ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বেপরোয়া গতি|182355|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বেপরোয়া গতি
আলাউদ্দিন আরিফ

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বেপরোয়া গতি

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশ চালুর পর যানবাহনের বেপরোয়া গতির কারণে প্রায় প্রতিদিনই এ সড়কে প্রাণহানি ঘটছে। গতকাল শুক্রবার মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের নিমতলা এলাকায় দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যুর পর দুই কিলোমিটারের মধ্যে আরেক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। এ দুটি ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৫০ জন। নিয়মিত এ সড়ক ব্যবহারকারী, এলাকাবাসী, ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং থানা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন– এক্সপ্রেসওয়ের এক পাশ দিয়ে দুই দিক থেকেই বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চলার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া অনেক গাড়িই এক্সপ্রেসওয়েতে চলার উপযোগী নয়। তাই এ সড়কে গাড়ির গতি নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি সরিয়ে অতিরিক্ত গতির জন্য ভিডিও মামলাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ে হিসেবে চলমান ঢাকা-মাওয়া ও মাদারীপুর-ভাঙ্গা সড়কের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। উভয় পাশের কংক্রিটের ঢালাই, ওভারপাস, আন্ডারপাস ও সৌন্দর্যবর্ধনসহ আনুষঙ্গিক কাজও শেষ পর্যায়ে। ২০২০ সালের জুন মাসের মধ্যেই মহাসড়কটি খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার্স কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এই প্রকল্পের সার্বিক তদারকি করছে। ৬ হাজার ২৫২ কোটি ২৯ লাখ টাকার বিশাল এ কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছে সাতটি প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে ৮ কিলোমিটার করে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুর সোয়া ৬ কিলোমিটার বাদ দিলে মূল এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ৫৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার এবং মাদারীপুর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার। এ এক্সপ্রেসওয়ের কোনো স্থানেই ট্রাফিক সিগন্যাল থাকবে না। ফলে কোনো যানবাহনকে রাস্তায় থামতে হবে না; গতিও থাকবে অনেক বেশি। আর এ গতির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও করছেন সড়ক ব্যবহারকারীরা। এরই মধ্যে সড়কটির কিছু অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সকাল ৮টার দিকে সিরাজদিখানের নিমতলা অংশে ঢাকা-মাওয়া রুটে বসুমতি পরিবহনের একটি বাসের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত ও একজন গুরুতর আহত হন। পাশের খাদে পড়ে বাসটির অন্তত ২০ যাত্রী আহত হন। এর ৬ ঘণ্টা পর একই সড়কে শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর অংশে স্বাধীন পরিবহন ও একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ১০ জন নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হন।

শ্রীনগরের বাসিন্দারা জানান, এক্সপ্রেসওয়ে আংশিক চালুর পর প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে সড়কের হাষাড়া হাইওয়ে পুলিশের এক সদস্য জানান, এক্সপ্রেসওয়েটি চার লেনের। এর মধ্যে কিছু অংশে এক পাশ খুলে দেওয়া হয়েছে। সবাই আগে যাওয়ার জন্য বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। তারপর রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং। ফলে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে।

সিরাজদিখান থানার ওসি ফরিদ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই আমরা তদন্তে দেখেছি মূলত বেপরোয়া গতির কারণেই এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সকালে বসুমতি পরিবহনের যে গাড়িটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেয় সেটিও ছিল বেপরোয়া গতির।’ প্রত্যক্ষদর্শী সালেহ উদ্দিন জানান, বসুমতি পরিবহনের যাত্রীবোঝাই গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। নিমতলা ব্রিজের আগে মোটরসাইকেলটি দ্রুতগতিতে এসে বাসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একজন মারা যান। বাসটিও ডান দিকে একটি ফিডার সড়কে নেমে দোকানের পাশে পড়ে যায়।

শ্রীনগর থানার পরিদর্শক-তদন্ত মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল দুপুরে বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সেখানে স্বাধীন পরিবহনের বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল। মাইক্রোবাসেরও অনেক গতি ছিল। দুটি গাড়ির বেপরোয়া গতির কারণে এই প্রাণহানি হয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখা যায় অধিকাংশ দুর্ঘটনাই হয় সড়কে বেপরোয়া গতির কারণে।’

হাষাড়া হাইওয়ে থানার ওসি মো. আবদুল বাতেন বলেন, ঢাকা-মাওয়া সড়কে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বেপরোয়া গতি। সড়কে কাজ চলার কারণে এক পাশ খুলে দেওয়ায় দুই দিকের গাড়ি এক পাশ দিয়ে চলে। সড়কে কোনো স্পিডব্রেকার নেই। তাই যে যেভাবে ইচ্ছা বেপরোয়া চালায়। একটু এদিক-ওদিক হলেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়। দুর্ঘটনা কমাতে গতি নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

হাষাড়া হাইওয়ে পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির অনেক গাড়িরই এক্সপ্রেসওয়েতে চলার মতো ফিটনেস নেই। চালকরা ইচ্ছেমতো গতিতে চালানোর কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। এটা নিয়ন্ত্রণে জরুরি হচ্ছে সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ করে দেওয়া। স্পিড মিটার ডিটেক্টরের মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত গতি হলে গাড়িগুলোকে ভিডিও মামলার আওতায় আনা গেলে চালকরা গতি কমাতে উৎসাহী হবেন।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মিয়াজী মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে বা মহাসড়ক সবখানেই গাড়ির গতির একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকা উচিত। সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করা গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সড়কে স্পিড মিটার ডিটেক্টর বসানোর প্রয়োজন হলে হাইওয়ে পুলিশের প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।