গোলাপি দুঃস্বপ্নে তলিয়ে গেলেন ব্যাটসম্যানরা|182347|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
গোলাপি দুঃস্বপ্নে তলিয়ে গেলেন ব্যাটসম্যানরা
মোহাম্মদ খাইরুল আমিন, কলকাতা থেকে

গোলাপি দুঃস্বপ্নে তলিয়ে গেলেন ব্যাটসম্যানরা

(প্রথম দিন শেষে)

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ১০৬

ভারত ১ম ইনিংস : ১৭৪/৩

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের গোলাপি বলে খেলার রোমাঞ্চ শুরুতেই দুঃস্বপ্নে পরিণত। ইডেন গার্ডেনসে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলা নিয়ে কী উৎসব না করল ভারত। কিন্তু মাঠে নামার পর সেই উৎসব বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের স্পর্শ করতে পারল না। বলের আঘাতে লিটন কুমার দাসের পর মাঠ থেকে সরাসরি হাসপাতালে যেতে হয়েছে টিনএজার নাঈম হাসানকে। গতকাল দুপুরে টেস্ট খেলতে নেমে সূর্যাস্তের মধ্যে প্রথম ইনিংসে অল আউট মুমিনুল হকের দল। ভারতীয় পেসারদের গতিময় ঔদ্ধত্যের সামনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীনতা বিকটভাবে প্রকাশিত।

সিটি অব জয় কলকাতার ইডেনের দেড়শ বছরের ইতিহাস। ১৯৩৪ থেকে টেস্ট আয়োজনের ঐতিহ্য। কিন্তু কোনো দলের প্রথম ইনিংসের এমন করুণ দশা বলতে গেলে দেখা যায়নি শেষ ৪১ টেস্টে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাঠে উপস্থিত। দেখলেন টস জিতে মুমিনুল হক ইন্দোরের মতোই ব্যাটিং বেছে নিলেন। এরপর গাছ থেকে পাকা আমের মতো টুপটাপ দেশের উইকেট পড়তে দেখে খেলাপ্রেমী প্রধানমন্ত্রীর নিশ্চয় মন খারাপ হয়েছে।

৩০.৩ ওভারে ১০৬ রানে অল আউট। ১৭০ বলে খেল খতম। স্বাভাবিক হিসাবে এক সেশনের মতো। কিন্তু এখানকার খেলার ধরনে যা দেড় সেশন প্রায়। সর্বনাশ যা হওয়ার প্রথম সেশনে হয়ে গেছে ব্যাটসম্যানদের নিদারুণ ব্যর্থতায়। ওখানে গোলাপি বলের বাড়তি কৃতিত্ব নেই। প্রথম ঘণ্টায় ২৬ রানে ৪ উইকেটের পর ৬ উইকেটে ৬০। শামির বাউন্সারে মাথায় আঘাত পেয়ে কনকাশন শঙ্কায় লিটনকে মাঠ থেকে হাসপাতালে নিতে হয়। ২১.৪ ওভারে তাই লাঞ্চ।

ইন্দোর টেস্টে ব্যাটসম্যানদের কারণে হয়েছিল ভরাডুবি। প্রয়োগের অভাব ছিল স্পষ্ট। টেম্পারামেন্টের দেখা মেলেনি। টেকনিক নিয়ে সমস্যা তো আছেই। এর মধ্যে একেবারে অচেনা-অজানা গোলাপি বল নিয়ে কত কথা। পুরো গ্রিন টপ না হলেও কিছুটা ঘাসের শক্ত ইডেনসুলভ উইকেটে ভারতীয় তিন পেসার রাজত্ব করবেন জানা ছিল। গোলাপি বলের আর্লি সুইং, নতুন উইকেটে ব্যাটসম্যানদের টিকে থাকার কঠিন চ্যালেঞ্জ কিংবা সূর্যাস্তের পর গোধূলি বেলায় পেসারদের খেলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে কত কথা হলো। এমনকি প্রতিপক্ষকে ব্যাটিং দিয়ে তো অপরিচিত বলে কীভাবে ব্যাট করতে হয় তাও দেখা যেত। এখন কি না আড়াই দিনে টেস্ট শেষ হওয়ার শঙ্কা। সবকিছু মাথায় রেখে মুমিনুলের টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া এবং নিজেদের বোলারদের ম্যাচের প্রথম সুযোগ না দেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাটিং পারফরম্যান্সে চরম ব্যর্থতায় সেই প্রশ্ন আরও বড় হয়েছে।

এমন নয় যে এই প্রথম ৩০ থেকে ৪০ ওভারের মধ্যে অল আউট হলো বাংলাদেশ। গেল বছর জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে ১৮.২ ওভারে ৪৩ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল। সেবারও প্রশ্ন ছিল। এবারের প্রশ্নগুলো ভিন্ন।

কলকাতার ছেলে মোহাম্মদ শামি বল হাতে নিতে উল্লাসে ফেটে পড়ছিল গ্যালারি। তিন পেসারের মধ্যে তার গতিটা বেশি। এক বাউন্সার লিটনের হেলমেটে লাগে। ফিজিও জুলিয়ান কালেফাতো আসেন। শামি ও বিরাট কোহলি জানতে চান লিটনের অবস্থা। লিটন থেকে যান এবং পরের বলে শামিকে কভার ড্রাইভে বাউন্ডারি মারেন। কিন্তু এরপর আম্পায়ারকে অস্বস্তির কথা জানালে ফিজিও আবার আসেন। আর কোনো ডেলিভারি হয় না। প্রথম সেশন শেষ।

বিরতির সময় সুনিল গাভাস্কার বলছিলেন, একমাত্র লিটনের খেলা দেখে মনে হয়েছে গোলাপি বলের সম্ভাব্য বাড়তি কোনো কিছু দেখা যায়নি। চমৎকার খেলেছেন। কিন্তু গাভাস্কার ভুল শট, ভুল টেকনিকের জন্য দুষেছেন ইমরুল-মুমিনুল-মুশফিকদের। ২৭ বলের ২৪ রানের ইনিংসে ৫টি বাউন্ডারি ছিল লিটনের।

বিরতির পর নাঈমের সঙ্গে ইবাদত হোসেন নামেন। ১ রান করে এই ইনিংসের ৫ উইকেট শিকারি ইশান্ত শর্মার শিকার হয়ে তিনি ফিরলে লিটনের কনকাশন বদলি হিসেবে সুযোগ মেলে মেহেদী হাসান মিরাজের। ব্যাটসম্যানের জায়গায় ব্যাটসম্যান নামানোর সুযোগ অপশন দলে না থাকার মাশুল গুনেছে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসের বিরতির পর নাঈমের জায়গায় তাইজুল ইসলামকে নামানোর ঘোষণা আসে। নাঈমকে লিটনের মতো স্ক্যান করাতে যেতে হয় হাসপাতালে। মানে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রথমবার কনকাশন রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে এক দলের দুজন নামল মাঠে।

নাঈম ০ রানের সময় শামির বলে হেলমেটে আঘাত পেলেও উইকেট ছাড়েননি। এক ওভারে শামিকে দুটি বাউন্ডারিও মেরেছিলেন। কিন্তু অন্যদের মতো এই বোলারকে খেলতে তারও খুব কষ্ট হয়েছে। শরীর বাঁচাতে সংগ্রাম করছিলেন। ১৮ বছরের তরুণের অবদান তবু ১৯ রান।

ওপেনার সাদমান ইসলাম সর্বোচ্চ ২৯ রানের মালিক। ৫২ বল টিকেছেন। কিন্তু ইশান্ত-উমেশ-শামিরা তার জীবন নরক করে ছেড়েছিলেন। শামিকে শুরুতে ছাড়তে গিয়ে বলকে ব্যাটে লাগিয়ে নো ম্যান্স ল্যান্ডে পাঠিয়ে বেঁচেছেন। আরও একবার একটুর জন্য বাঁচা। বল ছাড়ার টেকনিক প্রশ্নবিদ্ধ করে আউট হওয়া সাদমান উমেশের বলে ঋদ্ধিমানের ১০০তম ডিসমিশালের শিকার।

আরেক ওপেনার ইমরুল কায়েস (৪) ইশান্তের বলে আউট হয়েও রিভিউ নিয়ে বেঁচেছিলেন। একই ওভারে দ্বিতীয় রিভিউতে বাঁচেননি। ডিফেন্স করতে গিয়ে পায়ে লাগিয়েছেন ঢুকে পড়া বল। ইশান্ত বৈচিত্র্যময় ডেলিভারিতে খেলছিলেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের নিয়ে। উমেশ বরাবর অ্যাঙ্গেলে বল করে পরীক্ষা নেন। তাই করেছিলেন। ছেড়ে দেওয়া বল খেলে অধিনায়ক মুমিনুল দলের টানা তিন ‘ডাক’-এর প্রথমটিতে পরিণত। সিস্নপে রোহিত শর্মার দুর্ধর্ষ ক্যাচ। সিমের ব্যবহার দেখানো উমেশ এক বল পর মোহাম্মদ মিঠুনকেও বল ভেতরে নিয়ে বোল্ড করে ফেরান শূন্য হাতে।

দলের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম (০) পরের ওভারে শামিকে উইকেট দিয়ে আসেন। ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বল ঢুকে স্টাম্প এলোমেলো হয় কীভাবে বুঝতে পারেন না। গতিকে খুব কাজে লাগিয়েছেন শামি। মাহমুদউল্লাহ (৬) ইন্দোর থেকে নড়বড়ে। খেলব না মারব করতে গিয়ে ইশান্তের বলে খোঁচা মারেন। সুপারম্যানের মতো পুরো লম্বা হয়ে ফার্স্ট সিস্নপ কোহলির ক্যাচ উইকেটরক্ষক ঋদ্ধিমানের হাতে। এরপর লিটনের মাথায় আঘাত। রিটায়ার্ড হার্ট। শেষে নাঈমও। বাংলাদেশ হাসপাতালে। সূর্য অস্তাচলে যেতেই অলআউট হওয়ায় গোধূলি বেলায় ব্যাট করতে হয়নি।

তাও স্বস্তি বোলাররা প্রতিরোধ দেখিয়েছেন। মায়াঙ্ক আগারওয়াল (১৪) আল-আমিনের শিকার। রোহিত শর্মা (২১) ও চেতেশ্বর পুজারাকে (৫৫) আউট করে স্যালুট ঠুকেছেন ইবাদত হোসেন। বিরাট কোহলি (৫৯) ও আজিঙ্কা রাহানে (২৩) অপরাজিত। ৪৬ ওভার ব্যাট করে ১৭৪ রান তুলে ৬৪ রানে এগিয়ে ভারত। বোলাররা রুখে দাঁড়ালেন বলে টস নিয়ে আরও আক্ষেপ। আর সব মিলে গোলাপি বলে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে রক্তাক্ত বাংলাদেশ।