পুরনোতেই আস্থা শেখ হাসিনার|188343|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
পুরনোতেই আস্থা শেখ হাসিনার
পাভেল হায়দার চৌধুরী

পুরনোতেই আস্থা শেখ হাসিনার

‘শুদ্ধি অভিযানের’ প্রেক্ষাপটে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা থাকলেও আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে কোনো চমকই দেখা গেল না। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর ‘একটা ঝাঁকুনি দিতে চাই’ বলায় ওবায়দুল কাদের বিরোধীরা ভেবেছিলেন, সভাপতি হয়তো তার ডেপুটির নেতৃত্বাধীন ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙার চেষ্টা করছেন। বিদায়ী কমিটির সর্বশেষ সভায়ও তিনি বলেছিলেন, নেতারা কর্ম অনুযায়ী ফল পাবেন। ক্ষমতাসীন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বিভিন্ন সময়ে সম্মেলনে চমক থাকবে বলে বলেছিলেন। শীর্ষ দুই নেতার এমন বক্তব্যে নেতাকর্মীদের মাঝেও সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন নেতা আসা নিয়ে জল্পনার পাশাপাশি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে সে জল্পনা জল্পনাই থেকে গেছে। পুরনোদের নিয়েই নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যার। দলের ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টানা নবমবারের মতো সভাপতি হয়েছেন তিনি। আর টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল শনিবার দলের ২১তম ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিন কাউন্সিলররা কণ্ঠভোটে সভাপতি ও 

সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। পরে তারা শেখ হাসিনাকে নতুন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির অন্য নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব দেন। এরপর নবনির্বাচিত সভাপতি শেখ হাসিনা একে একে কমিটির ৪১ জনের নাম ঘোষণা করেন। ৮১ সদস্যের কমিটির বাকি পদগুলো সভাপতিম-লীর সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পূরণ করবেন বলে জানান শেখ হাসিনা।

সম্মেলনে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের বাদে ঘোষিত কমিটির ৪১ জনের মধ্যে ২ জন ছাড়া সবাই পুরনো কমিটির। ওই দুইজন হলেন সভাপতিম-লীর সদস্য শাজাহান খান ও মহিলা সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকী। তারা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এই প্রথম দায়িত্ব পেলেন। তবে এই সম্মেলন সামনে রেখে দল ও সরকার আলাদা করার যে ‘আওয়াজ’ ছিল পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে কমিটি থেকে বাদ দাওয়ায় তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মন্ত্রী থাকা দলীয় পদ হারানো নেতাদের মধ্যে আছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। তিনি গত কমিটির আইন সম্পাদক। গত কমিটির সাংগঠনিক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও মহিলা সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা নতুন কমিটিতে কোনো পদ পাননি। আইন ও মহিলা সম্পাদক পদে নতুন দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সাংগঠনিক সম্পাদকের তিনটি পদ ফাঁকা রয়েছে। ধর্ম ও শিল্প-বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক পদেও কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এই দুই পদের নেতা টিপু মুনশি ও শেখ আবদুল্লাহ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের পদ দেওয়া না হলে বাদপড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা হবে সাত জন। শেখ হাসিনাসহ পাঁচজন মন্ত্রী কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছেন। বাকিরা হলেন ওবায়দুল কাদের, ড. আবদুর রাজ্জাক, ডা. দীপু মনি ও হাছান মাহমুদ। কমিটি ঘোষণার পরে সম্মেলনে আসা কাউন্সিলরদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, চমকের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কোনো চমক নেই। চমকহীন সম্মেলন।

কেন্দ্রীয় কমিটির ৪১ জনের নাম ঘোষণা : আওয়ামী লীগের ২১তম সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটির ৪১ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বাকিগুলো পরে ঘোষণা করা হবে। উপদেষ্টা পরিষদে আগের ৪১ জনকেই রাখা হয়েছে। বাকি ১০ জনের নাম পরে জানানো হবে। এবারের কমিটিতে উপদেষ্টা ছাড়া মোট পদ ৮১টি।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা হলেন- সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফর উল্লাহ, অ্যাড. সাহারা খাতুন, নুরুল ইসলাম নাহিদ, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য, ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, রমেশ চন্দ্র সেন, অ্যাড. আব্দুল মান্নান খান, আবদুল মতিন খসরু, শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকরা হলেন- মাহাবুব-উল-আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

নতুন কমিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পাদক হয়েছেন সাম্মী আক্তার, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাজিবুল্লাহ হিরু, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নদী, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়া, প্রচার সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. মৃণাল কান্তি দাস, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হারুন অর রশীদ, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপা, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন ডা. রোকেয়া সুলতানা। সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন আহম্মদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, এস এম কামাল হোসেন ও মির্জা আজম।

যেসব পদ ফাঁকা : সম্পাদকমণ্ডলীর বেশিরভাগেরই নাম ঘোষণা করা হয়েছে গতকাল। ফাঁকা রয়েছে কোষাধ্যক্ষ, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক, শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক সম্পাদক, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক, তিনটা সাংগঠনিক সম্পাদক পদ, উপ-প্রচার এবং উপদপ্তর সম্পাদকের পদ। বিদায়ী কমিটিতে আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এইচ এন আশিকুর রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ছিলেন বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

বিদায়ী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নাম নতুন কমিটিতে আসেনি। সদ্য সাবেক কমিটির শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন আব্দুস সাত্তার, শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন হাবিবুর রহমান সিরাজ। উপপ্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন আমিনুল ইসলাম আমিন। নতুন কমিটিতে তার নাম গতকাল আসেনি। উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়াকে পদোন্নতি দিয়ে দপ্তর সম্পাদক করা হয়েছে। তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের পদও ফাঁকা রয়েছে।

সংসদীয় বোর্ড : গতকাল দলের সংসদীয় বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এর সদস্যরা হলেন শেখ হাসিনা, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, ওবায়দুল কাদের ও মো. রশিদুল আলম।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনী বোর্ড : আওয়ামী লীগের কমিটির তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি ২০১৯-২০২১ সালের জন্য দলের স্থানীয় সরকার/পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ মনোনয়ন বোর্ড ও সংসদীয় বোর্ডের সদস্যদের নামও ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। ১৯ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটিতে আছেন শেখ হাসিনা, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, কাজী জাফর উল্লাহ, মোহাম্মদ নাসিম, ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, ওবায়দুল কাদের, মো. রশিদুল আলম, মাহবুব-উল-আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান ও ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ।

পদোন্নতি পেলেন যারা : নতুন কমিটিতে বিভিন্ন পদে তেমন রদবদল তেমন না হলেও পদোন্নতি পেয়েছেন কয়েকজন। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদ থেকে বাদ পড়েননি কেউ। ১৭ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীতে আগের ১৪ জনই রয়েছেন। নতুন মুখ হিসেবে এসেছেন সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও মেহের আফরোজ চুমকি। আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সভাপতিম-লীর সদস্য হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন গত কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন গত কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য এস এম কামাল হোসেন ও মির্জা আজম। দপ্তর সম্পাদক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন গত কমিটির উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়া। আইন সম্পাদক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য নজিবুল্লাহ হিরু।

একেবারে নতুন যারা : সভাপতিম-লীর সদস্য শাজাহান খান ও মহিলা সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি। শাজাহান খান এই প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটিতে এলেন। ঘোষিত নতুন কমিটিতে (আংশিক) মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাই বাদ পড়েছেন।

শেখ হাসিনা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর কমিটি ঘোষণার আগে বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম আপনারা আমাকে ছুটি দেবেন, বয়স হয়েছে এই বিবেচনা করে। আমি কোনো দায়িত্বে থাকি আর না থাকি আওয়ামী লীগ আমার একটি পরিবার। আমি এ পরিবারের সদস্য হয়ে থাকব। আমার একটাই শক্তি আওয়ামী লীগ। সামনে আপনাদের নতুন নেতৃত্বের কথা ভাবতে হবে। টানা দুবার দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া ওবায়দুল কাদেরকে তিনি এসময় অভিনন্দন জানান। শেখ হাসিনা এসময় সবার কাছে দোয়া চান।