বিচারবহির্ভূত হত্যা চলছেই|185813|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
বিচারবহির্ভূত হত্যা চলছেই
উৎপল রায়

বিচারবহির্ভূত হত্যা চলছেই

দেশে কথিত ক্রয়ফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ তো আছেই। লেগেই আছে ধর্ষণ, শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৪৮ সালে ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকারের ওপর সার্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। এ ঘোষণাপত্র অনুযায়ী রাষ্ট্রের একজন নাগরিক স্বাধীনভাবে চলাফেরা, মতপ্রকাশ করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা পাওয়াসহ দৈহিক নিরাপত্তার মতো মানবাধিকার ভোগ করবেন।

দেশের মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দেশে দিন দিন মানবাধিকার পরিস্থিতি সঙ্গীন হচ্ছে। কোনো কোনো ভুক্তভোগীর জন্য তা দুর্বিষহ। ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও, তা সঠিকভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে না। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের সঙ্গে বর্তমানে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির মিল নেই।

মানবাধিকার ও আইন সহায়তাকারী বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, বিগত কয়েক মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, ধর্ষণ, শিশু হত্যাসহ মানবাধিকার পরিস্থিতির যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংগঠনটি বছরব্যাপী বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে পরিসংখ্যান তৈরি করে। তারা মনে করছে, বিভিন্ন উৎস থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি।

আসকের হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে ৩৩৫ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের আগে ২৫৬ ও পরে ৭৯ জন এমন ঘটনার শিকার হয়েছে। অবশ্য ২০১৮ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। আসকের তথ্যমতে, গত বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কথিত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৪৬৬ জন, যাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে ছিল মাদক কারবারে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। এছাড়া গত বছর অন্তত ৩৪ জন গুমের শিকার হয়। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে ১৯ জন ফিরে এলেও ঘটনার বিষয়ে তারা কেউ মুখ খোলেননি। আসক বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের ১৩টি অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ফেরত এসেছেন চারজন। এখনো নিখাঁজ সাতজন। তুলে নেওয়ার পর গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে একজনকে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন একটি পরিস্থিতিতে দেশে মানবাধিকার দিবস পালিত হচ্ছে, যদি এক কথায় বলি তাহলে পরিস্থিতি দুর্বিষহ। বিচারবহির্ভূত হত্যা বেড়ে চলেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যখন গুমের ঘটনা কমে যায়, তখন বিচারবহির্ভূত হত্যা বেড়ে যায়। আবার বিচারবহির্ভূত হত্যা কমে গেলে গুম বাড়ে। কয়েক বছর ধরে এমন চলছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটি ভয়ার্ত পরিবেশ বিরাজ করছে, যেখানে আমরা প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও পাচ্ছি না। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও কথা বলার পথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র নাগরিককে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র যদি তা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে আমরা সভ্যসমাজে বাস করছি বলে দাবি করতে পারি না।’

চলতি বছর ১০ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) সারা দেশে ১ হাজার ২৫৩টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আসক। এর মধ্যে ৮৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬২ নারীকে। আর ধর্ষণের পর লোকলজ্জায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০টি। একই সময়ে বিভিন্ন বয়সী ৩৯৬ শিশু হত্যাসহ অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এদের বেশিরভাগই হত্যার শিকার। আর ৩৭ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আসকের হিসাবে গত ১০ মাসে সারা দেশে শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৫০৯টি। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, বলাৎকার, যৌন হয়রানি ও শিক্ষকদের দ্বারা নির্যাতনের ঘটনাও ছিল। এছাড়া জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক গুলিতে নিহত হয়েছে ৩২ বাংলাদেশি, এর মধ্যে নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে চারজনের।

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী নারী গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন, মৃত্যু ও আত্মহত্যা নিয়ে ৩২টি ঘটনা রেকর্ড করেছে আসক। তাতে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা সাতটি, ধর্ষণের ঘটনা ১২টি, এসিড নিক্ষেপের ঘটনা একটি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে আত্মহত্যার ঘটনা একটি ও নির্যাতনে একটি মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। বাসাবাড়িতে ১০ গৃহকর্মীর মৃত্যুর কথা বলা হলেও মৃত্যুর ধরন বা নির্যাতন নিয়ে কিছু বলা হয়নি।

বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার্বজনীন মানবাধিকারের যে ঘোষণাপত্র এবং বর্তমানে বাংলাদেশের মানবাধিকারের যে পরিস্থিতি তাতে ওই ঘোষণাপত্রের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি হত্যার ধরনও পরিবর্তন হচ্ছে। পাশাপাশি ধর্ষণ, শিশু হত্যার মতো ঘটনাও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলে দাবি করা হলেও মানুষের নিরাপত্তা কিন্তু নিশ্চিত হচ্ছে না। পৃথিবীর সব দেশেই এ ধরনের অপরাধ হয়। সেখানে অন্তত বিচারটা দ্রুত পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশে সেটিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হচ্ছে না। সার্বিক পরিস্থিতিতে আগে মানুষের নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘের ঘোষণা ও সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশসহ সব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কিন্তু বাড়ছেই। এ নিয়ে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল অর্থাৎ মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তির সুরক্ষা সেটি পূরণ হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসন ও পুলিশকে অপরাধ দমন করতে হবে, ঠিক আছে। কিন্তু তা মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে তাদের আইনে সোপর্দ করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটি করতে পারলে ও আইনের শাসন সুনিশ্চিত হলেই আমরা বলতে পারব, আমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।’