স্বৈরাচারের ধ্বজাধারী রাঙ্গার প্রলাপ!|180309|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
স্বৈরাচারের ধ্বজাধারী রাঙ্গার প্রলাপ!
চিররঞ্জন সরকার

স্বৈরাচারের ধ্বজাধারী রাঙ্গার প্রলাপ!

রাজনীতিতে শ্রদ্ধাস্পদ বা প্রণম্য বা প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না, এমন কথা বলা যায় না।  মুহূর্তে এমন অনেকের নাম মনে এসে যায়, যারা সত্যিই শ্রদ্ধার পাত্র। তবু সব রাজনীতিককে এক পঙ্ক্তিতে ফেলে সামগ্রিকভাবে গালিগালাজ করার প্রবণতা আমাদের দেশে বেশ প্রচলিত। রাজনীতিকরা নির্লজ্জ, রাজনীতিকদের ত্বক সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে পুরু, রাজনীতিকরা দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনীতিকরা বিপজ্জনক এমন অজস্র নেতিবাচক বিশেষণ ও মন্তব্য ভেসে বেড়ায় সাধারণ জনপরিসরের দৈনন্দিন চর্চায়। এই ধরনের চর্চা কি আমাদের দেশের জনসাধারণের নিম্নরুচির পরিচয় নাকি রাজনীতিকদেরই একাংশ বা একটা খুব বড় অংশ এসবের জন্য দায়ী?

শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার উক্তি শুনলেই প্রশ্নের জবাবটা মিলবে। শহীদ নূর হোসেনকে তিনি ‘ইয়াবাখোর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গত ১০ নভেম্বর এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাকে হত্যা করলেন, নূর হোসেনকে? নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর।’

জর্জ বার্নাড শ’ প্রায় শতবর্ষ আগে বলেছিলেন, ‘পলিটিকস ইজ দ্য লাস্ট রিসোর্ট ফর দ্য স্কাউন্ড্রেলস’। জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার মন্তব্য শুনে মনে ধন্দ জাগছে! সত্যিই কি তবে ‘বদমাশ লোকদের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে রাজনীতির আঙিনা?’

তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি রাঙ্গার এই ন্যক্কারজনক মন্তব্যের। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক শহীদ নূর হোসেন সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ অনুমোদন করে না। বরদাস্ত করে না এই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং মানুষের আদালত। একজন অর্বাচীন রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন ইতরভাষা মোটেও মেনে নেওয়া যায় না।

পতিত স্বৈরাচার এবং তার সহযোগীদের ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে থাকার কথা ছিল, সেই সব সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এখন নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে যেমন অপমানিত করছে, একইসঙ্গে  সংগ্রামী চরিত্রগুলোকেও কলঙ্কিত করতে উদ্যত হয়েছে। এই ঔদ্ধত্য ক্ষমাহীন।

নূর হোসেন কে, তিনি কীভাবে মারা গেছেন, এদেশের রাজনীতিসচেতন মানুষ তা ভালোভাবেই জানেন। নূর হোসেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। প্রতি বছর ১০ নভেম্বর ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের এই দিনে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’Ñ সেøাগান ধারণ করে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এর পুরোভাগে থাকা নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। তার তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ, বেগবান হয় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

পতিত স্বৈরাচার এরশাদও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ১০ নভেম্বরকে তার দল জাতীয় পার্টি ‘গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। শহীদ নূর হোসেনকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন শহীদ নূর হোসেনের আত্মত্যাগের মহিমা স্মরণ করা হবে। কেননা শহীদের সম্মান সবার ওপরে। যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছে তাদের কেউ এভাবে অপমান করতে পারে না। রাঙ্গার এই ঔদ্ধত্য ক্ষমাহীন।

মনে রাখা দরকার, নূর হোসেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন এবং অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। কিন্তু স্বৈরাচারের ধ্বজাধারী সুবিধাবাদী রাজনীতির উচ্ছিষ্টভোগী মশিউর রহমান রাঙ্গার মতো মানুষ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন।

নূর হোসেন সম্পর্কে রাঙ্গা যে মন্তব্য করেছেন, তার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। সব ধরনের শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে একজন শহীদ সম্পর্কে অত্যন্ত কুরুচিকর মন্তব্য করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জাতই চেনালেন। এ ধরনের মন্তব্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সীমারেখার মধ্যে তো স্থান পায়ই না, সামাজিকতা বা সুস্থ রুচির গ-িতেও কোথাও ঠাঁই নেই ওই প্রলাপের।

ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান থাকলে কেউ এ ধরনের মন্তব্য যে করতে পারেন না, সে তো বলাই বাহুল্য।  নূর হোসেন সম্পর্কে জাতীয় পার্টির নেতার মন্তব্যগুলো বলে দিচ্ছে, ন্যূনতম রাজনৈতিক শিক্ষাদীক্ষারও অভাব রয়েছে ওই নেতার। এত মাথামোটা আর অর্বাচীন একটা লোক রাজনীতিতে এতদূর এলেন কী করে- সে প্রশ্ন তোলার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতির মূল কথা তো গণনীতি এবং জনসেবা। একজন শহীদ সম্পর্কে যিনি এমন নোংরা মন্তব্য করতে পারেন, তিনি কী করে জনগণের সেবক হন?

রাজনৈতিক শিক্ষার অভাব প্রকট বলেই এমন অশালীন মন্তব্য করার দুঃসাহস তিনি দেখিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে তা বুঝতে হবে। রাজনৈতিক শিক্ষা যাদের নেই, দায়িত্বশীল ভূমিকাগুলো থেকে তাদের দূরে রাখতে হবে। না হলে এই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থামার নয়।

অবিলম্বে এই ব্যক্তিকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বহিষ্কার করা উচিত। ওই নির্লজ্জ মুখ আর দেখতে চাই না। সেই দায়িত্বটা দেশের সব রাজনৈতিক দলকেই নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এমন অশিষ্ট অভব্য ব্যক্তি যদি রাজনীতির মঞ্চে দাপিয়ে বেড়ান সেটা রাজনৈতিক নেতাদের ইমেজের জন্যই ক্ষতিকর।

পুনশ্চঃ আমাদের পিতামহরা খড়ম ব্যবহার করতেন। এই খড়ম শুধু ‘পাদুকা’ হিসেবেই নয়; অশিষ্ট, দুর্বিনীত, উদ্ধতদের শায়েস্তা করতেও ব্যবহার করা হতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের পিতামহরা বিদায় নিয়েছেন। তাদের ব্যবহৃত খড়মও আজ লুপ্ত। এই বেহায়া মতলববাজ গণশত্রুদের বেসামাল প্রলাপ ও আচরণকে আজ কে নিয়ন্ত্রণ করবে?

লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট