তারকাদের ভাবনায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস|186754|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
তারকাদের ভাবনায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
সুদীপ্ত সাইদ খান

তারকাদের ভাবনায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। প্রতি বছর এ দিনটি এলেই বাঙালি স্মরণ করে সেইসব অমর আলোকবর্তিকাকে। দেশ রূপান্তরের কাছে দিবসটি নিয়ে নিজেদের ভাবনার কথা জানালেন তারকারা। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন সুদীপ্ত সাইদ খান

মৌটুসী বিশ্বাস

আমার নানা অবনী মোহন দত্ত একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। একাত্তরে তাকেও হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের ফিলোসফির শিক্ষক। ফলে বুদ্ধিজীবী দিবস এলেই ভেতরের ক্ষতটা বেড়ে যায়। পাকিস্তানিরা যখন বুঝল তারা হেরে যাবে তখনই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনকশা করে। এই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যাদের দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা তাদেরকেই মেরে ফেলা হলো। একটা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই আমরা এতিম হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা ওই জায়গাটাতে এখনো পৌঁছাতে পারিনি। তাদের অভাব এখনো আমরা পূরণ করতে পারিনি। এটা আমার মনোক্ষুণ্ণের কারণ।  আমরা এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছি। তবে স্বপ্ন দেখি একদিন আমরা দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে হাঁটব।

সোহানা সাবা

পাকিস্তানিরা যখন বুঝতে পারল যে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। তখনই তারা সিদ্ধান্ত নিল এদেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে। তাই তারা গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করেছে। আমাদের প্রতিটি সেক্টরে উল্লেখযোগ্য মানুষ ছিল। তারা থাকলে আমরা আরও অনেকদূর এগিয়ে যেতাম। শিক্ষা মানুষের বিবেকবোধ তৈরি করে দেয়, কিন্তু যারা মানুষকে বিবেকবান করে গড়ে তুলবেন, সেই আলোকিত মানুষদের হত্যা করা হয়েছে। সিনেমা বলেন, শিক্ষা বলেন, স্বাস্থ্য বলেন–  সব জায়গাতেই একটা শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে। না হলে আমরা অনেক উন্নত একটা দেশ পেতাম।

নওশাবা

দেশ হিসেবে আমাদের যত অবক্ষয়, যত সমস্যা দেখি, সেইসব সমস্যার মূল যদি তলিয়ে দেখি তাহলে এই দিনটা তার জন্য দায়ী। কারণ আমাদের সমস্যার সমাধান যারা দিতে পারতেন, যারা দেশটাকে উন্নত করতে পারতেন, তাদেরকে এই দিনটিতে হত্যা করা হয়েছে। যখন একটা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয় তখন আসলে সেই জাতি পিছিয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করা খাটে না। আমি কখনোই কারও নীতিগত অবক্ষয় বা পিছিয়ে থাকার কারণে রাগ করি না। আমি বাংলাদেশ নিয়ে কখনোই আশাহত নই, কারণ আমরা মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া একটা জাতিকে বিনির্মাণ করছি। এই কারণে বাংলাদেশিদের কোনো অন্যায় আচরণে কখনো রাগ করি না।  অনেকেই বলে এই দেশের মানুষের নীতি নেই , অসৎ, এটা নেই,  ওটা নেই। আমি মনে করি যারা নীতি তৈরি করবেন, যারা সততা শেখাবেন– তাদেরকেই তো হত্যা করা হয়েছে। আরেকটা কথা আমি মনে করি, প্রত্যেকটা জায়গায় একটা রোল মডেল দরকার। প্রত্যেকটা সেক্টরে একজন রোল মডেল দরকার। সেটা সংস্কৃতিতে হোক, খেলায় হোক, সিনেমায় হোক বা যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক, যাদের দেখে দেখে মানুষ এগিয়ে যাবে। আপনি কিন্তু ছোটবেলায় একজন টিচার বা বড় ভাইকেই অনুসরণ করতেন। এরপর আরও বড় কাউকে অনুসরণ করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে আমাদের সেই  রোল মডেলদের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এই জায়গাটাতেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের অভিভাবকশূন্য করে দিল। দেখেন জহির রায়হান নেই, শহীদুল্লা কায়সার নেই– এ রকম আরও অনেকেই নেই। ফলে চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে, শিক্ষা ক্ষেত্রে বা চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এ রকম অনুসরণীয় যারা ছিলেন তাদেরকে ‘নাই’ করে দিল। ফলে আমরা ছোটাছুটি শুরু করলাম। কারণ, আপনার সামনে কাউকে পাচ্ছেন না, লেখালেখিতে কাউকে পাচ্ছেন না, চলচ্চিত্রে, সাংবাদিকতায়, শিক্ষায় আপনার সামনে কাউকে পাচ্ছেন না। আমাদের ছোটাছুটি করা ছাড়া কিইবা করার আছে। সেই কারণে বাংলাদেশের হাজার সমস্যায় হাজার নেতিবাচক আচরণের ভেতরেও আমি কখনো রাগ করি না। বাবা-মাহীন একটা দেশ তারপরও এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে এতবড় ক্ষতির পরও আমি আশাবাদী বাঙালি আবারও এগিয়ে যাবে। বাঙালি এখন নিজেকে তৈরি করছে। তৈরি হওয়ার জন্য তাদের একটা সময় দরকার। আমরা সেই সময়টা পার করছি। আমি আশাবাদী– বাঙালি শিগগিরই সব দিকে উন্নতি করবে।

ইমন

বুদ্ধিজীবীরা আমাদের গর্ব। তারা এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানিরা বুঝতে পেরেছিল যে এই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে পারলে দেশটা পঙ্গু হয়ে যাবে। সেই কাজটাই তারা করেছে। শেষ পর্যন্ত কিন্তু আমাদের পিছিয়ে ফেলা সম্ভব হয়নি, আমরা এগিয়ে গেছি। এটাও ঠিক, শহীদ বুদ্ধিজীবীরা না থাকলে আমরা স্বাধীন দেশ পেতাম না। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তাদের আদর্শ আর কর্মকে অনুসরণ করে এদেশের তরুণরা এগিয়ে যাচ্ছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই।