পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমূল্য : জনগণের নাভিশ্বাস|181118|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমূল্য : জনগণের নাভিশ্বাস
মামুনুর রশীদ

পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমূল্য : জনগণের নাভিশ্বাস

সাম্প্রতিককালে পেঁয়াজ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। পেঁয়াজের যে এত শক্তি তা অতীতে কখনো বোঝা যায়নি। আমরা জানতাম ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে এবং পাকিস্তানে পেঁয়াজ অতি প্রয়োজনীয়। কারণ রুটি এবং পেঁয়াজ তাদের কারও কারও প্রধান খাদ্য। আমরা বুঝতাম বাঙালি মুসলমানদের মধ্যেও পেঁয়াজ বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যেহেতু এখনকার মতো বড় কোনো সংকট হয়নি তাই এই পেঁয়াজ নিয়ে অতীতে এত বড় জটিলতা সৃষ্টিও হয়নি। পেঁয়াজ নিয়ে সংকট এমন একটা পর্যায়ে পড়েছে যে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখছেন এবং বলেছেন যারা এই সংকট সৃষ্টি করেছে তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার যে ইতিমধ্যে নানা দেশ থেকে বিভিন্ন পথে পেঁয়াজ আসা শুরু হয়েছে এবং আকাশপথে পেঁয়াজ আসার সংবাদেও ব্যবসায়ীরা অনড় অবস্থান নিয়েছেন। গতকাল সারা দিন এবং রাতে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদে আমরা দেখেছি বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ মজুদ আছে।

 

আমরা চাহিদা এবং মজুদের অর্থনৈতিক তত্ত্ব জানি, একমাত্র মজুদ কম থাকলেই ব্যবসায়ীরা হু হু করে দাম বাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয় ১৯৪২-এর দুর্ভিক্ষে প্রচুর খাদ্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাঙলায় একটা বড় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যাতে বহু মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেত ছবিটি যারা দেখেছেন তারা এই সত্যের প্রমাণ পাবেন। ঐ বছর রেকর্ড পরিমাণ ফলন হয়েছিল। কিন্তু মজুদদাররা এমন এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করল যে মানুষ কোথাও খাদ্যদ্রব্য কিনতে পারছিল না। আজকের দিনে এই ধরনের সংকট সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে, সরকারি তৎপরতা বেড়েছে, বহু ধরনের ব্যবসায়ীর বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠেছে। সরকার ইচ্ছে করলেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে এই সংকট আজকের দিনে কী করে ঘটছে?

 

ষাট টাকা কেজির পেঁয়াজ দুইশ চল্লিশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারের নানা তৎপরতা একেবারেই ব্যর্থ হয়ে চলেছে। ব্যবসায়ীদের বড় সংগঠন এফবিসিসিআই কোনো কার্যকর ভূমিকা অতীতেও নিতে পারেনি এখনো নিচ্ছে না, বরং ঐ মজুদদারদের পক্ষেই নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছে। ওয়ান ইলেভেনের এক পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা অসহযোগিতা করেছিল তার একটা কারণও ছিল। ব্যবসায়ীদের ওপর সে সময় নানাভাবে নিপীড়ন চলছিল। এখন তো নিপীড়ন নেই, বরং সংসদ ব্যবসায়ীদের হাতে। মন্ত্রী ব্যবসায়ী। তারপরেও কী করে এই মারাত্মক সংকটটি সৃষ্টি হলো। ভারতবর্ষের ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে বহু শতবর্ষ আগে পর্যটকরা অনেক ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তাদের মজুদদারি, অসাধুতা, প্রতারণা ইত্যাদির অনেক ঘটনা তারা বর্ণনা করে গেছেন। সেসব আজও সত্য মনে হয়। শিশুখাদ্যে ভেজাল, দুধের তেজস্ক্রিয়তা, ফলে, মাছে এবং বিভিন্ন খাদ্যে ফরমালিন প্রয়োগ এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর সব দেশে এসব ব্যাপারে ক্ষমাহীন আইন রয়ে গেছে। সেই আইনের প্রয়োগ আমাদের দেশে হচ্ছে না। সাম্প্রতিককালে ওষুধের কার্যকারিতার সময় পার হয়ে গেলেও সেই ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। এসব ব্যাপারে বড় ধরনের নাগরিক চেতনা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষাই করতে হবে।

 

একটি ঘটনা বলি, একবার থাইল্যান্ডে সমুদ্রের ওপর গড়ে তোলা একটি হোটেলে অবস্থান করছিলাম। সকালের নাস্তায় মাত্রাতিরিক্ত দেরি হওয়াতে আমি হোটেল ম্যানেজারের কাছে যাই। বেশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করি এত বেলা হয়ে গেল নাস্তা কোথায়? ম্যানেজার ভালো ইংরেজি বোঝে না, উত্তরও দিচ্ছিল না। আমি আরেকটু রাগান্বিত হই এবং আবারও একই কথা জিজ্ঞাসা করি। ম্যানেজার শুধু আঙুল দিয়ে দূরে একজন বয়স্ক নারীকে দেখিয়ে দেয়। নারী কর্মীটি তখন কতগুলো পাউরুটিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছিল। যেহেতু ফ্লোরটি কাচের তাই দেখা যাচ্ছিল মাছের যেন একটা মহাউৎসব চলছে। একেবারেই ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে জানায় আমরা দুঃখিত। কাল রাতে এই পাউরুটিগুলোর তারিখ এক্সপায়ার হয়ে গেছে। সকাল বেলায় নাস্তা বানানোর সময় এটা আমাদের চোখে পড়ে তাই ওগুলোকে ফেলে দিচ্ছি। এবারে নতুন পাউরুটি আসবে আপনাদের নাস্তা তৈরি হবে। আমার ক্ষুধা প্রশমিত হয়। যদি একদিনের এক্সপায়ার হওয়া পাউরুটি আমাদের পরিবেশন করা হতো আমরা বুঝতেও পারতাম না কিন্তু তারা সেটা করেননি। এতগুলো পাউরুটি পানিতে ফেলে দেওয়া এটা আমাদের দেশে কোনো হোটেল ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব? কিন্তু দিনের পর দিন এক্সপায়ার হওয়া ওষুধ, খাবার আমরা খেয়ে যাচ্ছি, ভয়াবহ সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছি।

 

বাংলাদেশে প্রতিটি পরিবারে এখন ক্যানসারের হানা। যে ক্যানসারে লাভবান হচ্ছে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর। দুরারোগ্য এই ব্যাধিতে তাদের ব্যবসা বাড়ছে কিন্তু জীবন রক্ষা হচ্ছে না। খবরে আরও দেখলাম অল্প দামে পাওয়া যাচ্ছে বলে পচা পেঁয়াজও অনেকে কিনছে। এই পচা পেঁয়াজ দ্বারা রান্না করা খাদ্য কতটা স্বাস্থ্যকর হবে সেটাও ভেবে দেখবার বিষয়। এবারে ব্যবসায়ী সাংসদ, ব্যবসায়ীদের নেতা এবং ব্যবসায়ী মন্ত্রী সবাইকে প্রশ্ন করতে চাই পেঁয়াজের মজুদ নেই ঠিক আছে তাহলে দাম বাড়বে কেন? ইউরোপ, আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ায় মাঝে মাঝে কলা, ডিম এসবের ঘাটতি দেখা দেয়। তাতে জনমনে অসন্তোষ বাড়ে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু দাম বাড়ে না। একবার যখন ম্যাডকাউ হলো তখন অনেক দেশেই গরুর মাংস নিষিদ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ী সেই সময় গোপনে গরুর মাংস বিক্রি করার স্পর্ধা দেখায়নি বরং বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান করেছে। আমি হংকংয়ের একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় হঠাৎ মনে হলো এই তো গরুর মাংস। কিন্তু আমার বন্ধু আমাকে শুধরে দিয়ে বলল এটা উট পাখির ঘাড়। গরুর মাংসের বিকল্প হিসেবে ওদের দেশের কর্তৃপক্ষ এটাকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু পেঁয়াজের বিকল্প তো কিছু নেই। তাই পেঁয়াজের সমস্যার সমাধান করতে হবে। কিন্তু গত কিছুদিনের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের তৎপরতা এবং সরকারের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ, জনগণের নাভিশ্বাস ওঠানোর মূল্য, এসবের ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। একচেটিয়াভাবে মুনাফা করে যাচ্ছে কতিপয় ব্যবসায়ী। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে এই ব্যবসায়ীরা কি অন্য গ্রহে বসবাস করে? তাদের ওপর যথাযথ আইনের প্রয়োগ কি ব্যবহার করা যাবে না? এতো একটা ভয়াবহ ব্যবস্থা!

 

পেঁয়াজে মানুষের সহনশীলতা দেখে ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়াতে শুরু করেছে, আদা-রসুনের দামও বাড়ছে। শাক-সবজি আগে থেকেই বেড়ে আছে। এখন বাজারে ফুলকপিসহ নানান ধরনের শীতের সবজির আগমন হবে। দেখা যাবে সেগুলোর দামও আকাশচুম্বী। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের নাগলের বাইরে। দেশটা শুধুমাত্র উচ্চবিত্তের হয়, ব্যবসায়ীদের হয় তাহলে কথা নেই। তারা লুটপাট করে খেয়ে দেয়ে ভুঁড়ি ফুলিয়ে আইনের নাগালের বাইরে ঘুরে বেড়াক। কিন্তু দেশের সব জনগণ এই রাষ্ট্রের মালিক। সেই জনগণের তুলনায় অসাধু ব্যবসায়ীরা একেবারেই সংখ্যালঘিষ্ঠ। তাই কোন বিবেচনায় তারা আইনের হাত থেকে ছাড়া পাবে? নিরপেক্ষ তদন্ত হলে দেখা যাবে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী পেঁয়াজের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা করছে। আশ্চর্য লাগে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন তার বার্তা কি এদের কাছে পৌঁছায় না? অথবা তাদের হাত অনেক বড়। পেঁয়াজের এই সংকট না কাটলে অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের ওপরও তার একটা প্রভাব পড়বে। এমনিতেই আমাদের টাকার দাম কমছে। সেটাতেও একশ্রেণির ব্যবসায়ীদের হাত রয়েছে। আজই পত্রিকায় দেখলাম ভারতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যক্তির গড় মাসিক ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ১,৪৪৬ রুপি। অথচ আমাদের এখানে প্রতি মাসে নানাভাবে ব্যয় বেড়েই চলেছে। একবার কোনো পণ্যের দাম বাড়লে সেটি আর নিচে নামে না। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ায় কিন্তু কখনো কি দাম কমায়? পৃথিবীতে সব জায়গায় উৎসবের সময় দাম কমানোর হিড়িক পড়ে যায়। সৌদি আরবে রোজার সময় মানুষ সারা বছরের জন্য বাজার করে ফেলে। কারণ এই সময়ে সব জিনিসের দাম কম থাকে। আর আমাদের এখানে রোজা এলেই লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়তে থাকে। একদা আমাদের দেশে ব্যবসায়ীদের সামাজিক মর্যাদা ছিল না। প্রচুর বিত্ত থাকলেও শিক্ষিত মানুষদের কাছে তারা অবনত হয়ে থাকত। সামাজিক অনুশাসন মেনে চলত। কিন্তু এখন ব্যবসায়ীদের মর্যাদা বেড়েছে, তারা রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে। কিন্তু ঐ শিক্ষিত লোকেরা সমাজের যে দায়িত্ব নিত এই ব্যবসায়ীরা এখনো দায়িত্ব নিতে শেখেনি। সবশেষে একটা বিকল্প প্রস্তাব হতে পারে যে বাংলাদেশের মানুষ পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দেবে, ব্যবসায়ীদের আমদানি করা পেঁয়াজ পচে যাবে এবং তারা কোটি কোটি টাকার লোকসান দেবে। তবেই হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে।

লেখক

নাট্যব্যক্তিত্ব