কৃষকের বিকাশে চিনিশিল্প|180919|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
কৃষকের বিকাশে চিনিশিল্প

কৃষকের বিকাশে চিনিশিল্প

চিনিশিল্প দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একমাত্র কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এ শিল্পের সাথে পাঁচ লাখ আখ উৎপাদনকারী কৃষক সরাসরি জড়িত। এছাড়া আখ কাটা, আঁটি বাঁধা, আখ পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে গ্রামবাংলার অসংখ্য কৃষিশ্রমিক, পাওয়ার টিলার ও গরু-মহিষের গাড়িচালক। অপরদিকে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমিক, কর্মচারী ও তাদের পরিবার-পরিজন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে অন্যান্য শিল্পকারখানার সঙ্গে শ্রমিক কর্মচারী ও আখচাষিদের স্বার্থে চিনিকলগুলোও জাতীয়করণ করেন।

চলতি মাড়াই মৌসুমে (২০১৯-২০) করপোরেশনের ১৫ চিনিকলে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ১ লাখ ২৫ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। চিনি আহরণ হার ধার্য করা হয়েছে শতকরা ৮ ভাগ। গত মাড়াই মৌসুমে ১১ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন হয়েছিল ৬৯ হাজার মেট্রিক টন। চিনি আহরণ হার ছিল শতকরা ৫ দশমিক ৮৩ ভাগ। চিনিকলগুলো হলোÑ পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর, রংপুর, জয়পুরহাট, নর্থ বেঙ্গল, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, কেরু, মোবারকগঞ্জ, ফরিদপুর ও জিলবাংলা। অনেকদিন ধরে এ শিল্প সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। অর্থ সংকটের কারণে শ্রমিক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন পান না। অবসরগ্রহণকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও পান না সময় মতো গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা। গত বছর চিনি বিক্রি না হওয়ার কারণে সময় মতো আখের মূল্য পরিশোধ করতে পারেনি চিনিকলগুলো। এজন্য রাগে-অভিমানে অনেক আখচাষি রোপণ করা আখ তুলে ফেলেন জমি থেকে। আখচাষিদের এই  ক্ষোভ ও হতাশা দূরীকরণের জন্য বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অজিত কুমার পালসহ করপোরেশনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন চিনিকলের আখচাষিদের সঙ্গে সভা সমাবেশ করে আখ সররাহের সঙ্গে সঙ্গে আখের মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আখের মূল্য পরিশোধ করা হলে আখচাষিরা তাদের উৎপাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ করবেন। নতুন করে আখ লাগাবেন এবং চিনিকলগুলোও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

দেশীয় চিনিশিল্পকে লাভজনক করতে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের পরামর্শ দিয়েছে জার্মান বিশেষজ্ঞ দল। এসব কলে চিনির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভুট্টা থেকে তেল ও অন্যান্য শিল্পপণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে বলেছেন তারা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনকেল ড্রাই অ্যান্ড সেপারেশন গ্রুপের একটি বিশেষজ্ঞ দল গত ১২ সেপ্টম্বর এসব পরামর্শ দেয়। সে সময় উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার। জার্মান বিশেষজ্ঞ দলের নেতৃত্ব দেন হেলকেন গ্রুপের পরিচালক উইলিয়াম ক্রেইগ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেশনে উইলিয়াম ক্রেইগ বলেন, অত্যাধুনিক জার্মান প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় করে ইক্ষু ও বিট থেকে অধিক পরিমাণ চিনি উৎপাদন করা সম্ভব। চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি অ্যালকোহল ও বায়োফার্টিলাইজারসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে চিনিশিল্পকে লাভজনক করা যায়। এ ব্যাপারে শিল্পমন্ত্রী বলেন, চিনিশিল্পকে লাভজনক করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। চিনি ছাড়াও চিনিকলগুলোতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদন করে এ খাতকে লাভজনক করতে চায় সরকার। চিনিকলগুলোর উন্নয়নে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো বিস্তারিত তুলে ধরে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব প্রেরণের জন্য প্রতিনিধিদলের প্রতি আহ্বান জানান শিল্পমন্ত্রী। শিল্পমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে অলাভজনক চিনিকলগুলোকে লাভজনক করা হবে।

চিনিশিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো আখ। গুণগত মানের আখ উৎপাদন, সংগ্রহ ও উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ডের জন্য মিলের প্রতিটি সাবজোনের দায়িত্বে থাকেন কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রিধারী একজন সহকারী ব্যবস্থাপক/ উপব্যবস্থাপক (সম্প্রসারণ)। দীর্ঘদিন ধরে চিনিকলগুলোর সাবজোন কর্মকর্তার বহু সংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। এতে আখ উন্নয়ন, ঋণ বিনিয়োগ ও সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে চাষি সংযোগ, পদ্ধতি প্রদর্শনী, ফলাফল প্রদর্শনী, শস্যকর্তনের ও খামার দিবসের মতো সম্প্রসারণ কর্মকা-। তাই আখ উৎপাদন ও সংগ্রহ বৃদ্ধির স্বার্থে চিনিকলের সাবজোনে সহকারী/ উপব্যবস্থাপক (সম্প্রসারণ)- এর শূন্য পদগুলো জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইউনিট পর্যায়ে আখ উন্নয়ন সহকারীদের শূন্য পদগুলোও পূরণ করা দরকার।

বর্তমানে প্রতি মণ আখের সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৪০ টাকা এবং প্রতি কেজি চিনির দাম ৫৫ টাকা। অন্যদিকে প্রতি কেজি গুড়ের দাম ৭০ টাকা। গুড়ের উচ্চমূল্যের কারণে অবৈধ পাওয়ার ক্রাশার মালিকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে উচ্চ চিনি আহরণযুক্ত মুড়ি ও আগাম রোপণকৃত গুণগতমানের আখগুলো ক্রয় করে গুড় উৎপাদন করে। আর চিনি কলে সরবরাহ করা হয় নামলা রোপণকৃত নিম্নমানের আখ এটাও বাংলাদেশে চিনিশিল্পের উন্নয়নের এক বিরাট অন্তরায়।

বাংলাদেশে প্রতি বছর চিনি চাহিদা প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন। দেশে উৎপাদিত আখ থেকে চিনি উৎপাদিত হয় এক লাখ টনেরও নিচে। গত বছর ১৫টি চিনিকলে মোট চিনি উৎপাদিত হয় মাত্র ৬৯ হাজার মেট্রিক টন। চাহিদার বাকি চিনি বিদেশ থেকে আমদানিকৃত র-সুগার পরিশোধন করে উৎপাদিত চিনি দিয়ে মেটানো হয়।

আশির দশকেও চিনিকল এলাকার কৃষক আউশ ধান ও পাট কেটে ওই জমিতে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আগাম আখ রোপণ করতেন। ওই সময় চিনি কলগুলোতে চিনি আহরণ হারও ছিল শতকরা আট ভাগেরও বেশি। তখন চিনিকলগুলো ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এখন আমন ধান কাটার পর কৃষক জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নামলা আখ রোপণ করেন। ওই নামলা রোপণকৃত অপরিপক্ব আখ মাড়াই করার কারণে মিলগুলোতে চিনি আহরণের হার অনেক নিচে নেমে গেছে। এছাড়া অধিকাংশ চিনিকলের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেও চিনি আহরণ হার হ্রাস পেয়েছে। এছাড়াও রয়েছে চিনি আহরণ হারের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব।

চিনিকলগুলো মিল এলাকায় শুধু আখ উৎপাদন ও সংগ্রহই করে না, আখ উৎপাদনের জন্য আখচাষিদের মধ্যে স্বল্পসুদে আখ বীজ, সার, কীটনাশক এবং নালাকাটা ও সেচের জন্য নগদ ঋণও বিতরণ করে। আখচাষিদের আখ উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়। চিনিকলের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আখ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি আখচাষিদের হাতে-কলমে শিখিয়ে দেন। পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে সহায়তা করেন। ই-পুর্জির মাধ্যমে আখচাষিদের আখ সংগ্রহ এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আখের মূল্য প্রদানের কারণে আখচাষিদের আখ বিক্রি ও আখের মূল্যপ্রাপ্তির সমস্যা বহুলাংশে সমাধান হয়েছে। এখন আখের মূল্যের জন্য কৃষককে চিনিকলে আর ঘোরাঘুরি করতে হয় না। রুপালি ব্যাংকের শিওর ক্যাশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষক ঘরে বসেই আখের মূল্য পান। চিনিকলগুলো আখ উৎপাদন ও আখ ক্রয় ছাড়াও চিনিকল এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট মেরামত করে। আখচাষিদের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করে। গত মাড়াই মৌসুমে ১৫টি চিনিকল এলাকায় আখের মূল্য বাবদ কৃষকের মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন প্রায় ৪১৪ কোটি টাকা প্রদান করে। কৃষিঋণ হিসেবেও বিতরণ করে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া চিনিকলগুলো শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতনভাতা বাবদ বছরে কোটি কোটি টাকা প্রদান করে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ চিনিকল এলাকায় চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি চাকাকে সচল রাখতে সহায়তা করে।

আখ চাষ করেই চিনিকল এলাকার বহু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পাকা বাড়ি ও জমির মালিক হয়েছেন। পাবনা চিনিকলের পাকুড়িয়া গ্রামের জুলফিকার আলী এবং সেতাবগঞ্জ সুগার মিলের কড়ই গ্রামের মো. রফিকুল ইসলাম তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বড় বড় আখচাষিরা এখনো বাড়িঘর মেরামত, জমি ক্রয় এবং ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও বিয়েশাদির মতো অনুষ্ঠানের খরচ মেটান আখ বিক্রির অর্থ দিয়ে- এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ধান, পাট ও গমের মতো মাঠ ফসলের তুলনায় বর্তমানে আখ চাষ অধিক লাভজনক। এক বিঘা জমিতে বছরে দু’বার ধান চাষ করে ৫ হাজার টাকার বেশি লাভ করা যায় না। অন্যদিকে এক বিঘা জমিতে আখ চাষ করে খরচ বাদে বছরে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব। সুকুমার সরকার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের একজন প্রগতিশীল আখচাষি। এ বছর তার ৮ একর জমিতে আখ আছে। তার মতে, প্রতি বিঘা জমিতে এ বছর তার ৬ গাড়ি আখ উৎপাদিত হবে। প্রতি গাড়ি আখের দাম ৪ হাজার টাকা হলে প্রতি বিঘা জমির আখ বিক্রি করে আয় হবে ২৪ হাজার টাকা। উৎপাদন খরচ ১৪ হাজার টাকা বাদ দিলেও তার বিঘাপ্রতি নিট লাভ হবে ১০ হাজার টাকা। এই পরিমাণ লাভ ধানচাষে সম্ভব নয়। এ জন্যই তিনি প্রতি বছর আখ চাষ করেন।

দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় আখ চাষে আগের মতো কৃষকের আগ্রহ নেই। তারপরও বলা যায়- বাংলাদেশে আখই একমাত্র ফসল, যা কৃষক সরাসরি সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে পারেন। এতে আখচাষিরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। আর এভাবেই আখচাষিদের আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চিনিকলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

লেখক

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর