কার ক্ষমতা, কীসের ভুল, কারা দেয় মাশুল|180916|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
কার ক্ষমতা, কীসের ভুল, কারা দেয় মাশুল

কার ক্ষমতা, কীসের ভুল, কারা দেয় মাশুল

সারাহাতের বয়স তখন সাত, সামিয়ার পাঁচ আর সিফাতের মাত্র দুই বছর। তিন বোনের সবার বড় সারাহাতকে ভিকারুন নিসা নূন স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন ওদের মা সগিরা সালাম মোর্শেদ। বিকেলে স্কুলের কাছে পৌঁছানোর পরই ছিনতাইকারীর ছদ্মবেশে আসা দুই খুনি সগিরার রিকশা থামিয়ে হাত থেকে সোনার চুড়ি টেনে খুলে নেয়। সগিরা পালানোর চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান ৩৪ বছর বয়সী সগিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সহপাঠী সালাম চৌধুরীর সঙ্গে সগিরার প্রেম, তারপর বিয়ে, তিন কন্যাকে নিয়ে দুজনের সুখের সংসার। ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই ওই হত্যাকাণ্ডে তছনছ হয়ে যায় সালাম-সগিরার সংসার।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩০টি বছর। শৈশবে মাতৃহারা তিন কন্যাকে আগলে রেখে সালাম আর বিয়েই করেননি। সংসার আর জীবন তছনছ হয়ে গেলেও উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত চাকুরে সালাম সব কষ্ট সয়ে মেয়েদের মানুষ করতে পেরেছেন, জীবনকে মেনে নিয়েছেন। এ তো গেল একটা খুন বা অপরাধে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার এক পরিবারের কথা। কিন্তু ঘটনার অপর পক্ষে অপরাধীদের কী হলো? তারা কি ধরা পড়েছিল? তাদের কি শাস্তি হয়েছিল?  না।  গত ৩০ বছর ধরে হত্যার নির্দেশদাতা এবং হত্যাকারীরা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে ঢাকায় আসা এক নিরীহ তরুণকে ‘খুনি ছিনতাইকারী’ সাজিয়ে এই হত্যা মামলায় আসামি করেছিল পুলিশ। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের কৃষক মন্টু ওরফে মিন্টুকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে আসামি করার পর আদালতের রায়ে তিন বছর জেলও খাটেন তিনি।  নির্দোষ প্রমাণ হওয়ায় পরে খালাস পান মন্টু। তবে, মামলা-মোকদ্দমায় সব হারিয়ে, খুনি অপবাদ মাথায় নিয়ে চুপচাপ হয়ে যাওয়া মন্টু এখনো গ্রামেই থাকেন, কৃষিকাজ করেন।

দোষীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা আর নির্দোষের সাজা পাওয়ার দৃষ্টান্ত হয়ে চাঞ্চল্যকর সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলা ৩০ বছর পর আবার সামনে এলো। চলতি বছরের জুন মাসে আদালতের নির্দেশে ২৮ বছর পর সচল হয় হত্যা মামলাটি। পুলিশের তদন্ত ও আদালতের বিবরণ থেকে জানা যায়, ওই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন একজন মন্ত্রীর ভাগ্নে জড়িত ছিলেন। সে সময়ে গ্রেপ্তার করার পরও চাপের কারণে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।  মিথ্যা নাটক সাজিয়ে কৃষক মন্টু ওরফে মিন্টুকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, মন্ত্রীর ভাগ্নেকে বাঁচাতে মামলাটির অধিকতর তদন্তে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রুল জারি করে আদালত। যে কারণে প্রায় তিন দশকেও মামলার সুরাহা হয়নি। এবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ওই রুল বাতিল করে মামলাটির তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর ন্যস্ত করে। তদন্ত শেষে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন সংবাদ সম্মেলনে মামলাটির বিস্তারিত প্রকাশ করে।

পিবিআই-এর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পারিবারিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ২৫ হাজার টাকায় খুনি ভাড়া করে সগিরাকে হত্যা করা হয়। সগিরা হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তার স্বামী সালামের বড় ভাই ও তার স্ত্রী।  বড় ভাইয়ের শ্যালক রেজওয়ান ছিলেন হত্যার সহযোগী এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাগ্নে মারুফ রেজা ছিলেন ভাড়া করা খুনি। পিবিআই আরও জানায়, এই মামলায় ৩০ বছরে ২৬ জন তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন, যারা কেউ প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে পারেননি। এখন বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরী (৭০), তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা (৬৪), হাসান আলীর শ্যালক আনাছ মাহমুদ ওরফে রেজওয়ান (৫৯) এবং  মারুফ রেজাকে (৫৯) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আদালতে সগিরা হত্যায় সম্পৃক্ততা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। 

দীর্ঘ তিন দশক পর চাঞ্চল্যকর সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করা এবং গ্রেপ্তারের জন্য পিবিআই সাধুবাদ পেতে পারে। ২৮ বছর পর আদালতে মামলাটি সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চও ধন্যবাদ পেতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে এই প্রশ্ন ওঠা সংগত যে, যে পুলিশ কর্মকর্তারা মিথ্যা আসামি সাজিয়ে কৃষক মন্টুকে তিন বছর জেল খাটালেন এবং গ্রেপ্তারের পরও প্রকৃত আসামিকে ছেড়ে দিলেন, তারা সাজার আওতায় আসবেন কি? কিংবা যে বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলাটির তদন্ত প্রায় তিন দশক বন্ধ থাকল, তাদের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে? এই মামলা আবারও মানুষের সামনে বড় করে যে প্রশ্নটি হাজির করেছে তা হলো সমাজ ও রাষ্ট্রে কার বা কাদের ক্ষমতায় আইন-আদালত-পুলিশ-গোয়েন্দা সবাইকে প্রভাবিত করা যায় বা করা হয়? কার বা কাদের নির্দেশে পুলিশ মিথ্যা আসামির নাটক সাজায়? আর কারা নির্দোষ হয়েও ‘জজ মিয়া’, ‘জাহালম’ কিংবা ‘ছিনতাইকারী মিন্টু’ হয়ে বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেল খাটেন, সমাজ-সংসার হারিয়ে আমৃত্যু কোনো ‘ভুলের’ মাশুল দেন।