গান্ধীরা যে কারণে বিরোধীদের নেতৃত্ব দিতে পারবে না|181120|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
গান্ধীরা যে কারণে বিরোধীদের নেতৃত্ব দিতে পারবে না
রামচন্দ্র গুহ

গান্ধীরা যে কারণে বিরোধীদের নেতৃত্ব দিতে পারবে না

মহাত্মা গান্ধীর ছিল চার পুত্র। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তারা সবাই কারাগারে গিয়েছিলেন। স্বাধীন ভারতে তাদের কেউ-ই কোনো ধরনের রাজনৈতিক পদ চাননি।

গান্ধীর ঘনিষ্ঠতম সহযোগীরা তার সততা অনুসরণ করেননি।

এটি সবার জানা যে, জওয়াহেরলাল নেহরুকন্যা ইন্দিরা গান্ধী ১৯৫৯ সালে কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। তুলনায় এটা কম জানা যে, বল্লভভাই প্যাটেলের পুত্র ও কন্যা বাবার নামের ওপর ভর করে পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন। সি রাজাগোপালাচারী ও গোবিন্দ বল্লব পন্থের ছেলেরাও এমপি হয়েছেন।

মহাত্মা গান্ধীর জোরালো নৈতিকতাবোধ স্বাধীনতা  আন্দোলনের অন্য মহীরুহদের মধ্যে সংক্রমিত হয়নি। তবে পুত্র বা কন্যাকে সংসদে পাঠানোর জন্য নিজের প্রভাব কাজে লাগানো এক কথা আর আপনার দলে নিজের পরিবারের প্রাধান্য বিস্তার ও তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্পূর্ণ আরেক ব্যাপার। নেহরু, প্যাটেল, রাজাজি আর পন্থ এরা ছোটখাটো ধরনের স্বজনপ্রীতি করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে সঞ্জয় গান্ধীকে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী মনোনীত করার মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী স্বজনপ্রীতিকে সুস্পষ্ট নীতির রূপ দেন। সঞ্জয় অকালে মারা গেলে ইন্দিরা রাজনীতিতে নামান তার অন্য পুত্র রাজীবকে। এতে এটি স্পষ্ট হয়ে যায়, কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলে রাজীব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার উত্তরাধিকারী হবেন।

সোনিয়া গান্ধী তার শাশুড়িকে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি ইন্দিরার স্মৃতির প্রতি নিবেদিত। এ কারণেই সোনিয়া মনে করেন না যে, জরুরি অবস্থার জন্য কংগ্রেসের দুঃখপ্রকাশ করা উচিত। আর এ কারণেই তিনি এত করে চান যে তার পুত্রÑ শুধু তার পুত্রই কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে তার উত্তরাধিকারী হোক।

রাহুলের নেতৃত্বে একাধিক সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের লজ্জাজনক পরাজয় ঘটলে তিনি পদত্যাগ করেন। রাহুল বলেছেন, তিনি চান গান্ধী পরিবারের বাইরের কেউ কংগ্রেসের সভাতি হোক। এ অবস্থায় তার মা পদে ফিরে এসেছেন যাতে ক্ষীয়মান এই সংগঠনটিতে তার পরিবারের কর্তৃত্ব এখনো বহাল।

আমি সারা জীবন কংগ্রেসের ‘ফার্স্ট ফ্যামিলির’ সমালোচক হলেও এটা মানি তাদের সমর্থকদের সবাই স্বার্থপর ধামাধরা নয়। কেউ কেউ তাদের সমর্থন করে এটা ভেবে যে, শুধুমাত্র কংগ্রেসই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। আর যেহেতু একমাত্র নেহরু-গান্ধী বংশই দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে (যেমনটা তাদের দাবি) সেহেতু হাল এ পরিবারের হাতেই থাকতে হবে। অন্যরা বলে, বিজেপিসহ অন্য অনেক দলেই বিশিষ্ট রাজনীতিকদের পুত্রকন্যারা প্রাদেশিক আইনপরিষদের সদস্য (এমএলএ), কেন্দ্রীয় এমপি বা মন্ত্রী হচ্ছেন। তাহলে এ বিষয়ে শুধু কংগ্রেসের দিকে আঙুল তোলা কেন?

 

আমার কাছে এসব যুক্তি হালে পানি পায় না। কংগ্রেস ১৮৮৫ সাল থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত কিংবা ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত পারিবারিক দল ছিল না। লক্ষণীয় বিষয়, সোনিয়া গান্ধী দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেননি; যে কারণে তৃণমূল কংগ্রেস, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস এবং ওয়াইএসআর কংগ্রেসের জন্ম। সম্মিলিতভাবে এ সংগঠনগুলোর এমপির সংখ্যা কথিত ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’-এর প্রায় সমান।

 

দ্বিতীয়ত, কোনো রাজনৈতিক দলে দুএকটা বংশানুক্রমিক এমপি থাকা তুলনামূলকভাবে মামুলি ব্যাপার। কিন্তু দলের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানে অর্পিত হওয়া গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ব্যত্যয়।

 

কংগ্রেসের সঙ্গে বিপরীতক্রমে বিজেপি কখনোই পারিবারিক দল ছিল না। ভোটারদের কাছে এর আবেদন ও এর শক্তির দিকটি এখানেই। নরেন্দ্র মোদি পুরোপুরিই এক স্বনির্মিত মানুষ। রাজনীতিতে তার কোনো বাবা এমনকি ধর্মবাবা ছিল না। এটা রাহুল গান্ধী থেকে তাকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক করে। প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় মোদির আরও সুবিধার দিক আছে। তিনি বেশি মেধাবী, বেশি পরিশ্রমী, অধিকতর সুবক্তা এবং বেশ কয়েক বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অধিকারী। নরেন্দ্র মোদির কোনো বংশানুক্রমিক শাসক না হওয়ার প্রধান ও মৌলিক সুবিধাটির সঙ্গে এগুলো হচ্ছে একগুচ্ছ সংযুক্তি।

 

সোনিয়া গান্ধী যখন ১৯৬৮ সালে প্রথম ভারতে আসেন তখন দেশটিতে আনুগত্য আর পদমর্যাদার রমরমা ছিল। আপনার বাবা বা দাদা কে তার ওপর বহুকিছু নির্ভর করত। পঞ্চাশ বছর পর আজ দেশটি আগের চেয়ে অনেক কম সামন্তবাদী। লোকে জানতে চায় আপনি কী করেছেন, আপনি কার পুত্র বা কন্যা তা নয়। ক্রীড়াঙ্গন ও ব্যবসা জগতে এটাই ঘটছে। রাজনীতিতেও। ভারতের তরুণ নাগরিকরা এটা দেখে যৌক্তিকভাবেই চিন্তিত যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের দলটি মনে করে শুধুমাত্র পঞ্চম প্রজন্মের একজন বংশধরই এর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। হতে পারে সোনিয়া গান্ধী ভারতীয়দের ভাবনাপ্রক্রিয়ায় এই গভীর পরিবর্তনটি দেখতে পারছেন না। তার দেখার সময়ও পেরিয়ে গেছে।

 

হিন্দুত্ব বা বর্তমান শাসকদের প্রতি কোনোরূপ সহানুভূতি নেইÑ এমন একজন হিসেবেই আমি লিখছি। সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনকালে নরেন্দ্র মোদির সরকার অঘোষিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসনকে ভয়াবহভাবে দুর্বল করেছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতের ওপর হামলা চালিয়েছে আর ক্ষতি করেছে অর্থনীতির। ব্যক্তিপূজার চর্চা আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ঘিরে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রীকরণ কর্তৃত্বপরায়ণতার পথে অবনমনেরই উদ্বেগজনক লক্ষণ। আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার ও সামাজিক সংহতির গাঁথুনি মেরামত করতে ভারতের জরুরিভিত্তিতে একটি শক্তিশালী ও আস্থাভাজন বিরোধী দল প্রয়োজন। সোনিয়া গান্ধী ও তার পরিবারের তরফ থেকে তা আসা অসম্ভব না হলেও সম্ভাবনাটি খুবই ক্ষীণ।

 

বিজেপি কিন্তু অজেয় নয়। তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনে হেরেছে। দলটি যে টানা একাধিক সাধারণ নির্বাচনে জিতেছে তার বড় কারণ এটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গোছের হয়ে উঠেছে। মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বংশ পরিচয় এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব। রাহুলের ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণাতেই তার প্রমাণ দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কৃষি সংকট সমাধানে ব্যর্থতার জন্য আক্রমণ না করে তিনি অস্ত্র করেছেন ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগকে। দুর্নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের নিজের অতীত রেকর্ডের কারণে রাহুলের ওই কৌশল ভোটারদের আকৃষ্ট করার বদলে বরং দূরে ঠেলে দিয়েছে।

 

আজকের কংগ্রেস দল আমাকে শেষের দিককার একজন মুঘল সম্রাটের কথা মনে করিয়ে দেয়। সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞী দরবারে তাদের গুণগানরত সভাসদ পরিবেষ্টিত। অন্যদিকে বাইরে সাম্রাজ্যের অধীন ভূখ-ের পরিমাণ ক্রমেই কমে শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। বিষয়টা এত মর্মান্তিক না হলে মজারই মনে হতো। কংগ্রেস যতদিন পারিবারিক প্রতিষ্ঠান থেকে যাবে নরেন্দ্র মোদির জন্য তার নীতির সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়া ততই বেশি সহজ হবে। সহজ হবে শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়, বরং রাজনৈতিক বয়ানের নিয়ন্ত্রণে থাকা। সোনিয়া, রাহুল ও প্রিয়াংকা হয়তো মনে করেন তাদের রাজনীতিতে থাকাটা কংগ্রেসের জন্য দরকার। কিন্তু আসলে দেশের জন্য তাদের বিদায় নেওয়া উচিত।

 

লেখক : ভারতের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ এবং খ্যাতিমান কলাম লেখক

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ