স্ত্রী-পুত্রের পর অজয় রায়ের মরদেহ হাসপাতালে দান|186218|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
শ্রদ্ধা ভালোবাসায় বিদায়
স্ত্রী-পুত্রের পর অজয় রায়ের মরদেহ হাসপাতালে দান

স্ত্রী-পুত্রের পর অজয় রায়ের মরদেহ হাসপাতালে দান

‘আমার বড় ভাই অভিজিৎ রায় হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি বাবা। বিচার দেখে যেতে পারলে তিনি হয়তো কিছুটা স্বিস্তবোধ করতেন’– সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অনুজিৎ রায় মঙ্গলবার  কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাবার মরদেহ সামনে রেখে বললেন এই কথা। সকাল সোয়া ১১টায় মুক্তিযোদ্ধা এই প্রবীণ অধ্যাপকের মরদেহ আনা হয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। এরপর সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানান বরেণ্য এই শিক্ষাবিদকে। সেখানে অনুজিৎ রায় বলেন, ‘পিতাকে হারানোর বেদনা মর্মে মর্মে আমি অনুভব করি। তিনি শুধু আমার পিতা নন, তিনি একজন বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা,  লেখক ও গবেষক। তার গুণ বলে শেষ করা যাবে না। তিনি ইচ্ছা করলে বিদেশে সপরিবারে থাকতে পারতেন। শুধু বাংলাদেশের টানেই সপরিবারে এখানে ছিলেন।’ বাবা বলতেন, ‘এটা আমাদের দেশ। এখান থেকে আমরা যাব কেন? তিনি যে ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, স্বাধীন, আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তা যদি অর্জিত হয়, সেখানেই হবে সার্থকতা।’

ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুরুতেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুল আওয়ালের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় মুক্তিযোদ্ধা অজয় রায়কে। এরপর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানান অজয় রায়ের প্রতি। শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘অজয় রায় ও আমি সমসাময়িক ছিলাম। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চেতনা ছড়িয়ে দিতে একসঙ্গে কাজ করেছি।’ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘আমাদের প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সব সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সন্তানকে জঙ্গিরা  মেরে ফেলেছে। সন্তানের লাশ বুকে চেপেও তিনি আদর্শ থেকে পিছপা হননি। নতুন প্রজন্ম তার জীবন ও আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হবে।’

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য  মো. আখতারুজ্জামান, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি জিয়াউদ্দিন তারিক আলী, জঙ্গি হামলায় নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের পিতা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রমুখ। হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘অধ্যাপক অজয় রায় জ্ঞানের সাধনা করেছেন, মুক্তচিন্তার সাধনা করেছেন, মানবতার সাধনা করেছেন, সমাজকে নিয়ে ভেবেছেন। তার মৃত্যুতে আমরা একজন মুক্তিযোদ্ধা, জ্ঞানের সাধককে হারালাম।’

বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, জগন্নাথ হল, জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, যুবমৈত্রী, কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, ইতিহাস সম্মিলনী পরিষদ, ঢাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, ছাত্র ইউনিয়ন, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, শর্টফিল্ম ফোরাম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, খেলাঘর আসর, জাতীয় কবিতা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট প্রমুখ।

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি ব্লগার অভিজিৎ হত্যার বিচারের দাবিও ওঠে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘অজয় রায় সারা জীবন মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। উগ্রবাদীরা তাকেও হত্যার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু তাকে হত্যা করতে পারেনি, তার ছেলে অভিজিৎকে হত্যা করেছে। আমরা দাবি জানাই, দ্রুত অভিজিৎ হত্যার বিচার বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি উগ্রবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। সেই সঙ্গে ঢাকার একটি সড়কের নামকরণ অজয় রায়ের নামে করা হোক।’

শিক্ষাবিদ মাহফুজা খানম বলেন, ‘অজয় স্যার মৃত্যুর আগে তার ছেলে অভিজিৎ হত্যার বিচার দেখে  = যেতে পারেননি। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। আমরা আশা করব, দ্রুত অভিজিৎ হত্যার বিচার যেন করা হয়।’

এদিন বেলা সাড়ে ১২টায় মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। সেখানে কিছু সময় রাখার পর মরদেহ নেওয়া হয় জগন্নাথ হলে। এরপর অজয় রায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য মরদেহ বারডেম হাসপাতাল কর্ত„পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে অজয় রায়ের স্ত্রী শেফালি রায় এবং ছেলে অভিজিৎ রায়ের মরদেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় হাসপাতালে দান করা হয়।