রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ|180175|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ

নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ও সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গার বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার উত্তপ্ত ছিল জাতীয় সংসদ। এদিন সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সাংসদদের পাশাপাশি নিজ দলের সাংসদদের সমালোচনার তীরেও বিদ্ধ হয়েছেন রাঙ্গা। সংসদ সদস্যরা তাকে তার বক্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি জাপা থেকে বহিষ্কারের দাবি তোলেন। তার এই ধরনের উক্তিতে জাপার কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়। একইসঙ্গে জাতীয় সংসদে তার বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ পদ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে। অন্যদিকে রাঙ্গার কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি তার বক্তব্য দলের বক্তব্য নয় বলে দাবি করেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ।

এদিন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সবার আগে রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে কথা বলেন ঝিনাইদহ-২ আসনের আওয়ামী লীগ সাংসদ তাহজীব আলম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, নূর হোসেন দিবসে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে কট‚ক্তিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন জাপা মহাসচিব ও সংসদের বিরোধী দলের চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা। নূর হোসেনকে হত্যার পর সারা সংসদদেশের আনাচে-কানাচে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো নূর হোসেনের জন্ম হয়। সেই নূর হোসেনকে নিয়ে অপমানজনক বক্তব্যের প্রতিকার চাই। তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কট‚ক্তি করেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কট‚ক্তি করেছেন। তার এই বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। একইসঙ্গে তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে এই ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতিও দিতে হবে।

এরপর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘রাঙ্গা এমন একটি বক্তব্য দিয়েছেন, যেটাতে বাংলার মানুষের হৃদয়ে আঘাত লেগেছে। নূর হোসেন হত্যার ঘটনার পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বেগবান হয় এবং মানুষ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আমি অবাক হলাম রাঙ্গা বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নূর হোসেনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অথচ রাঙ্গা ভুলে গেছেন এরশাদও নূর হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তার মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, সংসদে ক্ষমা চেয়েছিলেন। রাঙ্গা তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। তার এই বক্তব্যের জন্য ধিক্কার জানাই। এর জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যে এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই এলাকায় আওয়ামী লীগ তার সঙ্গে না থাকলে নির্বাচিত হতে পারতেন কি না সেটা আমরা বলতে চাই না। রাঙ্গা খুবই খারাপ বক্তব্য দিয়েছেন। আমি তার বক্তব্যে ঘৃণা প্রকাশ করি। একজন সুস্থ মানুষ, তিনি যদি স্বাভাবিক থাকেন তার পক্ষে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী ও নূর হোসেনকে নিয়ে এই বক্তব্য দেওয়া সম্ভব না।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। রাঙ্গা সেই চেষ্টা করেছেন। নূর হোসেন যখন হত্যা হয়, তখন দেশে ফেনসিডিল-ইয়াবা ছিল না। ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু’র কথা বলা হয়। এই ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু’র মূলহোতা ছিলেন এরশাদ। আজ সেটাকে ঢাকার জন্য রাঙ্গা এত বড় দুঃসাহস দেখাতে পারেন না। এরশাদের সময় রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতন ও পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। এরশাদকে শুধু আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার বলে না, সারা দেশের মানুষ তাকে স্বৈরাচার বলে অভিহিত করেছে। বিশ্বে স্বৈরাচার বলে পরিচিতি পেয়েছেন। রাঙ্গাকে অবশ্যই তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।’

গণফোরাম নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী, নূর হোসেনকে নিয়ে কটাক্ষ করে কথা বলেছেন রাঙ্গা। কথায় আছে ‘রতনে রতন চেনে....’। আমি বাকি কথাটা আর বললাম না। যে নূর হোসেনকে সামনে রেখে আমরা আন্দোলন করেছি। তাকে তিনি কটাক্ষ করেছেন। এটা করে তিনি সংসদকে অপমান করেছেন। কারণ স্বৈরাচারের পতন না হলে তিনি সংসদে এসে বসতে পারতেন না। এ কথা বলে তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বৈরাচার-দালালদের চরিত্র পরিবর্তন হয় না। এর জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘রাঙ্গা যে কথা বলেছেন, এটা কোনো সুস্থ মানুষ বলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কথা বলার আগে তার চিন্তা করা দরকার ছিল। রাঙ্গার এই বক্তব্য গণতন্ত্রের ওপর আঘাত করেছে। তাকে শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, জাতীয় পার্টিতে তার এই বক্তব্যের ক্লারিফিকেশন (ব্যাখ্যা) দিতে হবে।’

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘একটা কথা আছে, বাঁদরকে লাই দিলে গাছের মাথায় ওঠে। এই লাই আমরা দিইনি। এই সংসদ তাকে লাই দিয়েছে। কী ধরনের ব্যক্তিত্ব; যার অতীত নেই– বর্তমান নেই। কিছুই ছিল না। হঠাৎ তাকে মন্ত্রী বানানো হলো। আমরা তো তাজ্জব হয়ে গেলাম। আমি যতদিন ধরে রাজনীতি করি, তার বয়সও ততদিন হবে না। তিনি কোথায় আন্দোলন করেছেন? কোথায় সংগ্রাম করেছেন? তিনি যুবদলের নেতা ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বলার ধৃষ্টতা তিনি কোথায় পেলেন? প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কে কথা বলেছেন। গণতন্ত্রের ছবক দেন। লেখাপড়া জানেন না, আবার কাগজের মালা গলায় দিয়ে পরিবহন শ্রমিক হয়ে হঠাৎ বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে গেছেন। ধৃষ্টতা দেখান তিনি। আর তার জবাব দিতে হয় আমাদের। আসামিদের কাঠগড়ায় আমাদের দাঁড়াতে হয়। এটা সম্পূর্ণ আমাদের ঘাড়ে এসে পড়েছে। আমরা দুঃখিত।’

তিনি বলেন, ‘ওই বক্তব্য জাতীয় পার্টির বক্তব্য নয়। এটা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে না। এটা রাঙ্গার নিজস্ব বক্তব্য হতে পারে। ওই বক্তব্যের জন্য জাতীয় পার্টি লজ্জিত, আমরা দুঃখিত এবং আমরা এর জন্য অপমানিত বোধ করছি। জাতীয় পার্টি এই বক্তব্য সমর্থন করে না। নূর হোসেন সম্পর্কে তিনি যেটা বলেছেন তা আমরা গ্রহণ করি না। আমরা ঘৃণাভরে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি। এটা তার ব্যক্তিগত বক্তব্য, দল এর দায়িত্ব নেবে না।’

রাঙ্গাকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, ‘লজ্জা করে না এসব কথা বলতে? আমরা তো আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করেছি। আজকের প্রধানমন্ত্রী সেদিন যদি আমার পরিচয় করিয়ে না দিতেন, আমাকে যদি ভোট না দিতেন, নির্বাচিত হয়ে এই সংসদে আসতে পারতাম না। রাঙ্গা সাহেব! মানুষ এত অকৃতজ্ঞ হয় কীভাবে? পেছনে যদি আওয়ামী লীগ না থাকত, ওই রংপুরে নামতেও পারতেন না। কার কয়টা ভোট আছে তা আমাদের জানা আছে। দেশের মানুষ মনে করেন, যতদিন শেখ হাসিনা আছেন, ততদিন গণতন্ত্র টিকে থাকবে। দেশের মানুষ শান্তিতে থাকবে। উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে।’

এ সময় রাঙ্গার সমালোচনা করে আরও বক্তব্য দেন- জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী প্রমুখ। তারাও রাঙ্গার ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ এবং সংসদে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

এদিকে রাঙ্গার আপত্তিকর বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ১৪ দল। তারা এর জন্য রাঙ্গাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। গতকাল রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় ১৪ দল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তারা এই আহ্বান জানান।

প্রসঙ্গত, গত ১০ নভেম্বর দলের এক অনুষ্ঠানে জাপা মহাসচিব রাঙ্গা শহীদ নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর ও ফেনসিডিলখোর’ বলে উল্লেখ করেন। এদিন বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়েও কটুক্তি করেন রাঙ্গা। তার বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয় নূর হোসেনের পরিবারও। ব্যাপক সমালোচনার মুখে গতকাল এক বিবৃতিতে নিজের বক্তব্যকে ‘অযাচিত’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহার করে নেন এবং বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মশিউর রহমান রাঙ্গা।