অতিরিক্ত মুনাফার কাছে লাঞ্ছিত হচ্ছে ভোক্তা অধিকার|183938|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ১৭:৩৯
অতিরিক্ত মুনাফার কাছে লাঞ্ছিত হচ্ছে ভোক্তা অধিকার

অতিরিক্ত মুনাফার কাছে লাঞ্ছিত হচ্ছে ভোক্তা অধিকার

সাবেক সচিব গোলাম রহমান ১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং ১৯৬৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুদিন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭০ সালে সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস (সিএসএস) পরীক্ষা দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাউন্টস সার্ভিসে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন এবং পর্যায়ক্রমে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর গোলাম রহমান এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সাল থেকে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি জনসেবা সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ট্রাস্টি ও সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন। দেশের সার্বিক ভোক্তা অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন গোলাম রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোক্তা অধিকার বিষয়ক সচেতনতা কতটুকু? ভোক্তা অধিকার নিয়ে আপনাদের কাজ এবং সরকারের ভূমিকাই বা এ বিষয়ে কতটা প্রভাব রাখছে? 
গোলাম রহমান : ভোক্তা অধিকারের বিষয়ে জনসচেতনতা একেবারেই ছিল না, আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে। ক্যাব প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৮ সালে। ক্যাব তখন থেকেই ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। ভোক্তা অধিকার ইনসাফের বিষয়। আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফেও আছে, ওজনে কম দেওয়া যাবে না, এটা জঘন্য অপরাধ, এজন্য শাস্তিরও বিধান আছে। প্রচলিত আইন বা সিআরপিসি-তেও এসব বিষয়ে কিছু কিছু বিধান আছে। কিন্তু সার্বিকভাবে ভোক্তার অধিকার রক্ষার জন্য কোনো ‘অল কম্প্রিহেনসিভ’ কোনো আইন ছিল না। বিগত দশ-বারো বছরে বেশ কয়েকটি আইন হয়েছে। প্রথমে ২০০৯ সালে হয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৩ সালে হয় নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১২ সালে হয় প্রতিযোগিতা আইন এবং ২০১৫ সালে হয় ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন। ফলে এখন মোটামুটিভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য একটা আইনি কাঠামো দাঁড়িয়েছে বলে বলা যায়। এসব আইন প্রয়োগ ও দেখভালের জন্য জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ, জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান এখন একটা কাঠামোয় কাজ করছে। কিন্তু এসব সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেনি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দপ্তর এখনো কেবল জেলা পর্যায়ে, তাতেও জনবল মাত্র দুইজন কি তিনজন এবং নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের এখনো জনবল নিয়োগই সম্পন্ন হয়নি।

দেশ রূপান্তর : আপনি আইনি কাঠামো এবং সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কথা বললেন। দেশে দুধ ও শিশুখাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি প্রসঙ্গে কিছু বিশ্লেষক সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) মতো একটা এককেন্দ্রিক প্রশাসনের অধীনে আনতে পারলে হয়তো খাদ্য ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করে ভোক্তা অধিকার রক্ষা করা সহজ হতে পারে।
গোলাম রহমান : জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ, জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি আমাদের এখানে পণ্যমান নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই রয়েছে। এখন বিএসটিআই-এর কাছ থেকে ১৯৫টি পণ্যের মান নির্ধারণ করাটা বাধ্যতামূলক। এছাড়া উৎপাদক বা প্রস্তুতকারকদের আবেদনের ভিত্তিতে তারা আরও পণ্যের মান নির্ধারণ করে থাকে, তবে সেটা বাধ্যতামূলক নয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর যে কথা বললেন তা আলোচনা করতে হবে। আমাদের এখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে থাকে। যেমন, ওষুধ ইত্যাদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখে। বিএসটিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্টগুলো দেখে, এটা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে। নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের এই কর্ম বিভাজন অনুসারেই এখন কাজ হচ্ছে। এটা সত্য যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় থাকাটা খুবই জরুরি হলেও কাক্সিক্ষত সমন্বয় দেখা যায় না। তবে, এফডিএর মতো এককেন্দ্রিক কাঠামো হলে অবস্থার উন্নতি হবে না অবনতি হবে সে বিষয়ে অবশ্যই বিশদ সমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপণ্যের বিষয়ে ভোক্তারা দুই ধরনের সংকটে রয়েছেন। প্রথমত, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে মান নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভয়াবহ ভেজাল ও দূষণের আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত যেটা আজকাল প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, খাদ্য ও পণ্যের দাম আকস্মিকভাবে বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। দুটো সংকটেরই তীব্রতা সাম্প্রতিক সময়ে বারবার আমাদের সামনে আসছে। এ দুই সংকটকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
গোলাম রহমান : যেসব পণ্য বিএসটিআই অনুমোদিত সে সবের মান তাদের নিশ্চিত করার কথা। এজন্য তারা বাজার থেকে স্যাম্পল বা নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে থাকে। পরীক্ষায় পণ্যটি মানসম্মত নয় বলে প্রমাণ হলে উৎপাদকের লাইসেন্স বাতিল করার কথা তাদের। বিএসটিআই যেসব পণ্য অনুমোদন দেয় সেসব পণ্যের মোড়কে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা থাকে। যদি কেউ অনুমোদিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে তাহলে যে কেউ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারেন। যদি শাস্তি হিসেবে জরিমানা করা হয় সেক্ষেত্রে জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়ারও বিধান রয়েছে। 

দেশ রূপান্তর : আপনি কি মনে করেন যে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় কোনো ভোক্তার এমন অভিযোগ করার এবং তার প্রতিকার পাওয়ার অবস্থা রয়েছে?
গোলাম রহমান : ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর হয়েছে এক দশকের মতো। একসময় বছরে মাত্র কয়েকশ অভিযোগ সেখানে জমা হতো। এখন বছরে আট-দশ হাজারের মতো অভিযোগ আসছে। এর অর্থ ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ছে। অবশ্য এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ভোক্তাদের সচেতন করার বিষয়ে একটা বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে আমি মনে করি।

দেশ রূপান্তর : বাজারে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে আমরা প্রায়ই ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কথা শুনি। সম্প্রতি সরবরাহ সংকটে পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়া কিংবা ফসলের পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও চালের দাম বেড়ে যাওয়ার পর আমরা সিন্ডিকেটের কথা শুনলাম। আবার পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও গুজব ছড়িয়ে লবণের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাতেও এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কথা শোনা গেল। বিষয়টি আসলে কী বা কেন এমন হচ্ছে?
গোলাম রহমান : আসলে অতি মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যদি কোনো অসাধু চক্র গড়ে ওঠে তখন আমরা সেটাকে সিন্ডিকেট বলে থাকি। অনেক সময় কোনো লিখিত বা প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়াও কর্মের যোগসাজশে এমন সিন্ডিকেট হতে পারে। বাজারে সরবরাহের ঘাটতি না থাকলে এবং প্রতিযোগিতা থাকলে এটা হওয়ার কথা না।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়েছে, কিছু পরিমাণে রপ্তানিও করছে। আবার চাল আমদানিও করা হয়। কিন্তু আমরা দেখছি, প্রতি বছরই কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধান বেচে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না কৃষকরা। আবার ভোক্তারা বেশি দামে চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থাৎ উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু ফড়িয়া, চালকল মালিক, আড়তদার বা ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন। এটা কি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়?
গোলাম রহমান : উৎপাদক বা কৃষকরা তো সংগঠিত নয়। উৎপাদন বেশি হলে কৃষকরা ভালো দাম পায় না। এজন্য সরকার উৎপাদন ব্যয়ের নিরিখে ধান-চালের দাম নির্ধারণ করে এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহ করে থাকে। তবে, মুশকিল হলো সরকারি মজুদ পর্যাপ্ত না হলে অনেক সময় বাজারে হস্তক্ষেপ করে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা থাকে না।

দেশ রূপান্তর : পেঁয়াজ সংকট মোকাবিলায় সরকার অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির পদক্ষেপ নিল। কিন্তু যথাসময়ে পেঁয়াজ পাওয়া গেল না। পেঁয়াজ আসতে শুরু করার পরও বাজারে দাম কমল না। সরকার টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশে মাত্র ৩৫টি স্থানে ট্রাকে করে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করতে শুরু করল, পরে তা বাড়িয়ে ৫০টি করা হলো। আপনি কি মনে করেন সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে এভাবে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হবে?
গোলাম রহমান : না। সেটা সম্ভব নয়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি’র মূল লক্ষ্য ভিন্ন ছিল। যখন আমাদের দেশ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিল তখন টিসিবি করা হয়েছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে পণ্যদ্রব্যের সরবরাহ ও জোগান নিশ্চিত করার জন্য। এখন আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতির মডেলে রয়েছি। যেখানে মনে করা হয়, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন, সরকার ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করবে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করবে। এখানে টিসিবির ভূমিকা খুবই সীমিত, মূলত আপৎকালীন।

দেশ রূপান্তর : খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের মান এবং দাম সবক্ষেত্রেই ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। উৎপাদক বা কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উৎপাদন ভালো হলেও কিংবা মজুদ থাকলেও বাজারে দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজারে কারসাজি করছে। উৎপাদন-মজুদ-আমদানি-রপ্তানিতে সমন্বয় থাকছে না। মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভেজাল-দূষণরোধ করা যাচ্ছে না। প্রায়ই এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে একে কি সামগ্রিক বাজার পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বা ব্যর্থতা মনে করেন?
গোলাম রহমান : বাজারে অনেক প্লেয়ার থাকে। উৎপাদকরা আছেন, পরিবহনকারীরা আছেন, মজুদদার বা আড়তদার, আমদানিকারক, রপ্তানিকারকরা আছেন। সবাই মুনাফার জন্যই কাজ করে, পুঁজি লগ্নি করে। আবার বাজারে একটা অদৃশ্য হাতও আছে। এই অদৃশ্য হাতই আসলে পুরো বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। আসলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এখানে ভেজাল, দূষণ, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বারবার এমন হওয়ার কথা না। এখানে সমস্যা হয়ে গেছে, একদিকে সুশাসন নেই, অন্যদিকে অতিরিক্ত মুনাফার কাছে লাঞ্ছিত হচ্ছে ভোক্তা অধিকার।