অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে এক্স-রে ফিল্মের বাজার|179469|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে এক্স-রে ফিল্মের বাজার
ইমন রহমান

অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে এক্স-রে ফিল্মের বাজার

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে মেশিনে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের ফিল্ম। অবৈধভাবে চোরাই পথে দেশে ঢোকা এসব ফিল্মের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিম্নমানের হওয়ায় ব্যবহারের পর অল্পদিনেই তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। এছাড়া এসব ফিল্ম ব্যবহারে এক্স-রে মেশিনের প্রিন্টারও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরাও। এদিকে যেসব দোকানি এক্স-রে ফিল্ম বিক্রি করছেন তারা নিজেরাও জানেন না যে কোনগুলো মানসম্পন্ন আর কোনগুলো নিম্নমানের। তবে অবৈধ পথে যে কোটি কোটি টাকার এক্স-রে ফিল্ম দেশে ঢুকছে সে বিষয়টি তাদের সবারই জানা।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, চীন থেকে হংকং হয়ে নানা কৌশলে দেশে ঢুকছে বিপুলসংখ্যক নিম্নমানের এক্স-রে ফিল্ম। বেশ কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় দেশের বাইরে থেকে কম দামে কিনে নিম্নমানের এসব ফিল্ম দেশে ঢোকাচ্ছেন। এরপর ২২ জনের একটি চক্র তা আবার সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি কিছু ফিল্মের কোড নম্বরে অসংগতি দেখতে পেয়ে এসব নিম্নমানের ফিল্মের দেশে ঢোকার বিষয়টি জানতে পারে ফুজি ফিল্ম আমদানিকারক একমাত্র প্রতিষ্ঠান গ্রাফিক মেশিনারি অ্যান্ড ইক্যুইপমেন্ট লিমিটেড (জিএমই)। এ বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। নিম্নমানের এসব ফিল্ম দেশে ঢোকা ঠেকাতে সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে জিএমই।

শাহবাগ থানায় করা ওই জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মতিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিএমই নামের একটি কোম্পানি জিডি করেছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের ফিল্ম দেশে ঢোকানোর অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ না করায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তারা (জিএমই) চাইলে এই জিডির কপি নিয়ে মামলাও করতে পারেন।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জিএমই গ্রুপের মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ফারুক আহম্মেদ উদয় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে ফিল্ম তৈরি করা হয় তা একমাত্র আমরাই দেশে আনি। সরকারকে সব ধরনের ট্যাক্স দিয়ে এগুলো আমদানি করি। কিন্তু কিছু লোক বিভিন্ন দেশ থেকে নিম্নমানের ফিল্ম বা অন্য দেশের জন্য তৈরি ফিল্ম কম দাম দেখিয়ে নিয়ে আসছে। এরা সরকারের ট্যাক্সও ফাঁকি দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চোরাই পথে আসা নিম্নমানের এ ফিল্মের ফলে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। এ ফিল্ম রোগী বেশিদিন রাখতে পারছে না। এর স্থায়িত্ব কম হওয়াতে সহজেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া চীন থেকে যে নিম্নমানের ফিল্ম আসছে এগুলোতে প্রিন্টারের ক্ষতি হচ্ছে। রোলার নষ্ট হচ্ছে। লেজার দিয়ে ফিল্মগুলো রাইট করা হয়। এতে লেজার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এটা বুঝতে এক থেকে দুই বছর সময় লাগবে।’

নিম্নমানের ফিল্ম ব্যবহারে সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আবদুল মালেক শরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো প্রিন্টারেই নিম্নমানের ফিল্ম ব্যবহার করলে প্রিন্টার নষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ মোটা ফিল্ম মোটরে টানতে কষ্ট হয়, রোলারে দাগ পড়ে যায়। ফিল্মের গায়েও দাগ পড়ে যায়। আমাদের এখানে ব্রান্ডের বাইরে ফিল্ম কেনা হয় না।’

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অসাধু কয়েকজন ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় বিভিন্ন কোম্পানির ডিলারদের মাধ্যমে খুচরা বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে নিম্নমানের ফিল্ম। এসব ফিল্মের কোড নম্বরও ভিন্ন, বাংলাদেশের কোড নম্বরের সঙ্গে মেলে না। আবার অনেক ফিল্ম পুরুত্বে বেশ মোটা। যা প্রিন্টারের জন্য ক্ষতিকর। তবে ব্যবসায়িক ক্ষতির শঙ্কায় বিষয়টি প্রকাশ করছে না অন্যান্য ব্রান্ডের ফিল্মের আমদানিকারকরা। এছাড়া নিম্নমানের এসব ফিল্মের রিপোর্টও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। কিছুদিন পরেই তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অবৈধভাবে এসব ফিল্ম আসায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশে ফুজির মেশিনে ব্যবহৃত ফিল্ম অবৈধ পথে বেশি আসছে বলে জানিয়েছে ফুজির সোল এজেন্ট (একমাত্র বিক্রয় প্রতিনিধি) জিএমই।

প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে ফুজির প্রায় ছয় হাজারের বেশি এক্স-রে মেশিন রয়েছে। এসব মেশিনকে টার্গেট করেই চলছে অবৈধ ও নিম্নমানের ফিল্মের ব্যবসা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ নিম্নমানের ফিল্ম বেশি যাচ্ছে। গত চার মাস ধরে এ নিম্নমানের ফিল্ম বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিলারদের কেউ কেউ এর সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর বেশকিছু দোকানদারও বিষয়টি স্বীকার করেছে।’

জিএমইর এই কর্মকর্তার দাবি, রাজধানীর তোপখানা রোডের বিএমএ ভবনের সার্জিক্যাল মার্কেট থেকেই বেশি ছড়াচ্ছে নিম্নমানের এসব ফিল্ম। আর এর সঙ্গে জড়িত ২০-২২ জনের একটি সিন্ডিকেট। নিম্নমানের চোরাই ফিল্ম কারবারে জড়িত ওই সিন্ডিকেটের চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে জানিয়ে জিএমইর এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং মামলারও প্রস্তুতি চলছে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতেও গিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু তারপরও নিম্নমানের এসব ফিল্ম বাজারে ছড়ানো ঠেকানো যাচ্ছে না।’

বিএমএ ভবনের সার্জিক্যাল মার্কেটে ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিম্নমানের ফিল্ম কারবারি সিন্ডিকেটের সদস্যরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পান না। আর কোন ফিল্ম আসল আর কোনটা নকল তা বোঝার ক্ষমতাও খুচরা এসব বিক্রেতার নেই। তারা যেখানে কম দামে পান সেখান থেকেই কেনেন।

মার্কেটটির ‘মেডি ফাস্ট’ নামে একটি দোকানের মালিক মো. রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ফুজির ফিল্ম মোস্তফা সার্জিক্যাল, ভূঁইয়া সার্জিক্যাল ও এ কে সার্জিক্যালসহ বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে নিয়ে বিক্রি করি। আমি যেখানে কম দামে পাই, সেখান থেকেই কিনি। আমি ইমপোর্ট করি না। ডিলারের কাছ থেকে কিনি। কোনটার কী কোড বা বারকোড তা আমি জানিও না, বুঝিও না। যারা এগুলো করছে তারা রাঘব বোয়াল। তাদের সঙ্গে কেউ লাগতে যায় না।’

এ ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে বিষয়টি নিয়ে ডিবি পুলিশও এসেছিল। লিখিত নিয়ে গেছে। এসব মাল (নিম্নমানের ফিল্ম) অন্য দেশ থেকে আসে। অনেক সময় মিথ্যা ডিক্লিয়ারেশন দিয়ে দেশে আনছে। এগুলো শিপে ও এয়ারে আসছে।’