চলচ্চিত্রের ভালো সময় দেখে যেতে চাই|180334|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
চলচ্চিত্রের ভালো সময় দেখে যেতে চাই
মৃধা আলাউদ্দিন

চলচ্চিত্রের ভালো সময় দেখে যেতে চাই

তুমুল জনপ্রিয় ‘রূপবান’খ্যাত নায়িকা সুজাতা আজিম। ১৯৬৩ সালে বিখ্যাত চিত্রপরিচালক সালাহ্উদ্দিন পরিচালিত ‘ধারাপাত’ ছবিতে সহনায়িকা হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক তার। ওই পরিচালকের ‘রূপবান’ সিনেমার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনশোর বেশি সিনেমায় উজ্জ্বল তার অভিনয় দক্ষতা। এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী এবার পাচ্ছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা। তার সঙ্গে কথা বলেছেন মৃধা আলাউদ্দিন

কেমন আছেন?

আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমতে খুব ভালো আছি। এখনো সুস্থ আছি। নিয়মিত কাজ করছি। এর চেয়ে আর বেশি কী লাগে? সেই অল্প বয়সে অভিনয়কে ভালোবেসে অন্য সব শখ-আহ্লাদ ত্যাগ করে দিনরাত শ্যুটিং করেছি। এখনো পছন্দের কাজ অভিনয়টাই করছি। আমি সৌভাগ্যবান। দর্শকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

বর্ণাঢ্য রুপালি পর্দার ক্যারিয়ার আপনার। সেই দীর্ঘ সফরের জাতীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেন। কেমন লাগছে?

এটা আবার বলতে হয়! আমি যারপরনাই খুশি। অনেক কষ্ট করে তিল তিল করে ক্যারিয়ার গড়েছি। জীবিত অবস্থায় সেই অর্জনের সম্মান পাওয়ার মতো সুখ আর নেই। আমি কৃতজ্ঞ সরকার ও জুরি বোর্ডের কাছে। তারা আমাকে যোগ্য মনে করেছেন আজীবন সম্মাননার জন্য। এই পুরস্কারের অনেক ভার। জানি না কতখানি বইতে পারব! কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব। আমার অশেষ ঋণ পুরো ক্যারিয়ারে যেসব পরিচালক, প্রযোজক, গল্পকার, সহশিল্পী, কলাকুশলী আমাকে নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের কাছে। এই পুরস্কারের ভাগিদার তারা সবাই।

এখন অভিনয় ছাড়া আর ব্যস্ততা কী নিয়ে? 

অভিনয় অনেক কমিয়ে দিয়েছি। বয়স হয়েছে, শরীরের ভাষাটাও তো বুঝতে হয়। খুব ভালো গল্প আর চরিত্র না হলে এখন আর কাজ করতে মন সায় দেয় না। গতানুগতিক গল্প করে সময় নষ্ট করব, সেই মানসিক ও শারীরিক শক্তি আর পাই না। তবে অবসর সময়টুকু সৃজনশীল কাজেই ব্যয় করি। এখন লেখালেখি নিয়ে বেশি ব্যস্ত। ‘শিমুলীর একাত্তর’ আমার প্রথম উপন্যাস। বীরাঙ্গনাদের কাহিনী নিয়ে এটি লিখেছিলাম। প্রথম উপন্যাসের পর মনে হলো, আমার আত্মজীবনী লেখা উচিত। লিখেও ফেলেছি। ওটা ছাপছে অক্ষর প্রকাশনী। ‘রূপবানের কথা’ ছাপছে অক্ষর প্রকাশনী। আর ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসটা দিয়েছি পুঁথিনীলয়কে। আমার মতো অন্য সিনিয়র শিল্পীদেরও আত্মজীবনী লেখা উচিত।

আপনার সিনেমা জগতে আসার গল্পটাও তো আরেকটি সিনেমা!

(মøানমুখে, নিচুস্বরে) ঠিক বলেছেন। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। কুষ্টিয়ায় আমাদের জমিদারি ছিল। অনেক করুণ কাহিনী আছে আমাদের সেই জমিদারি নিয়ে। সে আজ আর বলব না। কবি জীবনানন্দ দাশের মতো করেই বলতে হয়, ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।’ শুধু এটুকুই বলব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে না পেরে কিছুদিন পর মা আমাদের নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমালেন। আমরা প্রথমে পুরান ঢাকায় উঠলাম। তারপর ৪০ টাকা বাড়িভাড়ায় চলে এলাম নতুন ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে। মা উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসতেন। সেসব দেখেই তিনি এই জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনি আমাকেও এসব সিনেমা দেখতে উৎসাহিত করতেন। এমনকি আমার মা বাড়িতে সুচিত্রা সেনের অনুকরণে অভিনয়ও করতেন। একটু বড় হয়ে আমিও যখন সুচিত্রা-উত্তমের সিনেমা দেখতে শুরু করলাম, তখন থেকে মাকে আমার ‘গুরু’ আর সুচিত্রা সেনকে ‘আদর্শ’ হিসেবে মেনে এসেছি। মায়ের অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল, তার কোনো একটি সন্তান সিনেমার জগতে আসুক। আমাদের বাড়িওয়ালার সঙ্গে আমজাদ হোসেনের (বিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক) পরিচয় ছিল। মা তাকে ধরলেন- আপনি যদি তাকে বলে আমার ছোট মেয়েটাকে অভিনয়ের সুযোগ দিতেন তো খুব ভালো হতো। তারপর সত্যিই একদিন আমাদের পরিচয় হলো আমজাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি আমাকে মঞ্চনাটকে অভিনয়ের সুযোগ করে দিলেন। পরবর্তীকালে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক নারায়ণ ঘোষ মিতা, নারায়ণ চক্রবর্তী, আমজাদ হোসেনের অনেক নাটকে অভিনয় করেছি। চিত্রপরিচালক সালাহউদ্দিনের সহকারী পরিচালক ছিলেন আমজাদ ভাই। তিনিই আমার কথা বলেছিলেন ‘ধারাপাত’ সিনেমার নায়িকা করার জন্য।

বিয়ের পরই আপনার ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল সময় ছিল। তখন তো মেয়েদের নিয়ে সমাজ আরও কঠোর ছিল...

১৯৬৭ সালের জুলাইয়ে আজিম সাহেবের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়।  শ্বশুরবাড়ি থেকে অভিনয়ে কোনো বাধা আসেনি। যদিও আমার শাশুড়ি পর্দা করতেন। তবে কোনোদিন আমি মেকআপ মুখে শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে যাইনি। তারাও আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করেছেন। বিয়ের ১০ বছর পর আমাদের ঘর আলো করে সন্তান ফয়সাল জন্ম নিল। আমি সংসার ও চলচ্চিত্রÑ দুটি দিকই একসঙ্গে চালিয়ে নিয়েছি। আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। সকালে আমরা দুজনই এক সঙ্গে বের হয়ে যেতাম। একেকজন একেক ফ্লোরে অভিনয় করতাম। একসঙ্গেও করতাম।

এখনকার চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো না। এ থেকে কী করলে উত্তরণ হবে?

এখন ভালো সিনেমা নির্মাণ খুব কম হচ্ছে। তবে মাঝেমধ্যে দু-একটা ভালো সিনেমার খবরও পাই। এভাবে ভালো সিনেমা নির্মাণ হলে চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়াবে। চলচ্চিত্রের জন্যই জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি, তাই মৃত্যুর আগে চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো দেখে যাওয়ার খুব ইচ্ছা।