বাসাবো বরদেশ্বরী কালীমন্দিরের জমিতেও চিত্তরঞ্জনের থাবা|181723|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
বাসাবো বরদেশ্বরী কালীমন্দিরের জমিতেও চিত্তরঞ্জনের থাবা
আলাউদ্দিন আরিফ

বাসাবো বরদেশ্বরী কালীমন্দিরের জমিতেও চিত্তরঞ্জনের থাবা

টানা ১২ বছর রাজধানীর ‘বাসাবো-রাজারবাগ শ্রী শ্রী বরদেশ্বরী কালী মাতা মন্দির’ কমিটির সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাস। এক সময়কার এই বিএনপি নেতা এখন সবুজবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটিতে যোগ দেন তিনি। অভিযোগ আছে, তারপর আওয়ামী লীগের ওই আমল এবং গত ১১ বছরে অসহায় হিন্দুদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। মন্দিরকে বানিয়েছেন অপরাধমূলক কাজের আখড়া হিসেবে। মন্দিরের কোনো হিসাব

 দেন না কাউকে, লুটপাট করছেন কোটি কোটি টাকা ও দখলে নিয়েছেন জমির একটি অংশ। মন্দির থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন ‘সেবায়েত’ মুক্তিযোদ্ধা শান্তিরঞ্জন মজুমদারকে; দখল করেছেন তার জমিজমাও।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকায় তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউই মুখ খোলার সাহস পান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন জানিয়েছেন, কালীমন্দিরের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করছেন চিত্তরঞ্জন দাস। যথেচ্ছ ব্যবহার করেন মন্দিরের অর্থ। অভিযোগ রয়েছে, মন্দিরের সম্পত্তি দখলে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় বাসাবোর পাটোয়ারীর গলির বহুল আলোচিত চাল ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন তসুকে হত্যা করা হয় তার ইঙ্গিতে। ওই হত্যা মামলায় প্রধান আসামিও করা হয় তাকে। যে মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে ২০০৯ সালে। বাদী সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আবেদন নিয়ে এখনো দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তসু হত্যা মামলার বাদী মোখলেসুর রহমান সাচ্চু তার আবেদনে বলেন, চিত্তরঞ্জন ও তার সহযোগীরা মন্দিরকে ব্যবহার করে এলাকায় মাদকের কারবার, বেআইনি অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অনিয়ম করে আসছে।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে চিত্তরঞ্জন দাস গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। সামনে আমাদের দলীয় কাউন্সিল এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন। এসব সামনে রেখে অপপ্রচার চলছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোক মন্দিরের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে। তাদের বাধা দেওয়ায় তারাই আমার বিরুদ্ধে মন্দিরের অর্থ লুটের অভিযোগ তুলেছে। কোনো অভিযোগেরই সত্যতা নেই।’

চিত্তরঞ্জন সম্পর্কে অবিভক্ত ঢাকা সিটির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মোশাররফ হোসেন মঞ্জুর দেওয়া প্রত্যয়পত্রে বলা হয়, ‘রাজারবাগ কালীবাড়ি অবৈধভাবে দখলে রাখার স্বার্থে মোবারক আলী তসুকে হত্যা করা হয়। চিত্তরঞ্জন একসময় বিএনপির কর্মী ছিলেন। তিনি কোনোদিনই আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটিতে যোগ দেন। চিত্ত গংদের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় নারী নির্যাতন মামলাসহ নানা ধরনের মামলা রয়েছে।’ প্রত্যয়নপত্রে আরও বলা হয়, ‘চিত্ত গংদের বিরুদ্ধে তসু হত্যা মামলাটি রাজনৈতিক মামলা ছিল না।’ প্রায় একই ধরনের প্রত্যয়নপত্র দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক কাউন্সিলর তাহমিনা আক্তার জ্যোতি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সনাতন ধর্মের অনুসারী কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে জানান, চিত্তরঞ্জনের বিরুদ্ধে কেউ কোনো বিষয়ে কথা বললে বা জানতে চাইলে তাকে নানাভাবে অপমান করা হয়। চিত্তরঞ্জনের প্রশ্রয়ে বাগপাড়া, হিন্দুপাড়ায় মাদকের রমরমা ব্যবসা চলছে। আর এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন তার ক্যাডার নাসির, শাহিন, আজিজ, সেন্টু ও আমির। তারা আরও জানান, সবুজবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দাস একসময় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের কর্মী ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কালীমন্দিরের জমির একটা অংশ নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে নেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় এলে অসহায় হিন্দুদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে হাতিয়ে নিতে থাকেন লাখ লাখ টাকা। সভাপতি হন রাজারবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রাজারবাগ অভয়বিনোদনী উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের। সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটিকে নিজের কব্জায় রেখেছেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজারবাগের মানুষের জানাজা ও ঈদের নামাজের জায়গা ছিল রাজারবাগ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ। চিত্তরঞ্জন কৌশলে বন্ধ করে দেন সেই মাঠ। স্থাপন করেন নিজের বাবার শ্রীনাথ দাসের মূর্তি। এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও ক্ষুব্ধ হন।

শান্তিরঞ্জন মজুমদার নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার করুণ আত্মকাহিনী’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। তাতে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়ে সেবায়েত শ্রী সুনীল কুমার বসু বরদেশ্বরী কালীমন্দিরের দায়িত্ব দেন শান্তিরঞ্জনকে। তিনি অনেক উন্নয়ন কাজে হাত দিয়ে মন্দিরের দীঘি খনন করে মাটি বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কিন্তু শ্রীনাথ দাস নামে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। পরে আদালত শান্তিরঞ্জনের পক্ষে রায় দেয়। তিনি কালীমাতা মন্দির, শিবমন্দির, ঠাকুরের আবাসিক ঘর নির্মাণ করেন। দাতব্য চিকিৎসালয় ও লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্রম ও গেস্ট হাউজ নির্মাণসহ নানা পরিকল্পনা নেন। কিন্তু শ্রীনাথ দাসের ছেলে চিত্তরঞ্জন দাস ১৯৯১-৯৬ সালে শ্মশানের কয়লা মাথায় স্পর্শ করে শপথ নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। তার সহযোগিতায় বিভিন্ন সময় বিএনপি নেতারা মন্দির প্রাঙ্গণে মিটিং করতেন। বিএনপি নেতাদের প্রশ্রয় পাওয়ায় সন্ত্রাসী হামলা করে চিত্তরঞ্জন ও তার সহযোগীরা মন্দিরের ঠাকুর প্রাণ কুমার তেওয়ারীর পরিবার ও কিছু দুস্থ পরিবারকে উচ্ছেদ করেন। শান্তিরঞ্জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দেওয়া হয় এবং তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। শান্তিরঞ্জন বহুজনের কাছে ন্যায়বিচারের ধরনা দিয়েও কোনো ফল পাননি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিকর্মী চিত্তরঞ্জন আওয়ামী লীগ হয়ে যান। মহানগর জরিপ চলাকালে মন্দিরের জমি চিত্ত ও তার ভাইদের নামে রেকর্ড করে নেন। সমীর সরদার ও মোবারক হোসেন তসু এসবের প্রতিবাদ করায় তসুকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া হয়।’ শান্তিরঞ্জন আরও বলেন, ‘সেবায়েত সুনীল কুমার বসু বিভিন্ন মন্দির উন্নয়ন ও চক্রান্তকারীদের হাত থেকে মন্দির রক্ষার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে আদালতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে শান্তিরঞ্জনকে মন্দিরের সেবায়েত নিয়োগ করেন।’

শান্তিরঞ্জনের অভিযোগ চিত্তরঞ্জনকে পড়ে শোনানো হলে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মন্দিরের জমি দখলে বাধা দেওয়ায় তারা আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার করছে। যার কোনো ভিত্তিই নেই।’