সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বলি বাবরি মসজিদ |185486|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বলি বাবরি মসজিদ
সৌমিত্র দস্তিদার, কলকাতা থেকে

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বলি বাবরি মসজিদ

সাতাশ বছর আগে বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়া হলো। বিজেপির প্রথম সারির সব নেতা হাজির ছিলেন তাদের অস্থায়ী অফিস ‘রাম কথা কুঞ্জে’। একেবারে নক্ষত্র খচিত চাঁদের হাটে কে নেই! মহামান্য লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, প্রমোদ মহাজন, সাধ্বী ঋতম্ভরা, উমা ভারতী, রাজমাতা বিজয় রাজে সিন্ধিয়া ও আরও অনেকে। আর অবশ্যই শান্তি বজায় রাখতে পুলিশ, প্যারা মিলিটারি ও বেশ কয়েক কোম্পানি মিলিটারি। চারপাশের সংখ্যালঘু জনমনে আতঙ্ক লক্ষ করে বারেবারে পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সবাইকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে কোথাও কোনো অশান্তি হবে না। আদভানি, প্রমোদ মহাজন, বিজয় রাজে সিন্ধিয়ারা সাংবাদিকদের বোঝাচ্ছিলেন যে আরএসএস একটি সংগঠিত সংগঠন ফলে তার সদস্যরা কখনো বিশৃঙ্খল হতেই পারে না। কথা ছিল প্রতীকী করসেবার। বিভিন্ন রাজ্য থেকে শত শত করসেবক, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্য সমর্থকেরা জড়ো হয়েছিলেন আগের দিন রাত থেকেই ।

চারপাশের গগনভেদী চিৎকারে আদভানিদের কথা চাপা পড়ে যাচ্ছিল। সবার অলক্ষ্যে মসজিদ চূড়ায় হাতে গেরুয়া নিশান নিয়ে উঠে পড়ল দুই করসেবক। আকাশ কাঁপিয়ে আওয়াজ উঠলজয় শ্রী রাম। ততক্ষণে মসজিদে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। নেতাদের মৃদু ওজর-আপত্তিকে কিছুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বাঁধভাঙা জল প্লাবনের মতো জনতার ঢেউ আছড়ে পড়ছে মসজিদ ভাঙার নেশায়। ইচ্ছে থাক বা না থাক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ততক্ষণে নেতাদের হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। গেরুয়া ফেট্টি মাথায় লাগানো করসেবকদের বিরাট বাহিনী তখন প্রায় পাঁচশ বছরের প্রাচীন মসজিদ ভাঙার নেশায় মত্ত।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সেনা, আধা সেনার বিশাল ফৌজ। রামভক্তদের হাতে হাতে লাঠি, ত্রিশূল ও অন্যান্য অস্ত্র। মসজিদ লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে অজস্র পাথর। প্রভূত শৃঙ্খলাপরায়ণ সংঘ পরিবারের ‘দেশভক্ত’ সমর্থকদের আক্রমণ নেমে এলো সাংবাদিকদের ওপর। সংঘীদের ভাষায়- ‘বাবুর কি আওলাদ’ সংবাদ মাধ্যমের দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিরা মার খেতে লাগলেন ভক্তদের হাতে। পুলিশের সামনেই। অধিকাংশ ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমও এই তাণ্ডব থেকে রেহাই পেল না।

জনমোর্চার সাব-এডিটর সুমন গুপ্তের অভিজ্ঞতা একটু শুনে নেওয়া যাক। সুমনের জবানিতেÑ‘সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ আমি পৌঁছে যাই অযোধ্যার বিতর্কিত অঞ্চলে। গিয়ে দেখি পুলিশের নিরাপত্তা দেয়ালের আশপাশে জনতার ঢল নেমেছে। সামনে ডায়াসে নেতারা একের পর এক ভাষণ দিচ্ছেন। খাঁকি প্যান্ট পরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের স্বেচ্ছাসবীরা ভিড় সামলাচ্ছেন। তাদের অনুমতি নিয়ে কেউ কেউ আর একটু সামনে, মানে মসজিদের কাছে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অল্প দূরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অফিস থেকে গোলাপি কুপন দেওয়া হচ্ছে যাতে সমর্থকরা পুলিশ বেষ্টনী পার হয়ে মসজিদের কাছে গিয়ে করসেবা দিতে পারে। খেয়াল করলাম কে কত দূরে যাবে বা করসেবায় অংশ নেবে তা সবটাই নিয়ন্ত্রণ করছে আরএস, হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা, বজরং দল। পুলিশ প্রশাসনের কোনো ভূমিকাই নেই। তারা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে হাসি হাসি মুখে মজা দেখার মেজাজে দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ উত্তেজনায়, আবেগে করসেবকদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলেও ফেলছেনÑ মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে।

তবু ১১টা সোয়া ১১টা অবধি কিছু পুলিশি ব্যারিকেড ছিল। তারপর দেখি পঁচিশ তিরিশ জনের একটা দল যাবতীয় বাধা তছনছ করে গেরুয়া ঝান্ডা নিয়ে ঢুকে পড়ল মসজিদের খুব কাছে । মসজিদ চূড়ায় অনেকেই তখন উঠে পড়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংঘল সামনে এগোতেই উদ্বুদ্ধ জনতার ঢল মসজিদ লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে লাগল। পরে পরেই হামলা শুরু হয়ে গেল সংবাদমাধ্যমের ওপর। তিন চারজন করসেবক কোনো প্ররোচনা ছাড়াই আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। ঠেলতে ঠেলতে তারা আমাকে একটা দেয়ালে ঠেসে ধরে আমার ক্যামেরা কেড়ে নিতে চাইছিল। অনেক ধস্তাধস্তির পর এক মহিলা করসেবক শেষ অবধি ক্যামেরা ছিনতাই করতে সফল হলো। ঘটনা যখন ঘটছে তখন অন্তত চল্লিশ পঞ্চাশ জন পুলিশ, সিআরপিএফের জওয়ানরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। চলে আসছিলাম। কয়েক গজ গেছি কি যাইনি আবার, এবার একটা বড় দল আমাকে চড়-থাপ্পড় মেরে প্রায় অজ্ঞান করে দিল। আমি পানি পানি করে চেঁচাচ্ছি। একজন জওয়ানও এগিয়ে এলো না। আমি কোনোরকমে ওই রক্তে মাখামাখি শরীরে প্রাণ নিয়ে ছুটতে ছুটতে পালাতে লাগলাম। ততক্ষণে সারা ভারত জেনে গেছে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মসজিদ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন করসেবকরা।’

অনেকেই বলেন বামিয়ানের বুদ্ধদেবের চমৎকার মূর্তি ঠিক একইভাবে তালিবান দুষ্কৃতিরা ভেঙে দিয়েছিল। শুনেছি ওপার বাংলার বিভিন্ন জায়গায় মসজিদ ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় ভাঙা হয়েছিল অজস্র মন্দির। কোনো সন্দেহ নেই সব ঘটনাই নিন্দাজনক। একুশ শতকের দুনিয়ায় স্রেফ মন্দির মসজিদ গির্জা নিয়ে পারস্পরিক হানাহানির আমি অন্তত কোনো যুক্তি পাই না। তবে একটা কথা না বলে থাকতে পারি না। আফগানিস্তানে বুদ্ধদেবের মূর্তি বা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন কিছুটা হলেও আমার ধারণা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আর ভারতের বিষয়টি তার সাবেক সংবিধানে লিখিত ধর্মনিরপেক্ষ নীতির প্রতি প্রথম সরাসরি আঘাত হানা। সাতাশ বছর আগে যে উন্মাদনা মৃদু বাতাস বইয়ে দিয়েছিল গেরুয়া বাহিনী তা এখন ঝড় হয়ে ভারত রাষ্ট্রের যাবতীয় নীতি মূল্যবোধ বদলে ক্রমে ক্রমেই সে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ১৯৩৭ সালে সাভারকরের দ্বিজাতিতত্ত্বে সিলমোহর লাগাতে ব্যস্ত ।

তখনো নাট্যমঞ্চে মহানায়কের প্রবেশ ঘটেনি। আজকের হিন্দু হৃদয় সম্রাট প্রধানমন্ত্রী  নরেন্দ্র মোদি বা অধুনা ‘চানক্য’ বলে পরিচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তখন পার্শ্বচরিত্র মাত্র। তখন তো শুধু ইয়েতো স্রেফ ঝাঁকি হ্যায় ছিল। তারপর ধীরে ধীরে গঙ্গা দিয়ে কম জল তো আর গড়াল না। গুজরাট গণহত্যা থেকে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনকে আলবিদা বলা, নিজেরই দেশের একটি সম্প্রদায়ের ওপর বিদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে তকমা লাগিয়ে দেওয়াÑ হিন্দুরাষ্ট্র তৈরির অভীপ্সাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভাবগতিক যা দেখছি তাতে এখন সংবিধান বদলে হিন্দুরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটুকুই যা বাকি।

লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা