স্ত্রীকে দল বেঁধে ধর্ষণের পর স্বামীকে হত্যা|181727|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
স্ত্রীকে দল বেঁধে ধর্ষণের পর স্বামীকে হত্যা
জামালপুর প্রতিনিধি

 স্ত্রীকে দল বেঁধে ধর্ষণের  পর স্বামীকে হত্যা

জামালপুরে এক গৃহবধূকে দল বেঁধে ধর্ষণের পর তার স্বামীকে হত্যা করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নির্যাতনের শিকার ওই নারীকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে গত শুক্রবার রাতে সদর উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামে ওই ঘটনা ঘটে।ভুক্তভোগী গৃহবধূর ভাষ্য, এলাকার তিন যুবক তাকে বাড়ি থেকে তুলে জঙ্গলে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ ও ব্যাপক মারধর করে। এ সময় নিজের স্ত্রীকে বাঁচাতে গেলে স্বামীকে             

 হত্যা করে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয় ওই যুবকরা। এ ঘটনায় গত সোমবার রাতে মামলা হওয়ার পর মো. শাওন (২৫) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

অভিযোগ উঠেছে, ওই গৃহবধূ জামালপুর সদর থানার এসআই মো. গোলজার আলমকে ধর্ষণ ও তার স্বামীকে হত্যার বিষয়টি জানালেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। পুলিশ উল্টো অপমৃত্যুর মামলা করে ময়নাতদন্তের জন্য গৃহবধূর স্বামীর লাশ মর্গে পাঠায়। তিন দিন ঘুরেও পুলিশ ধর্ষণ মামলা না নেওয়ায় সোমবার রাতে ওই গৃহবধূ বাধ্য হয়ে বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। এরপর সাংবাদিকদের চাপে মামলা নথিভুক্ত করে পুলিশ।

দরিদ্র পরিবারের ভুক্তভোগী গৃহবধূ সোমবার রাতে জামালপুর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বসে বর্বরোচিত ওই ঘটনার বর্ণনা স্থানীয় সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ছানোয়ার হোসেন (৩৫), মো. শাওন (২৫) ও রফিজউদ্দিন (৪০) তাকে অসংগতিপূর্ণ সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়ে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। তিনি এতে রাজি না হয়ে স্বামী ও শ্বশুরকে বিষয়টি জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয় ওই তিন যুবক। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে তিনি (গৃহবধূ) ঘর থেকে বের হলে ওই তিন যুবক মুখ চেপে ধরে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। পরে এলাকার ছানোয়ারের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে নিয়ে ওই তিনজন তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এ সময় তাকে ব্যাপক মারধরও করা হয়। ধর্ষণের পর তাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে ফের মারধর করা হয়।

গৃহবধূর ভাষ্য, খবর পেয়ে স্বামী তাকে ওই তিন যুবকের কাছ থেকে রক্ষা করতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে ওই তিন যুবকের কাছে অনুনয়-বিনয় করেন স্বামী। কিন্তু অভিযুক্ত যুবকরা উল্টো তার স্বামীকে মারধর করতে করতে সেখান থেকে নিয়ে যায়। এর কিছু সময় পর তারা এসে বলে, ‘তোর স্বামী আত্মহত্যা করেছে।’

গৃহবধূ কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমার স্বামী কেন আত্মহত্যা করতে যাবে? আমার স্বামীকে ওরাই (ছানোয়ার, শাওন ও রফিজ) হত্যা করেছে। পরে তারা আমার স্বামীকে গাছে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার গল্প প্রচার করে। আমার মরা স্বামীকে দেখতে তাদের কাছে অনেক কান্নাকাটি করেছি, আমাকে ছেড়ে দিতে বলেছি। কিন্তু তারা আমাকে না ছেড়ে সারা রাত গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে। পরে সকালে গ্রামে পুলিশ আসছেÑ এমন খবরে তারা আমার হাত-পা থেকে দড়ি খুলে ছানোয়ারের বাড়ির একটি রুমে আটকে রাখে। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ ওই বাড়ি থেকে আমাকে উদ্ধার এবং আমার স্বামীর লাশ নিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুতে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে ধর্ষণ ও মারধরের ঘটনা আমি পুলিশকে জানাই। পুলিশ স্বামীর লাশের সঙ্গে আমাকেও থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু তারা আমার কাছ থেকে কোনো মামলা নেয়নি। আমার স্বামীকে হত্যা ও আমাকে ধর্ষণের বিষয়টি গুরুত্বই দেয়নি লাশ উদ্ধারে আসা এসআই মো. গোলজার আলম। পরে বাধ্য হয়ে প্রেস ক্লাবে এসে আমি এ ঘটনার বিচার চাইছি।’

 

সাংবাদিকদের চাপে থানায় মামলা নথিভুক্ত : সংবাদ সম্মেলনের পর সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় সাংবাদিকরা ভুক্তভোগী গৃহবধূকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। তিনি বর্তমানে হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। এছাড়া সাংবাদিকদের চাপে একইদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে ছানোয়ার, শাওন ও রফিজের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুজনকে আসামি করে ধর্ষণ ও মারধরের অভিযোগে একটি মামলা থানায় নথিভুক্ত হয়।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক হাসানুল বারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ওই গৃহবধূর শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধরের চিহ্ন ও ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তবে ধর্ষণের ডাক্তারি পরীক্ষার পর সবকিছু আরও পরিষ্কার হওয়া যাবে।’

জামালপুর সদর থানার ওসি মো. সালেমুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই নারীর স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি এটি আত্মহত্যা তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে জানা যাবে। নির্যাতিতা ওই গৃহবধূ মামলার পর রাতেই অভিযুক্ত শাওনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য দুই আসামিকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

ঘটনার পর গৃহবধূর অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত না করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সোমবার রাতে সাংবাদিকরা জানানোর আগে ধর্ষণের বিষয়ে আমার কাছে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। আর কোনো পুলিশ সদস্য কর্তব্যে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এসআই মোহাম্মদ গোলজার আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লাশ এবং ওই নারীকে উদ্ধারের সময় তিনি মারধরের অভিযোগ করলেও ধর্ষণের কোনো অভিযোগ করেননি। পরে লাশ উদ্ধার করে তাকেসহ থানায় নিয়ে আসা হলেও তখনো তিনি ধর্ষণের কোনো অভিযোগ করেননি। এছাড়া মারধরের ঘটনায় তাকে অভিযোগ করতে বলা হলে তিনি পরে অভিযোগ করবেন বলে জানান। তখন তিনি অভিযোগ করলে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে মামলা নথিভুক্ত করা হতো।’