বর্জ্য মিশ্রিত বিষাক্ত পানিতে চাষাবাদ|182331|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
বর্জ্য মিশ্রিত বিষাক্ত পানিতে চাষাবাদ
আহসান হাবীব অপু, রাজশাহী

বর্জ্য মিশ্রিত বিষাক্ত পানিতে চাষাবাদ

রাজশাহী মহানগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৮০টি পয়ঃনিষ্কাশন ড্রেন রয়েছে। ড্রেনগুলো দিয়েই শহরের সব বর্জ্য আর দূষিত পানি শহরের বারনই নদীতে নিষ্কাশন করা হয়। এসব ড্রেনে থাকা নোংরা পানি প্রায়ই দুর্গন্ধ ছড়ায়। কিন্তু এসব বিষাক্ত পানি দিয়েই দেদার চলছে চাষাবাদ। মূলত সবজির চাষই হয় বেশি। দূষিত পানিবাহী ড্রেনের পাশে থাকা জমিগুলোতেই এসব সবজি চাষ করা হয়। রাজশাহী শহর ও আশপাশ বাজারগুলোতে যে সবজি দেখা যায় তার বড় একটি অংশই ওই নিষ্কাশন ড্রেনের পানিতে চাষ করা। নগরী ও পবা এলাকায় দূষিত পানি দিয়ে সবজি চাষ উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। যা কি না জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এসব বন্ধে কারোরই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

শহরের প্রতিদিনকার বর্জ্য ও পানি অঁাকা-বাঁকা ড্রেন দিয়ে গিয়ে পড়ছে বারনই নদীতে। এতে ড্রেনের পাশে থাকা জমিতে নিয়মিত পানির জোগানও হচ্ছে। উপরন্তু জমির মালিকরাও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে থাকেন। কেননা সারা বছর পানির জন্য আর হাহাকার করতে হয় না। ড্রেনে স্যালোমেশিন বসিয়ে সামান্য খরচেই জমিতে সেচ দেওয়া যায়। আর যাদের জমির পরিমাণ কম তারা বালতিতে করে ড্রেনের পানি তুলেই করতে পারেন চাষাবাদ। জমির মালিকরা বলছেন, এ পানি ফসলে দিলে নাকি সারের তেমন একটা দরকার হয় না। যে কারণে উৎপাদন খরচও কমে যায়। তাছাড়া শাকসবজি অনেক তরতাজা দেখায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজশাহী শহরের মালদা কলোনি থেকে শুরু করে বারনই নদীর পাশে বিলে গিয়ে থেমেছে ড্রেন। আর বিলের পানি পড়ছে নদীতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ড্রেনের পানিতে হাসপাতাল, ক্লিনিকের বর্জ্য, রাস্তাঘাটের আবর্জনা, কলকারখানার বর্জ্য ও মানুষের বর্জ্য রয়েছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের তথ্যমতে, রাজশাহী নগরীর বেশিরভাগ বাড়ির পায়খানার সংযোগ ড্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত। একই সঙ্গে সেখানকার কারখানাগুলোতে বর্জ্য শোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ দুই কারণে এখানকার ড্রেনগুলোতে প্রতিনিয়ত পড়ছে কারখানার অপরিশোধিত ও ঘরবাড়ির বর্জ্য। রাজশাহী নগরীর পশ্চিম পাশ দিয়ে কোর্ট স্টেশন, বর্ণালী, সিলিন্দা ও পাকুড়িয়া এলাকা হয়ে বর্জ্য পানি বের হয়ে পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে দুয়ারী সুস্নইস গেট দিয়ে বারনই নদীতে পড়ে। নগরের পূর্ব পাশ দিয়ে অনুরূপ একটি নালার বর্জ্য নিষ্কাশন হয় পবার নওহাটা পৌর এলাকার হঠাৎপাড়া সস্নুইস গেট দিয়ে। এসব ড্রেনে দেখা মেলে মরা মুরগি, অপারেশনের ব্যবহৃত ময়লা, রক্ত, মানব বর্জ্যসহ আরও অনেক কিছু। আছে পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্ত‚প। এসব ড্রেনের পাশে দিয়ে গেলে নাক-মুখ চেপে ধরতে হয়। অনেক জায়গায় দুর্গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থার উপক্রম হয়। পানি পচে কালচে রং ধারণ করেছে। এসব পানি দিয়েই চলছে জমি চাষ।

স্থানীয়রা জানায়, ড্রেনের পানি দিয়েই ধান, পাট, টমেটো, রসুন, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, বেগুন, কাঁচা মরিচ, সরিষা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, মুলা, ঢেঁড়স, কাঁকরোল, বরবটিসহ সব ধরনের ফসলেরই আবাদ হয়। এসব জমি কখনই ফাঁকা থাকে না। বরং বছরজুড়েই নানান ফসল চাষ হয়।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ড্রেনে মেশিন দিয়ে জমিতে পানি নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। লম্বা পাইপ লাগিয়ে অনেক দূর পর্যন্তই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পানি। অনেক সময় তারা পানি নিতে ব্যবহার করছেন গজ-ফিতা পাইপও। সিটি হাট এলাকায় জমিতে পানি দিচ্ছিলেন আতাউর আলী। তিনি বলেন, ‘আমার ও পরিবারে পাঁচ বিঘা জমি আছে ড্রেনপাড়ে। এসব জমির জন্য আমরা সবসময়ই ড্রেনের পানি ব্যবহার করি। ড্রেনের পানিতে ভালো ফলন হয়। তাই এটি ব্যবহার করি।’

আরেক কৃষক শহিদুল ইসলাম পুঁইশাকের জমিতে পানি দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‌‘এই পানি ব্যবহারে আমাদের ফসল বেশি হয়। অনেক সময় পানির কারণে আমাদের সার ও কীটনাশকও কম দিতে হয়। এজন্য আমরা এ পানি ব্যবহার করে থাকি। এ পানিতে আবাদ ভালো হয়। কিন্তু গায়ে লাগলে গা চুলকায়। এ পানিতে ভবিষ্যতে জমির ক্ষতি হতে পারে। তবে ফসল ভালোই হচ্ছে।’ এ ব্যাপারে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান খান বাদশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরীর বর্জ্যের সঙ্গে কলকারখানার বর্জ্য এ নালায় যাচ্ছে। কারখানাগুলোতে নিয়ম অনুযায়ী বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) থাকার কথা। তা না থাকার জন্য এ রাসায়নিক বর্জ্যের সঙ্গে ভারী ধাতুও যোগ হচ্ছে। যা থেকে ক্যানসার ও অন্যান্য মারাত্মক রোগ ছড়াতে পারে। এটির মাধ্যমে কিডনির রোগ হতে পারে। আর্সেনিকজনিত রোগের আশঙ্কাও থাকে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‌‘এভাবে জমি চাষ করলে কয়েক ধরনের ক্ষতি হয়। প্রথমত এভাবে উৎপাদিত খাবার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, দ্বিতীয়ত এভাবে জমি চাষ করলে ওই জমির উৎপাদন ক্ষমতাও নষ্ট হয়। আবার যারা এ পানি ব্যবহার করছেন তাদেরও ক্ষতি হচ্ছে। এজন্য এটি প্রশাসনের নজরে আনা দরকার। যাতে করে মাটি ও মানবস্বাস্থ্য রক্ষা পাবে।’

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামসুল ইসলাম বলেন, ‌‘এটি আমরা জানি। চাষিদের সচেতন করা হচ্ছে। তবে এটির বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কারণ কোন পানি ব্যবহার করতে হবে আইনে তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। তবে তাদের সচেতন করা হচ্ছে। এখন তারা না মানলে তো আর কিছু করার থাকে না।’