিকে।

ঘূর্ণিঝড় ও মুন ফেজের (চন্দ্রকলা) প্রভাবে উপকূলীয় জেলা ও নিকটবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-৭ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব ধরনের মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যা থেকে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং বরিশাল ও খুলনা বিভাগের উপকূলীয় এলাকায় ৭ নম্বর বিপদসংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদসংকেত ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন গতকাল রাত আটটার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজ সন্ধ্যা নাগাদ খুলনার সুন্দরবন উপকূল অতিক্রম শুরু করতে পারে। এটি বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করতে রবিবার লেগে যেতে পারে। এ সময়ে উপকূলীয়  এলাকার পাশাপাশি রাজধানীতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাত থেকে জানমালের নিরাপত্তায় প্রস্তুতিকালে গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেছেন, আজ সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে বুলবুল বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় অধিদপ্তরের ১৮ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে জানানো হয়, পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আরও উত্তর দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হয়ে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। এ সময়ে এটি পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে মাত্র ৪৯০ কিলোমিটার, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর বা উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে শনিবার (আজ) সন্ধ্যা নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ ও খুলনা উপকূল (সুন্দরবনের কাছ দিয়ে) অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০-১৪০ কিলোমিটার। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে। উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৭ নম্বর বিপদসংকেতের আওতায় থাকবে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ এই সংকেতের আওতাধীন থাকবে।

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় তাদের সর্বশেষ বিশেষ বুলেটিনে জানায়, ‘গত ৬ ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ১৭ কিলোমিটার বেগে তার অবস্থান থেকে উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ওই সময় ঘূর্ণিঝড়টির অবস্থান ছিল ওড়িশার পারাদ্বীপ থেকে ২৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পূর্বে ও পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ থেকে ৩৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং বাংলাদেশের বরিশালের খেপুপাড়া থেকে ৫১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে।’ তাদের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আরেকটু দুর্বল হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে আজ মধ্যরাতের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও বাংলাদেশের বরিশালের খেপুপাড়া ও সুন্দরবন উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এ সময় বাতাসের সর্বোচ্চ বেগ থাকতে পারে ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার।

এদিকে বুলবুলের প্রভাবে গতকাল গতকাল খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় হালকা বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বরিশালের খেপুপাড়ায়। এদিন রাজধানীতেও দুপুরের পর থেকে মেঘলা আকাশ ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ২২টি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব ধরনের মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে জানমালের ক্ষতি এড়াতে সাত উপকূলীয় জেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রস্তুতি সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। তবে এতে ফসল ছাড়া বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা নেই।

এনামুর রহমান বলেন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দেশের ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যথাসময়ে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী জানান, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সাত জেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে লোক সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় ২ হাজার প্যাকেট করে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এটার যে গতি ও যেদিকে অগ্রসর হচ্ছে তাতে আঘাত হানবে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা রয়েছে। গতি আরও বাড়লেও যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে ফসল ছাড়া বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা নেই।

আজ বেলা ১১টায় সচিবালয়ে প্রস্তুতি সভায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে এনামুর জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকে ও ২২টি কমিউনিটি রেডিও সতর্কবার্তা প্রচারে কাজ করে যাচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় শেষে উদ্ধারকাজসহ যেকোনো সহায়তার জন্য প্রস্তুত আছে কোস্টগার্ড। জরুরি সহায়তার জন্য নিচের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে বরিশাল বিভাগ-০১৭৬৬৬৯০৬০৩, খুলনা বিভাগ-০১৭৬৬৬৯০৩৮৩, চট্টগ্রাম বিভাগ-০১৭৬৬৬৯০১৫৩ এবং অতিরিক্ত-০১৭৬৬৬৯০০৩৩।

ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসায় সারা দেশে সব ধরনের নৌ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, অভ্যন্তরীণ নৌপথে ২ নম্বর সতর্কসংকেত জারি হওয়ায় সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে।

আমাদের বাগেরহাট প্রতিনিধির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে জনসংখ্যার তুলনায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। প্রায় ১৪ লাখ মানুষের বসবাস এ জেলায়। সেই তুলনায় এখানে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র ২৩৪টি। এসব ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ লাখ ২৬ হাজার মানুষের। এ জেলার মানুষের আশ্রয়ের জন্য যে পরিমাণ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন তা নেই বলে মনে করছেন এখানকার জনপ্রতিনিধিরা। তবে জেলা প্রশাসন বলছে উপকূলীয় উপজেলাগুলোর জন্য যে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে তা পর্যাপ্ত। অন্যদিকে, বাগেরহাটের মোংলা সমুদ্রবন্দরে জাহাজে পণ্য ওঠানামার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় উপকূলীয় বাগেরহাটে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলার বাসিন্দাদের ঝড়ের ব্যাপকতা বুঝাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা, মোংলা, রামপাল ও মোরেলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দাদের ঝড়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে প্রশাসন। দুর্যোগের আগে ও পরের সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে কয়েক শ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শরণখোলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন আকন বলেন, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসে শুধু সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। তাই এখানকার মানুষ ঝড়ের পূর্বাভাস পেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই উপজেলার মানুষের আশ্রয়ের জন্য যে পরিমাণ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন তা নেই। তাই এ উপজেলার জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতিমূলক জরুরি সভা করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের জরুরি সভা করে দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলায় কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবককে উদ্ধারকাজ চালাতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ, আনসার, ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ড ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করবে। বাগেরহাট জেলায় মোট ২৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর ধারণক্ষমতা রয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সুন্দরবনের দুবলার চরের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হতে যাওয়া রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ১০ থেকে ১২ নভেম্বর সুন্দরবনের দুবলারচরের আলোরকোলে তিন দিনের এই রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আমাদের ভোলা প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় জরুরি সভা করেছে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারকে সাগর মোহনা থেকে নিরাপদে ফিরে আসতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিচ্ছিন্ন চরবাসীকে নিরাপদে রাখতে ৬৬৮টি সাইক্লোন শেল্টার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। সিপিবির ১০ হাজার কর্মী উপকূলীয় এলাকায়  সতর্কবার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। চরবাসীর গবাদিপশু নিরাপদে মুজিব কিল্লায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগের আগে ও পরে  সব পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ৯২টি  মেডিকেল টিম গঠন করা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলায় ৮টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। একটি জেলা প্রশাসনের দপ্তরে এবং বাকিগুলো প্রতিটি উপজেলায়। সরকারি সব দপ্তরের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। যারা স্টেশন ত্যাগ করেছেন তাদের ফিরে আসতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কোস্টগার্ড, পুলিশ, নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সিপিবি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

আমাদের বরিশাল প্রতিনিধি জানান, বরিশালে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি সভা করে ২৩২ সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোলরুম)। জেলা প্রশাসনের খোলা কন্ট্রোলরুমের নম্বর ০১৭৪১ ১৯৬৯৩৯ ও ০৪৩ ১৬৩৮৬৩। গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বরিশাল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

জরুরি প্রস্তুতি সভায় জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, উচ্চপর্যায় থেকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সার্বিক সব বিষয়ে খোঁজখবর রাখছে। ২০০ মেট্রিক টন চাল, শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুদ আছে। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা দেখে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেউ যেন ঝুঁকি নিয়ে অনিরাপদ আশ্রয়ে না থাকেন।

আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধির পাঠানোর তথ্য থেকে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সাতক্ষীরার আবহাওয়া থমথমে রয়েছে, রাত থেকে হয়েছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে হালকা শীতের মধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাতে সামান্য ঠান্ডার প্রভাব বেড়েছে।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মো. বদিউজ্জামান বলেন, আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। এখনো পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো বিপদসংকেত না থাকায় এলাকাবাসীকে নিরাপদ জায়গায় অথবা সাইক্লোন শেল্টারে উঠতে বলার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে জেলে, নৌকা-ট্রলারের মাঝিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, জেলায় এখনো কোনো কন্ট্রোল রুম খোলা হয়নি। তবে উপজেলা প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি সভা করেছে। তাদের প্রয়োজনীয় সবধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের মোংলা প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য থেকে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বর্তমানে মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছে। আজ শনিবার দুপুরে আঘাত হানবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে খোলা হয়েছে তিনটি কন্ট্রোল রুম। বন্দরে এই মুহূর্তে মেশিনারি, ক্লিংকার, সার, জিপসাম, পাথর, সিরামিক ও কয়লাসহ দেশি-বিদেশি ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছে। এসব জাহাজে পণ্য খালাসে সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলেও জানান বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দিন।

আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, সাগর উত্তাল থাকায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে অন্তত ১ হাজার ২০০ পর্যটক আটকা পড়েছেন। সাগরে মাছ ধরার ফিশিং ট্রলারগুলো উপকূলে ফিরে আসতে শুরু করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে কক্সবাজারে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন প্রস্তুত। জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থাকতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সাগর উত্তাল হওয়ায় গতকাল থেকে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সেন্টমার্টিনে অবস্থান করা পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি সভা করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক, ৫৩৮ আশ্রয়কেন্দ্র ও ৯৭ মেডিকেল টিম। 

আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আজ শনিবার রাতে আঘাত হানতে পারে এমন খবরে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রামাঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারগুলো মাথা গোঁজার ঠাঁই খুপরি ও টিনের ঘর ভেঙে পড়বে কি না, এমন আতঙ্কে রয়েছে।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, সমুদ্র উত্তাল থাকায় গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মৎস্যবন্দর আলীপুর-মহিপুরের পোতাশ্রয় শিববাড়িয়া নদীসহ বিভিন্ন নদীতে অবস্থান নিয়েছে। পায়রা বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়েছে। পটুয়াখালী-ঢাকা নৌরুটসহ অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছে কৃষকরা। একইভাবে শীতকালীন সবজি চাষিরা রয়েছে সর্বোচ্চ ক্ষতির আশঙ্কায়।

আমাদের খুলনা প্রতিনিধি জানান, খুলনায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় প্রস্তুত ৩৩৮ সাইক্লোন শেল্টার। এদিকে, কৃষকরা ক্ষেতে আধাপাকা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। জমির সব ধান এখনো পাকেনি। খুলনা আবহাওয়া কার্যালয় জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর-পশ্চিম উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে।  ঘূর্ণিঝড়টি আজ শনিবার মধ্যরাতের দিকে বাংলাদেশের খুলনা-বরিশাল অঞ্চলের ওপর আঘাত হানতে পারে। তবে উপকূলে আঘাত হানার আগে কিছুটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শুক্রবার ভোর ছয়টা থেকে মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে সাগরে চলাচল না করে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।