জি কের সহযোগী স্বপনের ‘দি বিল্ডার্সে’ বিপাকে ৩ সংস্থা|181216|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
জি কের সহযোগী স্বপনের ‘দি বিল্ডার্সে’ বিপাকে ৩ সংস্থা
তোফাজ্জল হোসেন রুবেল

জি কের সহযোগী স্বপনের ‘দি বিল্ডার্সে’ বিপাকে ৩ সংস্থা

যুবলীগ নামধারী বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীমের সহযোগী ও ব্যবসায়িক অংশীদার ফজলুল করিম চৌধুরী ওরফে স্বপন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান ‘দি বিল্ডার্স লিমিটেডের’ নামে থাকা প্রকল্পগুলো থমকে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর স্বপন চৌধুরীও দেশ ছেড়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির নামে চলমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ (জাগৃক) ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশ কয়েকটি উন্নয়নকাজ ঝুলে গেছে। এসব কাজ নিয়ে বিপাকে পড়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দি বিল্ডার্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী স্বপন চৌধুরীর মোবাইলে ফোন করলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাজ একেবারে থেমে নেই। আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। এর বেশি মন্তব্য আমি করতে পারব না। চেয়ারম্যান স্যারের (ফজলুল হক চৌধুরী স্বপন) সঙ্গে কথা বলে আপনার সাথে যোগাযোগ করব।’

ফেনীর বাসিন্দা স্বপন চৌধুরী বান্দরবানে জি কে শামীমের মালিকানাধীন ‘সিলভান ওয়াই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের’ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল এ কর্মযজ্ঞ শুরুর পরই বিতর্কিত ঠিকাদার স্বপন চৌধুরী বেশি আলোচনায় আসেন। বান্দরবান শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক সড়কের পাশে পর্যটনকেন্দ্র নীলাচলসংলগ্ন ছাইংঙ্গ্যাপাড়ায় প্রায় ১৫০ বিঘা জমিতে

রিসোর্টটি নির্মিত হচ্ছে। এজন্য নানাভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে জি কে শামীম ও স্বপন চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

ডিএসসিসি কর্মকর্তারা জানান, ২০১৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ‘গোস্বা নিবারণী’ পার্কের উদ্বোধন করেন মেয়র সাঈদ খোকন। ‘জল সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পের আওতায় ২৯ একর জায়গায় প্রায় ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কটি নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। স্বপন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান দি বিল্ডার্স এ কাজটি নেয়। গত বছরের শেষদিকে কাজটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। প্রথমে ৫৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ব্যয় পরে বাড়িয়ে ৮৬ কোটি টাকা করা হয়। এরপর আরও কিছু কাজ যুক্ত করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে শতকোটি টাকারও বেশি। তবে কাজের অগ্রগতি ৩০ ভাগ হলেও এরই মধ্যে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে সরকারি অর্থের পুরোটা অর্থাৎ ৬০ থেকে ৬৫ কোটি টাকা। কাজটি মূলত নগর ভবনের প্রভাবশালী কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন আহম্মেদ রতনের মাধ্যমে নেওয়া হলেও নির্ধারিত অংশের অর্থ নিয়ে তিনি কেটে পড়েছেন। পরে জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ায় স্বপনও গা ঢাকা দিয়েছেন। ফলে এ পার্কটি কবে নাগাদ মানুষ ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ডিএসসিসির চাঁনখারপুল মার্কেট নির্মাণের কাজটিও বাস্তবায়ন করছে স্বপন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান দি বিল্ডার্স। এর নির্মাণকাজও এখন থেমে আছে। প্রকল্পের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে শুধু পাইলিং করে কয়েকটি পিলার ঢালাই দেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, চাঁনখারপুল মার্কেটের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দুই বছর মেয়াদ দিয়ে তা শেষ করার কথা বলা হয় ২০১৯ সালের ১ অক্টোবরে। ১২ তলা ভিত্তির ওপর পাঁচতলা ভবনে ২৮৮টি দোকান নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আকারভেদে প্রতিটি দোকানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা। এরই মধ্যে দুদফা কিস্তির মাধ্যমে ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগ ৫ লাখ টাকা করে আদায় করেছে। সেই হিসাবে করপোরেশনের টাকা আদায়ের পরিমাণ ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

সরেজমিন গত বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, চাঁনখারপুল মোড়ে মার্কেটের জন্য নির্ধারিত জায়গাটি টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। একজন নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া সেখানে কোনো শ্রমিক দেখা যায়নি। এছাড়া দি বিল্ডার্সের হাতে থাকা ডিএসসিসি কমিউনিটি সেন্টার ও কাপ্তানবাজার মার্কেট নির্মাণের বিষয়টিও ঝুলে গেছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দি বিল্ডার্সের কাজগুলোতে এই মুহূর্তে কিছুটা ধীরগতি। তা কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়টি আমরা ভেবে দেখছি। গত বুধবার আমরা দি বিল্ডার্স কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে সভা করেছি। তারা বলেছে কাজে গতি বাড়াবে। যদি এরপরও কাজ বন্ধ বা গতি আশানুরূপ না হয় তাহলে পিপিআর অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জাগৃক সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর লালমাটিয়ায় ১৫৩টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করছে দি বিল্ডার্স অর্থাৎ স্বপন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান। জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর এই কাজটিও অনেকটা থেমে আছে। দি বিল্ডার্সের আর্থিক এখতিয়ার এককভাবে স্বপনের হাতে থাকায় প্রতিষ্ঠানটির অন্য কারও পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই অবস্থা মিরপুর ১৪ নম্বর দামাল কোট আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পেরও। জানতে চাইলে জাগৃকের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) এসএম ফজলুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দি বিল্ডার্সের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। শুনেছি প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাকি কিছুটা ঝামেলায় আছে। তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যারা কাজ দেখভাল করেন; তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্প সমাপ্ত করতে চেষ্টা করছি।’

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে স্বপন চৌধুরী নিজের প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবেও অধিদপ্তরের ঠিকাদারি কাজে অংশ নেওয়া শুরু করেন। এখন দি বিল্ডার্সের নামে সাত রাস্তার ভূমি অফিস নির্মাণে শতকোটি টাকার কাজ করছেন তিনি। এ কাজটিও থেমে গেছে বলে জানান গণপূর্ত অধিদপ্তরের (ডিভিশন-৩) দায়িত্বশীল একটি সূত্র।