মাহমুদ ভাইয়ের প্রেমকাহিনি ও প্রজন্মের ক্যাডার ভাবনা |189034|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৮:১৪
মাহমুদ ভাইয়ের প্রেমকাহিনি ও প্রজন্মের ক্যাডার ভাবনা
সাঈফ আলম

মাহমুদ ভাইয়ের প্রেমকাহিনি ও প্রজন্মের ক্যাডার ভাবনা

১.

বৈষয়িক ভাবনা ও বস্তুবাদী আরাম-আয়েশের মানসিক বিশিষ্টতা সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশির কতটা ভয়ংকর সামাজিক, রাজনৈতিক, বিশেষত শিক্ষা মানসগতভাবে সর্বনাশ করছে তার একটা দরকারি আলাপ করার আকাঙ্ক্ষা থেকে আজকের এই লেখা। শুরু করবো রবীন্দ্রনাথের একটা অভিমত দিয়ে। তিনি বহুকাল আগেই বলে গিয়েছেন যে, ভারতবর্ষে যেদিন থেকে বৃক্ষতলে বসে পণ্ডিত কর্তৃক শিক্ষার দান ও গ্রহণের কার্যাস্থানের স্থানান্তর ঘটায়ে ইট-পাথরের ক্লাসরুমে ঢোকানো হয়েছিল, সেদিন থেকেই শিক্ষার গুণ-প্রকৃতির রূপান্তর শুরু। বৃক্ষতলে পণ্ডিতের শিক্ষা বা আশ্রমে মুনি-ঋষির কাছে দীক্ষা, উভয়েরই একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল মানুষ হওয়া। পণ্ডিত মশাইয়ের হাতে পিতারা তাদের সন্তানদের সঁপে দিয়ে যে নিবেদনটা করে আসতেন তা ছিল এ রকম- ‘পণ্ডিত মশাই, আমার এই গরুটাকে একটু মানুষ করে দেবেন।’ অর্থাৎ শিক্ষা সেকালে গরুকে মানুষ বানাতো। কিন্তু একালে? দুর্ভাগ্যবশত শিক্ষা একালে মানুষকে ক্যাডার বানাচ্ছে; মানুষ করে তুলছে খুব কমই। মোটামুটিভাবে আজকালকার শিক্ষা থেকে অর্জনযোগ্য বস্তু হলো ‘ডিগ্রি সার্টিফিকেট’ আর এ বস্তুটার ব্যবহারিক উপকারিতা হলো ‘চাকরির জন্য উপযোগী’ হয়ে ওঠা। ফলাফল? ফলাফল হলো ‘থিংস ফলেন এ্যাপার্ট’ অর্থাৎ সব লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে চাকরির অবিচ্ছেদ্য যোগ স্থাপন করে, ‘এ জীবন-মন-সকলই নাও’ জাতীয় মন্ত্র সাধন করে ক্যাডার বনে যাওয়ার পাগলা ঘোড়ায় সোয়ার হতে গিয়ে আমরা যে কাণ্ড কারখানা করছি তা কতটা অপরিণামদর্শিতার পরিচয় বহন করে, সে প্রশ্নের মীমাংসা করার এখনই সময়। কেবলমাত্র চাকরির মাপকাঠিতে জীবনের মূল্য নির্ধারণ এবং শিক্ষিত প্রজন্মের ক্যাডার হওয়ার নেশা দিনদিন কতটা গুরুতর হচ্ছে তার নমুনা সংগ্রহে আমি এখন পাঠকদের মাহমুদ ভাইয়ের প্রেম কাহিনি ও মনিরুলের আত্মহত্যার ঘটনা পাঠ করার নিবেদন করছি। 

২.

মাহমুদ ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্দান্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। অবশ্য আমাদের দেশে মেধার দর ক্রমশ নিম্নমুখী। সে কথা এখনই না তুলি। আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। উনি গবেষক হতে চেয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজ থেকে পিএইচডি করে দেশে ফিরে আসবেন। দেশমাতৃকার সেবা করবেন। নতুন নতুন আবিষ্কার করবেন, দেশের উন্নয়নে এমন অবদান রেখে যাবেন যেন মৃত্যুর পরেও জাতি তার কথা স্মরণ করে। এমনই স্বদেশভক্তির অনুভূতিসম্পন্ন এক মানুষ ছিলেন মাহমুদ ভাই। এ রকম এক উচ্চ জীবনবোধ ধারণ করে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে মাহমুদ ভাইয়ের স্বপ্নময় ছাত্রজীবনের দিনকাল কাটছিল। দেখেছি সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদগ্ধ অধ্যাপকদের ক্লাস করে আর লাইব্রেরিতে ক্লান্তিহীন রেফারেন্স বই ঘেঁটে ঘেঁটে তার সন্ধ্যা গড়িয়ে যেত। রাতের গাড়িতে ক্যাম্পাস থেকে শহরে ফিরে একটা বাসায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে গণিত শেখাতেন। ছাত্র বয়সী শিক্ষককে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী পড়াতে নিয়োগ দিলে সচরাচর যা ঘটতে শোনা যায়, মাহমুদ ভাইয়েরও যথারীতি তার ব্যতিক্রম ঘটল না। শুরু হলো ছাত্রী-শিক্ষক প্রেম উপাখ্যান। ছাত্রীর মা-বাবা মাহমুদ ভাইকে খুব স্নেহ করতেন। ভদ্র ছেলে ও গুণী ছাত্র বলে তারা মাহমুদ ভাইয়ের অকৃপণ প্রশংসা করতেন। তিন বছর পর ছাত্রী ইন্টারমিডিয়েটে উঠল আর মাহমুদ ভাই মাস্টার্সে। তারপর সেই মনির খানের গানের কথাগুলো ফলতে শুরু করল- ‘তারপর সেই বাংলা ছবির ছকবাঁধা ছলকানী। সানাই বাজিয়ে হয়ে গেল এই প্রেমের কুলখানি। সবকিছু হলো তোমার বাবার অশুভ কনসালটে। আর আমার? ভালোবাসার গণেশ গেল উল্টে।’ অর্থাৎ মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। ছেলে বিসিএস ক্যাডার। মেয়ে অবশ্য বাড়িতে মাহমুদ ভাইয়ের কথা তুলেছিল। মাহমুদ ভাইকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না বলে রীতিমতো যুদ্ধ বাঁধিয়েছিল। কিন্তু মেয়ের বাবা কোনোভাবেই নন-বিসিএস বেকার মাহমুদের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিতে সম্মত হলেন না। মাহমুদ ভাইকে একদিন যা তা বলে অপমান করে একপ্রকার ও বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটি অবশ্য মাহমুদ ভাইকে পীড়াপীড়ি করেছিল তাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে। তবে মাহমুদ ভাই তাতে রাজি ছিলেন না। মা-বাবার মনে দুঃখ দিয়ে বিয়ে করে সন্তান কখনো সুখী হতে পারে না- এই যুক্তি তর্ক করে মেয়েটিকে মাহমুদ ভাই সেদিন  ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য পরে মাহমুদ ভাইয়ের ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। সে কষ্ট নিজের একান্ত ব্যক্তিগত দুঃখ হিসেবে চেপে রেখেছিলেন। তবে ভেতরে ভীষণ এক জেদ চেপেছিল তার; তিনিও বিসিএস ক্যাডার হবেন। প্রেমিকার বাবাকে তিনি তা করে দেখাবেন। ফলে গবেষক হওয়ার স্বপ্নযাত্রা তার ওইখানেই থামল। মাথা থেকে অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ-পিএইচডি’র সব চিন্তার ভূত দূর হয়ে গেল। নতুন ভূত যেটা আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে বসল, সেটি ওই বিসিএস ভূত। গবেষণামূলক বই, রেফারেন্স বুক, টেক্সটবুক, থিওরির যত বই পত্র সবই বস্তাবন্দী করে ঘরের এক কোনায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নিলেন নীলক্ষেতের ফুটপাতের অমূল্য পুস্তক এমপি থ্রি আর জব সলিউশন (বিসিএস গাইড)। যথারীতি তার গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে গেল ঘানার রাজধানী, ইথিওপিয়ার মুদ্রার নাম, যমুনা ব্রিজের পিলার সংখ্যা কিংবা শেক্‌সপিয়ারের বাপের নাম কি-টাইপের সব জিনিস। পূর্বেই বলেছি মাহমুদ ভাই জাত মেধাবী ধরনের ছেলে। প্রথম বিসিএস দিয়েই বাজিমাত করে দিলেন। পুলিশের এএসপির পদ প্রাপ্ত হলেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন সকলেই মাহমুদ ভাইয়ের প্রশংসায় গদগদ হয়ে এ খবরের ঢোল পেটাতে লাগলেন। মাহমুদ ভাইয়ের এ সাফল্যের খবর অচিরেই তার প্রাক্তন প্রেমিকার বাবার কান পর্যন্ত পৌঁছাল। আহ্লাদে তিনিও আটখানা হয়ে মাহমুদ ভাইকে মনে মনে সন্ধান করে বেড়াতে লাগলেন। মাহমুদ ভাই ছুটিতে বাড়ি আসলে তার বন্ধুকে দিয়ে খবরের পর খবর পাঠাতেন সেই প্রেমিকার বাবা। অনেকবার খবর পাওয়ার পরে, ভদ্রতার খাতিরে মাহমুদ ভাই একদিন তাদের বাড়ি না গিয়ে পারলেন না।  মাহমুদ ভাইয়ের দুহাত জড়িয়ে ধরে মার্জনা প্রার্থনাপূর্বক প্রেমিকার বাবা সেদিন বলেছিলেন যে, তিনি মাহমুদ ভাইয়ের ওপর অন্যায় করেছেন। তিনি এর প্রায়শ্চিত্ত করতে চান। কীভাবে? তিনি তার ছোট মেয়েটাকে মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চান। মাহমুদ ভাই আত্মসম্মানওয়ালা ছেলে। তিনি প্রায়শ্চিত্তের এ দান গ্রহণে রাজি হলেন না। মাহমুদ ভাই বলেছিল, ‘কাকা, আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেন। এই আমি আর সেই আমি তো একই আমি, একই মানুষ। আমি জানি, আমার মূল্য আপনার কাছে আগের মতোই রয়ে গেছে; মূল্য যা বেড়েছে তা ওই ক্যাডারের । আপনার কাছে মানুষের মূল্য যেদিন বাড়বে সেদিন আমাকে ডাকবেন; সেদিন আপনার প্রস্তাব ভেবে দেখতে পারি।’  এই বলে মাহমুদ ভাই সেই বাসা থেকে বেরিয়ে আসেন।  

৩.

এবার মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। মাহমুদ ভাইয়ের মতো একজন বিরল মেধাবীর গবেষক হওয়ার বাসনা বর্জন করে ক্যাডারে পরিণত হওয়ার যে আমরা পড়লাম তা আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও এবং এটা এক উপন্যাসের মুখরোচক কাহিনির জোগান দেবে নিশ্চয় কিন্তু ঘটনাটা গভীরে যে এক কুলক্ষণ বয়ে বেড়ায় তার পরিণাম স্পষ্টভাবেই আমাদের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়। আরেকটু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যাবে যে, গত আট-দশ বছর হলো আমাদের দেশের অনার্স-মাস্টার্স পড়ুয়াদের মধ্যে সাধারণভাবে সরকারি চাকরির প্রতি বেসামাল এক ঝোঁক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মেধাবীদের মধ্যে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার প্রবণতা রীতিমতো নেশার মতো চেপে বসেছে। অবস্থা এখন এমনই খাপছাড়া যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী নামে মাত্র উপস্থিতি দেখানোর জন্য ক্লাসে গিয়ে বসে। এ বসার অর্থ হলো শুধুই বসে থাকা। ক্লাসের পঠন-পাঠনে তাদের মনের কোনো যোগ থাকে না। তারা তাকিয়ে থাকে কিন্তু দেখে না। আওয়াজ পায় কিন্তু শোনে না। এক কথায়, ফিজিক্যালি তারা ক্লাসে প্রেজেন্ট থাকলেও ম্যান্টালি তারা ক্লাসে অ্যাবসেন্ট থাকে। তাদের সমস্ত মন-মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স নামের মহাগ্রন্থের পাতায় পাতায় বা বিসিএস এর সাধারণ জ্ঞানের গাইডের লাইনে-লাইনে। এমনকি সারাজীবন বিজ্ঞান পড়া, এমবিবিএস পড়া, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করা ছেলেটিও এখন বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পুলিশে চাকরি নিচ্ছে। অর্থাৎ হুজুগের ক্যাডার নেশায় জড়িয়ে যাচ্ছে।  এ দৃশ্য ভয়ংকর এবং জাতির জন্য নিরাশার। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় দেশে ডাক্তার বলে কোনো প্রজাতি থাকবে না। আর ইঞ্জিনিয়ার দেখতে হলে আমাদের বিদেশ গিয়ে দেখে আসতে হবে। আর অধুনা বিসিএসের এই লম্বা দৌড়-প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যে সমস্ত ‘অন্য বিষয়ে-ভিন্ন-প্রকারের’ মেধাবীদের দল ব্যর্থ হচ্ছে তারা হতাশায় জর্জরিত হয়ে বিসিএসের চাকরি ছাড়া পৃথিবীর অবশিষ্ট সকল কাজের জন্য নিজেদের অযোগ্য ঘোষণা করে আত্মহননের পথ আবিষ্কার করছে।  এর দৃষ্টান্ত নিত্য পত্রপত্রিকায় ভাসে। উদ্বিগ্ন সুধীজন মাত্রই এসব খবরের শিরোনাম কারও নজর এড়ানোর কথা নয়। উদ্ভূত এ পরিস্থিতির পশ্চাতে প্রকট কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। মাহমুদ ভাইয়ের কাহিনি তার একটা। আরও কয়েকটা নিম্নরূপ:         

প্রথমত,
শিক্ষার সংজ্ঞা বর্তমানে পাল্টে ফেলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা একজন মানুষকে তার কথায়, আচরণে, চলায়, ফেরায় অপরাপর অজ্ঞদের থেকে উৎকৃষ্ট করে তুলবে। এটাই শিক্ষার মুখ্য কাজ। কিন্তু বর্তমানে আমাদের শিক্ষা মোটাদাগে এ প্রধান কাজটি করতে পারছে না, কারণ এখনকার যে শিক্ষা, সাধারণভাবে তার সংজ্ঞা হলো ‘স্মৃতি শক্তির পরীক্ষা দিয়ে সনদপত্র প্রাপ্তি।’ এর মধ্যে সৃজনশীলতা বলতে কিছু নেই। বিদেশে অবশ্য উল্টোটা হয়। ওরা মুখস্থবিদ্যা অর্থাৎ ‘স্মৃতিশক্তির’ পরীক্ষার ধার ধারে না; ওরা শিক্ষার্থীর ‘চিন্তাশক্তির’ পরীক্ষা নেয়, এবং সেই শক্তির উত্তম বিকাশের সম্ভাব্য সকল পথ সৃষ্টি করে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চেষ্টা প্রচেষ্টা চালায়। ফলে ওদের শিক্ষার্থীরা যখন চিন্তা শক্তির ঘোড়া দাবড়িয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে নতুন নতুন ধারণা যোগ করে, তখন দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশের অনার্স-মাস্টার্স এর বিশাল দলটি হয়তো যমুনা ব্রিজের পিলার সংখ্যা মুখস্থ করতে মাথা কুটে মরছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা অনার্স-মাস্টার্স পাস করার পরেও বুঝে উঠতে পারে না পিতা-মাতার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয়। কারণটা ওই চিন্তাশক্তি যার কোনো ব্যবহার এদের জীবনে নেই বললেই চলে, অন্তত সৃজনশীল কাজে। যে বিশেষ কর্ম সম্পাদনের জন্য কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বলে মানতে রাজি থাকি সে কর্মটি হলো গবেষণা করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। দুর্ভাগ্যবশত বিসিএস উত্তেজনা ও ভবিষ্যৎ এই সোনার হরিণ লাভের অবিরাম ব্যস্ততায় ডুবে থাকার কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোটাদাগে গাদা গাদা ছাত্র মিললেও নতুন জ্ঞান তৈরির মানানসই কোনো কর্মী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। চিন্তাশীল ধার্মিকজনদের মুখে ইদানীং একটা হতাশার গান শুনতে পাই ‘আজও সেই কোরআন আছে, হাদিস আছে, সেই ইমান আর মানুষ নেই’। আমাদের হতাশার গানটাও ঠিক তেমনই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজও সেই লাইব্রেরি আছে, টেবিল আছে, চেয়ার আছে কিন্তু গবেষণার জন্য ছাত্র নেই। হুড়োহুড়ি করে পড়ে-মরে ভোর বেয়ানে এখানে ছাত্র-ছাত্রীরা লাইনে দাঁড়ায় লাইব্রেরিতে আসন ধরার জন্য। কিন্তু এ দৃশ্য দেখে খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই, কেননা এত যত্নের প্রতিযোগিতা টেক্সট বই পড়ার জন্য নয়, বিসিএসের মুখস্থবিদ্যা চর্চার জন্য। এই হলো অবস্থা। ফলে কততম বিসিএসে ক্যাডার উৎপাদনে কে কার আগে বা পেছনে পড়ল তার একটা পরিসংখ্যান মেলানোর অহংকারের কাজটাতে আমরা ছাত্র-শিক্ষক উভয়ই সাগ্রহে অংশ নিয়ে থাকি।  এতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বিসিএস উৎসাহ দিন দিন চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলেছে।            

দ্বিতীয়ত,
নতুন প্রজন্মের মধ্যে জীবনবোধ এবং মাইন্ডসেট বা মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে একশ আশি ডিগ্রিতে। পরিবার ও সমাজ অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের জীবনদর্শনে বস্তুবাদী মন্ত্র সাধনে পর্যাপ্ত কাঁচামাল যোগান দিয়ে থাকে। মাহমুদ ভাইয়ের কাহিনিতে মেয়ের বাবার পাত্র নির্বাচনের মানদণ্ড ও মানসিকতা তো তারই সাক্ষ্য বহন করে। দৃশ্যত বর্তমান দুনিয়া আধুনিক বস্তুবাদী দুনিয়া। এখানে জীবন মানে বাড়ি, গাড়ি, টাকা, পয়সা, ক্ষমতা ইত্যাদি। এখানে পয়সার মালিক হওয়াকে বড়লোক বলে। হৃদয়ে যারা বড়, আচরণে যারা বিনয়ী তাদেরই বরং ছোটলোকের শ্রেণিতে ফেলা হয়। এখানে সম্মান-সমীহ বিতরণের সূত্র হলো: রাষ্ট্রের কাঠামোতে আপনার অবস্থান কোনো জায়গায়, আর আপনি অন্যের ওপর কতটা কর্তৃত্ব চর্চা করতে পারেন সেই পেশী কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতা। এই জন্য বাস্তবে উদাহরণ মেলে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুলিশের সেপাই যখন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের মোটরসাইকেল আটকিয়ে হেনস্তা করে, তখন শিক্ষক তাকে ‘স্যার স্যার বলে’ কাকুতি-মিনতি করতে করতে গলা শুকিয়ে ফেলেন আর বিতৃষ্ণ হয়ে বাড়ি ফিরে জীবনের সমস্ত নৈরাশ্য নিয়ে নিজেকে জেরা করেন, কেন তিনি পুলিশে চাকরি না নিয়ে শিক্ষকতায় নাম লেখালেন? সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংকল্প স্থির ফেলেন যে, ছেলে বড় হলে তাকে পুলিশের এসপি বানাবেন। সুতরাং শিক্ষকের ছেলের বিসিএস বাতিকের বীজ ওই শিক্ষক নিজ হাতেই তার গৃহে রোপণ করে দেন ছেলের ন্যাংটা কাল থেকেই। ফলে ছেলে শৈশব থেকেই অপরাপর পেশা বা জীবিকা অর্জনের সম্মানজনক সকল উপায়কে নিকৃষ্ট জেনে সেগুলোর প্রতি এক প্রকারের অনীহা লালন করে বেড়ে উঠতে থাকে। দৃশ্যত যা হওয়ার তা হচ্ছে; অন্যান্য পেশার শূন্যস্থানগুলোতে ভুয়া লোকের অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে, যেমন ভুয়া ডাক্তার।   

তৃতীয়ত,
আমাদের দেশের মানুষ আত্মনির্ভরশীলতাকে হীনাবস্থা বলে ধারণা করে। ফলে মাস্টার্স পাস দিয়ে কারও মুরগির ফার্ম করে স্বাবলম্বী হওয়াকে এখানে সফলতা বলে জ্ঞান করা হয় না। এখানে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে গ্রামের স্কুলের নাইট গার্ড হওয়াটাও সিদ্ধিলাভের সমান। ফলে আমাদের দেশে সরকারি চাকরি বিশেষ করে ‘বিসিএস ক্যাডার’ হওয়া নতুন প্রজন্মের একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিসিএস হলো না, তো আপনার জন্য আল্লাহর দুনিয়ায় আর ভালো কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। এ রকম একটা মাইন্ডসেট অনেকের জন্য জীবনঘাতী হচ্ছে। এই সেদিনও দৈনিক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে মনিরুল নামে অনার্স-মাস্টার্স পাস করা একজন মেধাবী ছেলে সরকারি চাকরি হলো না তাই গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। মনিরুলের স্ত্রী বিসিএস ক্যাডার, সরকারি কলেজে চাকরি। সুতরাং স্বামী হিসেবে তো তার মান-সম্মান আর থাকে না। বিসিএস নেই, তো এ জীবন দিয়ে সে কী করবে? মরল গলায় দড়ি দিয়ে। স্ত্রীকেও ক্যাডার হতে হবে, স্বামীকে ক্যাডার হতে হবে, সন্তানদেরও ক্যাডার বানাতে হবে- কেন যে এ রকম মরণঘাতী একমুখী বিকল্পহীন ক্যারিয়ার ভাবনার কাছে আমরা সবাই করজোড়ে মাথা নত করছি তা আমার বোধে আসে না। অনেক সময় সাধারণ মানুষের তর্ক-বিতর্কে মিনতি করতে শুনে থাকি ‘আলেম ওলামাদের শেষ করে দিয়েন না, তাহলে আপনি মরলে আপনার জানাজা পড়ানোর লোক খুঁজে পাবেন না।’ কথাটায় কি রাজনীতি আছে জানি না, তবে এর মধ্যে দরকারি একটা উপলব্ধি আছে, আর তা হলো এই যে, আমাদের কর্মক্ষেত্র যেমন বিচিত্র তেমনি কর্মীও লাগবে বিচিত্র যোগ্যতার ও দক্ষতার। কিন্তু সরকারি চাকরি প্রীতি এবং বিসিএস ধ্যান এই বিচিত্র কর্মী উৎপাদনের সম্ভাবনা দিনদিন সংকুচিত করে দিচ্ছে কি না তা ভেবে দেখা দরকার। মনিরুলের মতো উচ্চশিক্ষিত যুবকদের ভয়ংকর জীবনবোধ ও আত্মঘাতী মাইন্ডসেট বদলাতে না পারলে শিক্ষিত মানুষের আত্মহত্যায় শীর্ষ দেশের মুকুট বাংলাদেশকেই পরতে হবে। আর বেশি দেরি হয়ে গেলে বিদেশ থেকে হাজার হাজার মনোবিজ্ঞানী এনে আমাদের এ বিসিএস পাগল মেধাবী প্রজন্মকে চিকিৎসা করাতে হতে পারে বলে আশঙ্কা থেকে যায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ওই সমস্ত ভাড়া করে আনা মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো বাংলা সিনেমার ডাক্তারদের মতো বলে বসবে, ‘রোগী শুধু বিসিএস বিসিএস করছে, এখনই বিসিএসকে খবর দিন, তা না হলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।’

কয়েকদিন পূর্বে আমার এক প্রাক্তন ছাত্রীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে ছ’বছর যাবৎ বিসিএস এর জন্য ঘুম খাওয়া বাদ দিয়ে লেগে আছে। কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় দিনদিন সে নৈরাশ্যবাদী হয়ে উঠছে। সে আমাকে শোনাল যে, সে ফেসবুকে যায় না কারণ তার ভয় করে। তার খুব অসহ্য রকমের আত্মসম্মানে লাগে যখন সে ফেসবুক খুললেই এই জাতীয় পোস্ট দেখতে পাই, যেমন ‘আলহামদুলিল্লাহ, ৩৮তম প্রিলিতে সিলেক্টেড হলাম’ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ ৩৭তম-তে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলাম’ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ, ৩৭তম-তে নন-ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত।’                   

চতুর্থত,
মাইন্ডসেট এর সঙ্গে সাথে ‘ক্যাডার’ শব্দের সম্প্রসারিত অর্থের প্রতি দুর্বলতাও বিসিএস প্রীতির একটা কারণ হতে পারে। ভাষা বিজ্ঞানে পড়েছি যুগের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন শব্দ নতুন নতুন অর্থ ও মর্যাদা লাভ করে। যেমন ধরুন, ‘নেট’ শব্দটা এখন মাছ ধরার জালকে বোঝায় খুব কম। এক সময় বোঝাতো। কিন্তু নেট বলতে এখন মানুষ শুধু ইন্টারন্টেকেই বোঝায়। কিছুকাল পূর্বেও ‘ক্যাডার’ শব্দটা শুনলে ভয়ংকর শোনাতো কারণ এটা দিয়ে সাধারণত ভয়ংকর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তকে বোঝাত। কিন্তু ‘ক্যাডার’ শব্দটা এখন অধিক সম্মানযুক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয় বিসিএস কর্মকর্তাদের বোঝাতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক (তবে সবাই নয়) বিসিএস কর্মকর্তাকে দেখেছি তারা নিজেদের ‘ক্যাডার’ হিসেবেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। অনেক শ্বশুর (তবে সবাই নয়) মেয়ের জামাইয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে সব ভুলে গেলেও ‘ক্যাডার’ শব্দটা বলতে ভুল করেন না। অনেকেই আবার তাদের নামের পাশে ব্রাকেটে কত তমসহ বিসিএস ক্যাডার শব্দগুলো জুড়ে দিচ্ছে। এমনকি অনেকে নামের সঙ্গে কত তমসহ ‘নন-ক্যাডার’ কথাটাও লাগাতে ভুল করছে না। সুতরাং ‘ক্যাডার’ শব্দটা এখন অহংকারের বস্তু যা লিখে বা উচ্চারণ করে আপনি আপনার শ্রেণি ও অবস্থান জানান দিয়ে আশপাশের আমজনতা থেকে আপনার প্রাপ্য কদরটুকু আদায় করে নিতে পারেন যদিও ‘ক্যাডার’ বা ‘বিসিএস’ কোনো ডিগ্রি নয়। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন মানুষ শুধু মদ ও রুটি-ভাতে বাঁচে না; বাঁচার জন্য সম্মান-মর্যাদার ও দরকার আছে। আমরা যেহেতু মর্যাদার ধারণাটা বিশেষত একটি শ্রেণি নির্দেশক শব্দের মধ্যে বন্দী করে ফেলেছি, সেহেতু আমাদের নতুন প্রজন্ম শুধু সীমাবদ্ধ ওই ‘ক্যাডার’ শব্দের পেছনে ভ্রমরের মতো ঘুরে মরছে । এই শব্দভিত্তিক মর্যাদার অলংকার অর্জন করে তা গায়ে জড়ালে তাতে অনেকের মানসিকতাও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। যেমন সম্প্রতি কলেজ সরকারিকরণের সময় তার লক্ষণ কিছুটা স্পট হয়ে হয়ে উঠেছিল। জাতীয়কৃত কলেজের শিক্ষকদের যেন ওই ‘ক্যাডার’ মর্যাদার ভাগ না দেওয়া হয় তার জন্য বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সুধীজনরা রাস্তায় পর্যন্ত নেমে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষ তার চেয়ে বড় কোনো কিছুর অস্তিত্ব যে থাকতে পারে, সেটা তার চিন্তায় কুলায় না।      

৪.

পরিশেষে বলতে চাই, যারা বিসিএস বা বাংলাদেশ সিভিল প্রশাসনে চাকরি করেন তারা সকলেই মেধাবী। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ চলে না। কিন্তু তাই বলে সবাইকে বিসিএস ক্যাডার হতে হবে এমন ধারণা প্রজন্মের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যের। হ্যাঁ, আমাদের বিসিএসে লোক দরকার, আবার আমাদের গবেষকও দরকার, ডাক্তারও দরকার, ইঞ্জিনিয়ারও দরকার, শিক্ষকও দরকার। আমাদের সিভিল সার্ভিসে কর্মখালি অসীম নয়, এখানে শূন্যপদের সংখ্যা অবশ্যই সসীম। প্রকৃতপ্রস্তাবে, আমাদের লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েটের তুলনায় কয়েকশগুণ কম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন একটা অনার্স শ্রেণিতে ১০০ জন শিক্ষার্থী থাকলে প্রায় সকলেরই পেশা ভাবনা ওই বিসিএস বা অন্তত সরকারি চাকরি। ফলে বিসিএস এবং সরকারি চাকরির অশেষ লাইনে দাঁড়িয়ে যে বিশাল উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ৩০ বছর বয়স (এখন অবশ্য দাবি উঠেছে ৩৫ বছর করার) পর্যন্ত মাথা কুটেও বিসিএসের সোনার হরিণ এর সাক্ষাৎ লাভে ব্যর্থ হচ্ছে, ততদিনে তাদের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষয় সাধন হচ্ছে এবং অনেকেই নিরাশার অতল গভীরে ডুবে যাচ্ছে। শেষে জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছে না এসব সিভিল সার্ভিসের চাকরি পাগলদের দল। এভাবে, প্রজন্মের একটা বিশালসংখ্যক সক্ষম কর্মশক্তি যে শরীরে-মনে-প্রাণে অন্য কোনো পেশার জন্য নিজেদের অজ্ঞানে অনুপযোগী করে তুলছে তা তারা  নিজেরাও অনুধাবন করতে সমর্থ হচ্ছে না, চিন্তাশীলদেরও এ নিয়ে তেমন কিছু উচ্চবাচ্য করতে দেখা যাচ্ছে না। এতে দেশের যে অনিষ্ট হচ্ছে তা আপাতত কারও দৃষ্টিগোচর না হলেও নিকট ভবিষ্যতে নিশ্চয় সকলের নিকটই স্পষ্টরূপে ধরা পড়বে। সময় আসবে এমন, যখন সারাজীবন বিসিএস এর পেছনে দৌড়ানো ছেলেটি বা মেয়েটি বিসিএস ব্যর্থ হয়ে কিংবা অনন্যপায় হয়ে অন্য চাকরিতে যোগ দিয়ে নিজেদের ইতর বিচার করে হীনমন্যতায় তলিয়ে গিয়ে মনিরুলের মতো দলে দলে গলায় দড়ি দিয়ে মরবে।  সুতরাং আশু এ আত্মঘাতী দৃশ্যপটের পরিবর্তন  একান্ত কাম্য। তা না হলে, আত্মহননকারী মণিরুলদের এই সংখ্যা অগ্র-পশ্চাতে বাড়তে বাড়তে এক সময় পুরো প্রজন্মকে গ্রাস করবে কিনা সংশ্লিষ্ট সকল মহলকেই তা ভেবে দেখার আবেদন করছি।   

লেখক: শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, চট্টগ্রাম।