দেশব্যাপী বড় পরিবহন ধর্মঘটের আশঙ্কা|181230|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
দেশব্যাপী বড় পরিবহন ধর্মঘটের আশঙ্কা
আশরাফুজ্জামান মণ্ডল

দেশব্যাপী বড় পরিবহন ধর্মঘটের আশঙ্কা

নতুন সড়ক আইন নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের কর্মবিরতির পর এবার দেশব্যাপী বড় ধরনের পরিবহন ধর্মঘটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণপরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থা সৃষ্টি হলেও পণ্যপরিবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিকরা আন্দোলনে যাচ্ছেন বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। তারা বলছেন, আজ সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে সারা দেশের মালিক ও শ্রমিক নেতারা আলোচনায় বসবেন। সেখানে ধর্মঘটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। ফলে আগামীকাল থেকেই অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের কবলে পড়তে পারে গোটা দেশ।

বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মকবুল আহমেদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পহেলা নভেম্বর থেকে জরিমানা ও জেলের ভয়ে অর্ধেকের বেশি ড্রাইভার গাড়ি চালানো ছেড়ে দিয়েছে। মালিক-শ্রমিক সবাই বেকায়দায় আছে। আগামীকাল (আজ) আমরা সারা দেশের নেতাদের ডেকেছি। সেখানে সিদ্ধান্ত হবে ধর্মঘটের বিষয়ে। তবে নিশ্চিত থাকেন আমরা কর্মবিরতি করব।’

গতকাল দেশ রূপান্তরকে একই কথা বলেছেন ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকের নিরাপত্তায় সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। সড়কে সব দুর্ঘটনার জন্য ড্রাইভার দায়ী নয়। তারপরও জোর করে শুধু শ্রমিকদের ওপর সব দায় চাপানো হয়েছে। এটা আমাদের বাঁচামরার লড়াই। বাধ্য হয়ে আমাদের আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হচ্ছে।’

২০১৮ সালের আগস্টে রাজধানীতে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর দেশব্যাপী নজিরবিহীন আন্দোলন শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনে সংশোধনী এনে নতুন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংসদে পাস করে সরকার। এতে সড়কে প্রাণহানিজনিত কারণে চালকের অজামিনযোগ্য ও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, পাঁচ বছর জেল অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানো, সহকারীর লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোসহ আইন লঙ্ঘনের বিভিন্ন ধারায় অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান কয়েকগুণ বাড়ানো হয়। এ নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিক

উভয়পক্ষের মধ্যে অসন্তোষের মধ্যেও সংবাদ সম্মেলন করে আইনটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা।

তবে আইনটির বেশিরভাগ ধারায় মালিক-শ্রমিকদের শাস্তির বিধানে কড়াকড়ি রয়েছে অভিযোগ তুলে এটি আবারও সংশোধনের দাবি জানায় মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। এরপর এক বছরেরও বেশি সময় আইনটি কার্যকর করেনি সরকার। সর্বশেষ চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে পরিবহন আইন কার্যকরের ঘোষণা দেয় পরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ট্রাফিক পুলিশের পদ্ধতিগত জটিলতায় দুই সপ্তাহ আইনের বাস্তবায়ন শিথিল করা হয়। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আইনের বাস্তবায়ন দুই সপ্তাহ আমরা শিথিল করেছিলাম। অনেকে হয়তো জানে না, কোন অপরাধ, কোন বিশৃঙ্খলার জন্য কী শাস্তিটা পেতে হবে। তার জন্য আমি দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছি। এখন আজকে (গতকাল) থেকে আমাদের এ আইন কার্যকর হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সড়ক আইনে বেশি জরিমানা মানে বেশি অর্থ নেওয়া নয়। বেশি জরিমানা দিলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সড়কে শৃঙ্খলার জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

এরই মধ্যে নতুন আইনের বিরোধিতা করে সব ধরনের পরিবহন শ্রমিকরা কর্মবিরতির চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে। গতকাল রাজধানীতে গণপরিবহন বন্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখনো পর্যন্ত আন্দোলনের পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। আইনটি কার্যকর করার মধ্য দিয়ে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়েছে ঠিকই, তবে এই মুহূর্তে আমাদের আন্দোলনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।’ আন্দোলন নিয়ে পরিবহন মালিকদের মধ্যে মতানৈক্য আছে কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গোটা পরিবহন খাত আমরাই নিয়ন্ত্রণ করি, এখানে কোনো পক্ষ-বিপক্ষ নেই।’

তবে রাজধানীতে চলাচলরত আয়াত, লাব্বাইক, রাজা সিটিসহ কয়েকটি পরিবহনের চালক ও সহকারীর সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে বিভিন্ন বক্তব্য। তারা বলেন, ভেতরে ভেতরে শ্রমিকদের বড় ধরনের কর্মবিরতির চেষ্টা চলছে। অনেক শ্রমিক স্বেচ্ছায় গাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এতে আন্দোলনে সায় না দিয়ে মালিকদের উপায় থাকবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিক ধর্মঘট যে হবে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটছে আঞ্চলিকভাবে। তবে এখনো আমাদের কেন্দ্রীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ধর্মঘটের আগে আমাদের অবশ্যই চেষ্টা থাকবে আইনটি সংশোধনে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।’

এদিকে নতুন আইন সংশোধনের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল দিনাজপুরের হিলি-বগুড়া রুটে সব ধরনের যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন শ্রমিকরা। হাকিমপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ধর্মঘটের কারণে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। বাস না থাকায় অন্য পরিবহনগুলোতে আদায় করা হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া।

তবে হিলি থেকে দিনাজপুর, হিলি-জয়পুরহাট, হিলি-ঢাকা রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। বাসচালক রতন কুমার বলেন, ‘নতুন আইনে বাস চালানো অসম্ভব। কোনো চালক কাউকে ইচ্ছে করে হত্যা করে না। গাড়ি চালাতে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড জেল অথবা ৫ লাখ জরিমানা দিতে হবে। আমাদের সে সামর্থ্য কই?’

দিনাজপুর মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন হাকিমপুর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। চালকরা নিজেদের উদ্যোগে বাস চালানো থেকে বিরত রয়েছে।’

যশোর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নতুন আইন সংশোধনের দাবিতে জেলার শ্রমিকরা গতকাল দুপুর থেকে দেশের ১৮টি রুটে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এমন সিদ্ধান্তে চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোর্তজা হোসেন বলেন, ‘নতুন আইনে চালকদের ঘাতক বলা হয়েছে। তাদের জন্য যে আইন হয়েছে তা সন্ত্রাসীদের জন্য প্রযোজ্য। এছাড়া এ আইনের বেশিরভাগ ধারা আপত্তিকর। এগুলোর সংশোধন জরুরি।’

জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, ‘পরিবহন ধর্মঘট যাতে স্থায়ী না হয় সেজন্য মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সভা করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আশা করি ধর্মঘট থাকবে না।’

এছাড়া বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর, নওগাঁ, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, নাটোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে পরিবহন ধর্মঘট পালন করা হচ্ছে।