বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমরা অনেক দূর যেতে পারতাম|192339|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১১ জানুয়ারি, ২০২০ ০৯:২৮
বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমরা অনেক দূর যেতে পারতাম
ড. কামাল হোসেন

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমরা অনেক দূর যেতে পারতাম

১০ জানুয়ারি ১৯৭২। স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হয়ে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে এলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তির পর লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ঢাকায়। ঐতিহাসিক এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর রাজনীতিবিদ ও খ্যাতনামা আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। ১০ জানুয়ারি ২০২০ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ‘মুজিববর্ষ-২০২০’-এর ক্ষণ গণনার প্রাক্কালে দেশ রূপান্তরের কাছে ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : এবার আমরা এমন এক সময়ে ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’ পালন করতে যাচ্ছি যখন পুরো দেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ‘মুজিববর্ষ ২০২০’ উদ্‌যাপনে প্রস্তুত হচ্ছে।  আপনার কাছে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কথা শুনতে চাই। সেসব দিন মনে পড়লে প্রথম আপনার কোন স্মৃতির কথা মনে পড়ে?  

ড. কামাল হোসেন : প্রথমেই আমার মনে পড়ে পরস্পরকে দেখে আমরা দুজনই খুব আনন্দিত হয়েছিলাম।  সে আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি বন্দি ছিলাম হরিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। অফিসাররা এসে আমাকে বললÑ চলো তোমাকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাব। আমি বললাম, কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে? ওরা বলল সেখানে গেলে তুমি আনন্দিত হবে। একটা ফোক্সওয়াগন গাড়িতে করে আমরা যাচ্ছিলাম।  হরিপুর থেকে বেরিয়ে পেশোয়ার রোড ধরে রাওয়ালপিন্ডির দিকে গাড়ি ছুটতে লাগল। কিন্তু রাওয়ালপিন্ডি পার হয়েও হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটতে থাকায় আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। এ সময় হাইওয়ে ছেড়ে একটা কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়ল গাড়ি। সেখানে অস্ত্রধারীরা প্রহরায় ছিল আর দূরে একটা বাংলো মতো দেখা যাচ্ছিল। আমি আবারও জানতে চাওয়ায় ওরা বলল, তোমাকে ওই বাংলোয় নিয়ে যাচ্ছি। 

দেশ রূপান্তর : আপনি তো তখনো জানতেন না যে, আপনাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?

ড. কামাল হোসেন : না। একদমই জানতাম না। বাংলোর ভেতরে নিয়ে গিয়ে আমাকে বলল, এক নম্বর রুমে ঢোকো। দরজা খুলে ঢুকতেই দেখি বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন। মুক্তি পাব আর এভাবে আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সশরীরে দেখা হবে এটা ভাবতেও পারিনি। বঙ্গবন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, কোলাকুলি করলেন।  বললেন, আমিই তোমাকে এখানে নিয়ে আসতে বলেছি। বললেন যে ভুট্টো এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। ওকে আমি তোমার কথা বলেছি যে, আমার ধারণা তুমি এখানেই অন্য কোথাও বন্দি আছো।  তোমাকে যেন আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। ভুট্টো তো দেখি কথা রেখেছে!

আমার তখন যে আনন্দ হচ্ছিল সেটা বলে বোঝাতে পারব না। কেননা, বঙ্গবন্ধু জীবিত আছেন, তার সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়েছে এটা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। কেননা, তার আগে প্রায় নয় মাস আমি একেবারে ‘সলিটারি কনফাইনমেন্টে’ ছিলাম। কারোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই, দেখা করার সুযোগ নেই। এমনকি জেলের ভেতরে দিনের বেলায় যে হাঁটাচলার সুযোগ দেওয়া হয়, সেটুকুও ছিল না।

দেশ রূপান্তর : পাকিস্তানিরা তো মুক্তির পর বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে ইরান কিংবা তুরস্ক যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল? 

ড. কামাল হোসেন : ঠিক। বঙ্গবন্ধুকে ওরা বলল, কাল সকালে ইরানের শাহ আসছেন, তিনি আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য খুবই আগ্রহী, আপনি তার সঙ্গে একটু দেখা করে তারপর যান। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ছিলেন। তিনি এক মুহূর্তও দেরি করতে চাচ্ছিলেন না। আমাকে ডেকে বললেন, শোনো আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য ইরানের শাহকে দিয়ে এসব চেষ্টা হচ্ছে, আমরা এসব একেবারেই পাত্তা   দেব না।  পরে বঙ্গবন্ধু একটু বিরক্ত হয়েই ভুট্টোকে বললেন যে, দেখো আজ রাতেই আমাদের মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। হয় তোমরা সে ব্যবস্থা করো নইলে আমাকে এখনই জেলে পাঠিয়ে দাও। ভুট্টো তখন বিষয়টা বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছানুযায়ী প্লেনে করে আমাদের লন্ডনে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

দেশ রূপান্তর : ৮ জানুয়ারি সকালে পাকিস্তানের একটা বিশেষ বিমানে করে আপনারা হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছালেন। বিবিসি মর্নিং সার্ভিসে প্রথম ঘোষণা করা হলো বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে লন্ডনে আসছেন। সকাল ৭টায় বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। বাংলাদেশের মানুষসহ বিশ্ববাসী বঙ্গবন্ধুর মুক্তির কথা জানতে পারল।  লন্ডনে পৌঁছে কী অভিজ্ঞতা হলো? প্রবাসী বাঙালিরা কী করল? বঙ্গবন্ধুকে তো ক্ল্যারিজেস হোটেলে রাখা হলো?

ড. কামাল হোসেন : বিমানবন্দরে প্রথমে আমরা পেলাম লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের এম এম রেজাউল করিমসহ আরও দু-তিনজনকে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের ইয়ান সাদারল্যান্ড ও অন্যরা এলেন। ওরা যখন বঙ্গবন্ধুকে হোটেলে নিয়ে রাখার কথা বলল তখন তিনি বললেন আমি তো সবসময় রাসেল স্কয়ারের কাছের হোটেলগুলোতে থেকেছি, সেখানেই যাই। কিন্তু ইয়ান সাদারল্যান্ড হেসে বললেন, স্যার আপনার সব কথা আমরা মেনে নেব, এটা পারব না। আপনাকে আমরা ক্ল্যারিজেস হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করেছি, রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে আমরা তাদের ওখানেই রাখি। কারণ রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য নিরাপত্তার যে ব্যবস্থা তা সেখানেই আছে।

দেশ রূপান্তর : আমরা ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি, শনিবারের সেই শীতের সকালে লন্ডনের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেও বাঙালিদের ঢল নেমেছিল মুক্ত বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য। লন্ডনের আশপাশ এবং বার্মিংহ্যাম, ম্যানচেস্টার থেকেও বাঙালিরা ছুটে এসেছিল। কেমন ছিল সে অভিজ্ঞতা?

ড. কামাল হোসেন : সেটা অবিস্মরণীয়। শুধু লন্ডনের আশপাশ বা ইংল্যান্ডই নয়, মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে আসার কথা জেনে ফ্রান্স থেকেও অনেকে রওনা দিয়েছিল। তারা ভেবেছিল আমরা হয়তো সেখানে এক দুই দিন থাকব। আর ক্ল্যারিজেস হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং ব্রিটিশরা বাঙালিদের এমন ঢল দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিল। হোটেলের সামনে জড়ো হওয়া শত শত মানুষ সামলাতে ওদের হিমশিম খেতে হয়।  ওরা একপর্যায়ে এসে বললÑ সবাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চায়। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়, তোমরা দু-একজনকে দাও যারা বেছে বেছে কিছু মানুষকে সে সুযোগ দেবে। 

দেশ রূপান্তর : সেদিনই বঙ্গবন্ধু ক্ল্যারিজেস হোটেলে একটা সংবাদ সম্মেলন করলেন। বঙ্গবন্ধু কী বলেছিলেন? আপনার কি কিছু মনে পড়ছে?

ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধু প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন।  তিনি বললেন, মুক্তি পেয়ে আমি জানতে পেরেছি দুনিয়ার মানুষ কীভাবে আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছেন। কীভাবে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। মহান নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর যে বিচক্ষণতা ছিল সেটা বোঝা যায় তার কথায়। তিনি যদিও জানতেন যে, নিক্সন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু তিনি বললেন যে প্রেসিডেন্ট বিরোধিতা করেছে সেটা দুঃখজনক। কিন্তু আমেরিকার যে সাধারণ জনগণ মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছেন, সেখানকার যে সিনেটররা সমর্থন করেছেন আমি তাদের ধন্যবাদ দিই, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, দেখো আমাদের তো নতুন রাষ্ট্র, কারোর সঙ্গেই আমরা বিরোধে জড়াতে চাই না। সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করা এবং গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। তিনি এমনিতেও কাউকে আঘাত করে কথা বলতেন না। আর সেদিনও তিনি খুব মেপে মেপে কথাগুলো বলেছিলেন।

দেশ রূপান্তর : আমরা জানি, হোটেলে অবস্থানকালেই আমেরিকার সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। সে সময়ের ব্রিটেনের বিরোধী দলের নেতা হ্যারল্ড উইলিয়াম যিনি পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনিও দেখা করতে এসেছিলেন। ব্রিটেন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিল বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে। তবুও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করলেন। এ সম্পর্কে কিছু বলুন। 

ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ সরকারি সফর সংক্ষিপ্ত করে ফিরে এসেছিলেন লন্ডনে।  ৮ তারিখ বিকেলে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু। হিথ খুবই আন্তরিকভাবে খুবই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। তিনি বললেন আমরা আপনাকে নিয়ে খুবেই উদ্বিগ্ন ছিলাম। আজ এখানে এভাবে আপনাকে স্বাগত জানাতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। তিনি আরও বললেন, ব্রিটিশ সরকার সবসময়ই আপনাদের সঙ্গে ছিল এবং এখনো আমরা আপনাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে, আমাদের একটু সময় দিন, আমরা যত শিগগির সম্ভব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছি, এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা চেষ্টা করছি যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবাইকে নিয়ে স্বীকৃতি দেওয়া যায়।  আপনি ধরে নিতে পারেন যে আমরা তা-ই করছি, এ কারণেই আমরা আপনাকে এখানে ‘হেড অব স্টেট’ হিসেবেই রিসিভ করছি।

দেশ রূপান্তর : ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সে বৈঠকের আর কোনো কথা মনে পড়ছে কি? তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার আর কোনো কথা হলো?  

ড. কামাল হোসেন : হুমম। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরা নিয়ে অস্থির হয়ে ছিলেন। বাংলাদেশ বা ভারত থেকে প্লেন আসবে কি না এসব নিয়ে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। প্রধানমন্ত্রী হিথ বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হোয়াট এলস ক্যান উই ডু ফর ইউ?’ বঙ্গবন্ধুকে আমি বললাম, হিথ কি আমাদের দ্রুত দেশে ফেরার জন্য প্লেনের ব্যবস্থা করতে পারেন? তখনই বঙ্গবন্ধু এই অনুরোধ জানালেন। প্রধানমন্ত্রী কাউকে ফোন করে খোঁজ নিতে বললেন এবং অল্প সময় পরই জানালেন সেটা সম্ভব। মুশকিল ছিল ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের ওই বিশেষ বিমান ঢাকার বিমানবন্দরের রানওয়েতে নামতে পারবে কি না সেসব হিসেব নিয়ে। পরে সেগুলোও জানা গেল।  আমরা দেশে ফিরলাম এবং তেজগাঁওয়ে নামার সময় লক্ষ করেছিলাম বিমানটি থামাতে রানওয়ের একেবারে শেষ মাথা পর্যন্ত যেতে হলো।

দেশ রূপান্তর : লন্ডন থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি হয়ে আপনারা ঢাকায় এলেন। মুক্তিযুদ্ধে  কলকাতায় মুজিবনগর সরকার পরিচালনা করতে দেওয়া, প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে মিত্রবাহিনী গঠন করে সম্মুখ সমরে লড়াই করা পর্যন্ত ভারত রাষ্ট্র এবং দেশটির জনগণ অসীম সহায়তা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা এবং বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে পাকিস্তানকে চাপ প্রয়োগ করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বহু রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি লিখেছেন, অনেক দেশ সফর করেছেন। নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধুর কী অভিজ্ঞতা হলো?

ড. কামাল হোসেন : নয়াদিল্লির সঙ্গে তো টেলিফোনে কথা হচ্ছিল। তারা বলছিলেন, এখানে তো প্লেন থামছেই। কিন্তু কলকাতা থেকে ঘন ঘন টেলিফোন আসছে, সেখানকার সবাই বঙ্গবন্ধুকে কলকাতায় সংবর্ধনা দিতে চায়। কলকাতায় মুজিবনগর সরকার পরিচালিত হয়েছে, তাদের দাবিও জোরালো। কিন্তু মুশকিল হলো নয়াদিল্লিতে দুই ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করে কলকাতা হয়ে ঢাকায় ফিরলে আমরা আর দিনের আলো থাকতে ঢাকায় পৌঁছাতে পারব না। বঙ্গবন্ধু বললেন, তোমারা বুঝিয়ে বলো ওদের যে, আমি পরে প্রথম যখন দেশের বাইরে যাব, সবার আগে কলকাতায় যাব। বঙ্গবন্ধু পরে তার কথা রেখেছিলেন।

দেশ রূপান্তর : আর নয়াদিল্লিতে কী হলো? বঙ্গবন্ধু তো ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং সেখানে একটা জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। 

ড. কামাল হোসেন : প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে তো ছিলেনই, কেবিনেট মিনিস্টারদের মধ্যেও বলা যায় প্রায় সবাই ছিলেন, অনেক পার্লামেন্ট মেম্বার ছিলেন। এক অভূতপূর্ব দৃশ্য রচিত হয়েছিল সেখানে। মনে হলো যেন পুরো দেশ সেখানে চলে এসেছে। কেউ আনন্দে চোখের পানি ফেলছে, কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদছে। ওই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও সেখানে অসাধারণ আন্তরিকতা, স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ করেছিলাম। সেখানকার চিফ প্রটোকল অফিসার আমাকে বললেন, স্যার এমন দৃশ্য আমরা কোনোদিনও দেখিনি। অনেক বাঙালি সেখানে ছিল, বিপুল সংখ্যায় ভারতীয়রাও এসেছিল বঙ্গবন্ধুকে দেখতে তার কথা শুনতে। পরে সেখান থেকে আমরা গাড়িতে করে রাষ্ট্রপতি ভবনে গেলাম, বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালেন।  

দেশ রূপান্তর : নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের যে ভিডিও পাওয়া যায় সেখানে দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু প্রথমে ইংরেজিতে বক্তব্য শুরু করলেও পরে বাংলায় বলছেন। ঘটনাটা আসলে কী ছিল?

ড. কামাল হোসেন : সেখানে তো সব স্টেটসম্যানরা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাই সেভাবে ইংরেজিতেই শুরু করেছিলেন। কিন্তু উপস্থিত বাঙালিরা চিৎকার করে বলেন, ‘বাংলায়, বাংলায়’। মিসেস গান্ধী বাংলা জানতেন, তিনিই তখন বঙ্গবন্ধুকে ইশারায় তা করতে বলেন। বঙ্গবন্ধু বাংলায় তার স্বভাবসুলভ ভাষণ শুরু করতেই শ্রোতারা উল্লসিত হয়ে উঠল। এসব স্মৃতি আসলে কখনোই ভোলার নয়।

দেশ রূপান্তর : ডেটলাইন ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ ঢাকা। বিমানবন্দর থেকে রমনা রেসকোর্স পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পুরো দুই ঘণ্টা সময় লেগেছিল বঙ্গবন্ধুর মোটর শোভাযাত্রার। সমস্ত ঢাকা শহর আর আশপাশের জেলা থেকেও মানুষ এসে জড়ো হয়েছিল রমনা রেসকোর্স থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরের পথে। আমরা সেসব ছবিতে দেখেছি, পড়েছি।  আমি আপনার কাছে অন্য একটা প্রসঙ্গ জানতে চাইব। রেসকোর্সে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু আপনার নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘ড. কামালকে নিয়ে ৩ মাস জেরা করছে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দাও।’ পাকিস্তানিদের আপনাকে জেরা করার ঘটনার কিছু বিবরণ দিন।

ড. কামাল হোসেন : পাকিস্তানিরা সবসময় জানতে চাইত ভারতের সঙ্গে শেখ মুজিবের কী সম্পর্ক? কোথাও কখনো ভারতের সঙ্গে মুজিবের কোনো বোঝাপড়া হয়েছে কি না এসব। আর আমাকে বারবার প্রকারান্তরে বলত যে, তোমার লিডারের তো যা হওয়ার তা-ই হবে। ওরা বোঝাতে চাইত মৃত্যুদণ্ডের কথা। ফাঁদে ফেলতে চাইত যে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কিছু বললে আমাকে ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু আমি কখনোই সাড়া দিইনি।  আমাকে বলত তোমার স্ত্রী-সন্তানদের দেখতে চাইলে এমন কিছু বলো যা মুজিবের বিরুদ্ধে আমাদের কাজে লাগবে।  একপর্যায়ে ওরা আমাকে এসে কাগজ-কলম দিয়ে বলে গেল, তোমার যা বলার আছে এখানে লিখে রাখো।  আমি ভাবলাম, আমি আমাদের মুক্তিসংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতটাই লিখব, সত্য কথাগুলোই যুক্তি আকারে লিখব। আমি দুই পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা লিখতে শুরু করলাম।

দেশ রূপান্তর : টু ইকোনমি থিওরির কথা?

ড. কামাল হোসেন : একদম ঠিক বলেছেন। ষাটের দশকে অর্থনীতিবিদদের খুব ভালো কাজ ছিল এটা।  অর্থনীতিবিদরা সব পরিসংখ্যান একেবারে সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছিলেন। সে সময় একবার পত্রিকায় একটা শিরোনাম হয়েছিল। ‘রেহমান সোবহান সেইস টু ইকোনমি; আইয়ুব খান সেইস ওয়ান ইকোনমি’। রেহমান সোবহান তখন খুব পপুলারিটিও পেয়েছিলেন, একেবারে প্রেসিডেন্টের পাল্টাপাল্টি কথা বলে।    

দেশ রূপান্তর : রেসকোর্সের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার রাষ্ট্রে হবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এই বাংলাদেশ হবে গণতন্ত্র এই বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।’ আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশকে কীভাবে দেখছেন?

ড. কামাল হোসেন : আমাদের সংবিধানের মূলনীতিগুলো তো আমরা সেখানেই পেয়ে গেলাম গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি।  বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মূলনীতিগুলো সংবিধানের সামনের দিকে রাখতে।  আমরা সেভাবেই সংবিধান প্রণয়ন করেছিলাম। এখন কথা হলো বাহাত্তরের সংবিধানটা দেখে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কতটা পূরণ হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধু পরে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অনেক কিছুই পাল্টে যায়। দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি সবই পাল্টে গেল। আপনি কী মনে করেন বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে?

ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। যে ক্ষতি এখনো পূরণ হয়নি, হওয়ার নয়। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমরা আরও অনেক অনেক দূর যেতে পারতাম। তার মতো এত বড় মাপের মানুষ, এত বড় নেতার অভাব পূরণ হওয়াও সম্ভব নয়। তিনি শুধু দেশে নন সারা বিশ্বের মানুষের শ্রদ্ধা-ভক্তি অর্জন করেছিলেন। সেটা জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন থেকে শুরু করে সবখানেই দেখা গেছে।  সে সময় অনেক দেশই স্বাধীন হতে চেষ্টা করেছে। অনেকেই পারেনি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা পেরেছিলাম।  বঙ্গবন্ধু অসীম সাহসী ছিলেন, সে কথা সবাই জানতেন। বঙ্গবন্ধু কখনোই মৃত্যুকে ভয় পাননি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারিয়েছি।