আনন্দময় শৈশব কে দেবে|194083|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
আনন্দময় শৈশব কে দেবে
রাজেকুজ্জামান রতন

আনন্দময় শৈশব কে দেবে

কী হলো দেশটার, বলুন তো! পত্রিকার পাতা আর টেলিভিশন খুললেই নারী-শিশু নির্যাতন আর ধর্ষণের খবর দেখতে দেখতে তো মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি নাকি আমরা একটা অসুস্থ জাতিতে পরিণত হয়ে গেলাম? বয়লিং ফ্রগ সিন্ড্রোম নামে বহুল কথিত একটি মানসিক অবস্থার কথা আমরা জানি। একটি পাত্রে পানির মধ্যে ব্যাঙ রেখে পানির তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকলে ব্যাঙ একসময় সেদ্ধ হয়ে যায় কিন্তু লাফিয়ে পাত্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার আর থাকে না। হত্যা, খুন, ধর্ষণের খবর প্রতিদিন পড়তে পড়তে আমরাও কি ব্যাঙের মতো সেদ্ধ এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছি কিনা?

যে বিষয়ে আলোচনা করতেও একসময় মানুষ সংকোচ বোধ করত আজ তা প্রতিদিনের নিয়মিত আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যে কতখানি অবনমন ঘটাচ্ছে রুচির আর ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে মানুষের মনে তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। শুধু একটাই হাহাকার, কী হচ্ছে এসব, কী ঘটছে এসব?

বছরভিত্তিক ধর্ষণের একটা পরিসংখ্যান অধিকার নামের একটি সংস্থা প্রকাশ করেছে। তাদের পরিসংখ্যানের সূত্র বা উৎস সম্ভবত ধর্ষণ সম্পর্কিত পত্রিকায় প্রকাশিত দৈনিক খবর। বাংলাদেশের মতো সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দেশে ধর্ষণের মতো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অপমানের কথা ভেবে তা লজ্জায় অনেকে প্রকাশ করতে চান না। গোপন বেদনায় নীরবে দগ্ধ হতে থাকেন তারা। পুরো তথ্য কিংবা সংখ্যা জানা যায় না একথা কথা বিবেচনায় রেখেও অধিকারের পরিসংখ্যান দেখলে উদ্বেগ আর আতঙ্কে অস্থির হয়ে ওঠার কথা যে কোনো মানুষের। অধিকার বলেছে, ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ধর্ষণের ঘটেছে ১৩ হাজার ৬৩৮টি।  গণধর্ষণ ২ হাজার ৫২৯টি। শিশু ধর্ষণ ৬ হাজার ৯২৭টি, ধর্ষণ পরবর্তী খুন ১ হাজার ৪৬৭ এবং ধর্ষণ পরবর্তী আত্মহত্যা ১৫৪ জন।  

শিশুর মাঝেই মা-বাবা দেখে তাদের ভবিষ্যৎ, বপন করে তাদের স্বপ্ন। প্রাণবন্ত হাসিখুশি শিশু দেখতে কার না ভালো লাগে? দল বেঁধে কলকল করতে করতে যখন স্কুলে যায় তা দেখে কার না ভালো লাগে? শিশু কিশোর মানেই দুরন্তপনা, হৈ চৈ, চিৎকার, হুল্লোড়। তাই মন খারাপ করে চুপচাপ বসে থাকা কোনো শিশুকে দেখলে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে শরীর খারাপ নাকি? উদ্বিগ্ন স্বজনের জিজ্ঞাসা থাকে, কী হয়েছে তোমার? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শিশুটি যদি চুপ করে থাকে বা কান্নাকাটি করে তাহলে উদ্বেগ তো আরও বাড়ে, এতে কত রকম যে উৎকণ্ঠার জন্ম হয়, সে সম্পর্কে অভিভাবকদের প্রত্যেকেরই কমবেশি অভিজ্ঞতা আছে।   

আর এই বিষয়টি যদি কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে হয় তাহলে উদ্বেগের সঙ্গে একটা সন্দেহ এবং আতঙ্কের শিহরণ বয়ে যায়। অন্য কিছু নয় তো! এই অন্য কিছু মানে কি? অন্য কিছুর বেদনা ভাষায় বলা বা প্রকাশ করতে যে হৃদয় ছিঁড়ে যাওয়ার অনুভূতি হয় তার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো বেদনার কি তুলনা হতে পারে?

একটি পুতুলের মতো শিশু বা ঝরনার মতো উচ্ছল কিশোরী যাকে দেখলে বুকের মধ্যে স্নেহের জোয়ার ওঠে সে যদি কখনো যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের মতো ঘটনার শিকার হয় তখন শুনতে কেমন লাগে? যখন তার সময় প্রশ্ন করার, জানতে চাওয়ার, নতুন কিছু শেখার, মানুষের সঙ্গে মেশার, বন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানোর, প্রাণ খুলে হাসি ও আনন্দ করার, গান গাওয়ার, খেলাধুলা বা দৌড়ঝাঁপ করে শরীরটাকে শক্তপোক্ত করার তখন যদি শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয় তাহলে সে মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে কীভাবে? 

ঢাকার সায়মা, পার্বতীপুরের মিম, শরীয়তপুরের তাসলিমা এরকম কত নাম প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় আসছে যাদের ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল। একটা বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করতে পাষণ্ডদের বুকে  কি একটুও মায়া জাগে না? এই ধরনের নৃশংসতা একের পর এক ঘটেই চলেছে। সারা দেশে বছরে এরকম নিষ্ঠুর মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজারের বেশি। যৌন হয়রানি ও হেনস্থার পরিমাণের বহুগুণ বেশি। শিশু অধিকার ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তুলনায় শিশু ধর্ষণ বেড়েছে দ্বিগুণ আর যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে ৭০ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৩৮১ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গড়ে প্রতি মাসে ৮৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ভাবতেও অবাক লাগে এ কেমন সমাজ আমাদের? শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে কি পদে পদে বিড়ম্বনা সহ্য করতে হবে? এ থেকে মুক্তির পথ কী? এ ধরনের যৌন হয়রানি ও হেনস্থাকারীদের শাস্তি ও সংশোধন না করে কি শিশুকিশোরদের জীবন নিরাপদ হবে? সন্তানদের নিরাপদ রাখার কোনো উপায় না পেয়ে কেউ কেউ আবার পরামর্শ দিয়ে  বলেন, সাবধানে চলবে, পোশাক ভালো করে পড়বে, অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলবে না ইত্যাদি। কিন্তু একটি শিশু কী বিষয়ে সাবধান হবে, কতটুকু এবং কোথায় সাবধান হবে? রাস্তায়, বাসায়, স্কুলে, খেলার মাঠে, মার্কেটে যে কোনো জায়গায় যদি সবসময় সতর্ক হয়েই চলতে হয় তাহলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ হবে কেমন করে? একটা আতঙ্কিত প্রজন্ম কি গড়ে উঠবে আমাদের দেশে?  শিশুদের প্রতি অস্বাভাবিক যৌন আকর্ষণকে একটা মানসিক রোগ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।  পেডোফিলিয়া নামের এই মানসিক

বিকৃতি শিশু ধর্ষণের কারণ বলে মনে করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ হল যৌনতা সংক্রান্ত সংস্কৃতি যা বিকৃতির আকারে মহামারীরূপে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে। বিচারহীনতা এবং কখনো ক্ষমতার প্রশ্রয় এই মহামারীকে বাড়িয়ে তুলছে ভয়ংকর আকারে।      

শিশুরাই তো যে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের আতঙ্কগ্রস্ত রেখে দেশের ভবিষ্যৎ কি উন্নত হতে পারে? তাদের জন্য খেলার মাঠ, পার্ক, আনন্দময় পরিবেশ যেমন দরকার তেমনি দরকার তাদের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ। যে শিশু স্নেহ পেয়ে বড় হবে সেই তো সমাজের বড়দের সম্মান করতে শিখবে। বড়রা যদি শুধু নিজেদের নিয়েই ভাবেন, সব কিছুতেই মুনাফা করতে চান তাহলে শিশুরা কী শিখবে? শিক্ষাগ্রহণ, চিকিৎসা পাওয়া দেশে যদি মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়তে থাকে, মাদক এবং নেশার যদি বিস্তার ঘটে, মেয়েদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা করা না শেখানো হয় তাহলে সমাজ এগুবে কী করে? অপরাধ করে কেউ যদি পার পেয়ে যায়, অপরাধীর বিচার যদি ঠিকমতো এবং সময়মতো না হয় তাহলে তো সমাজে অপরাধ বাড়তেই থাকবে। সমাজের অর্ধেক নারী তারা যদি শিশু বয়স থেকে ভয়ের মধ্যে বড় হয় তাহলে সমাজ গণতান্ত্রিক হবে কী করে। ভয়ের সমাজে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না।

উন্নয়নের কথা বলতে আমাদের বোঝানো হয় প্রশস্ত রাস্তা, বড় ভবন, ফ্লাইওভার, সেতু, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জিডিপি বৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের জীবনে শান্তি, স্বস্তি কতটুকু বেড়েছে তা কি জিডিপি দিয়ে মাপা যায়? আক্রান্ত শৈশব আর আতঙ্কিত মা-বাবা’র কাছে অর্থনৈতিক উন্নতির বর্ণনা কতটুকু স্বস্তি দেবে তা বিবেচনা করার সময় এসেছে। দেশে বড় বড় ভবন, সেতু, হাইওয়ে হচ্ছে কিন্তু শিশুদের যদি বড় মানুষ হতে দেয়ো না হয় তাহলে দেশের উন্নতি কার কাজে লাগবে। প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে আমাদের শিশুরা যদি নির্ভয়ে চলতে না পারে, বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করা শহরে অন্ধকার ঘরে যদি নির্যাতিত শিশু অপমানে কুঁকড়ে গিয়ে কাঁদতে থাকে তাহলে তাকে কোন ধরনের উন্নয়ন বলা যাবে? 

বাংলাদেশকে বলা হয় জনসংখ্যার সম্ভাবনার দেশ। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ইউরোপ আমেরিকা কিংবা জাপান রাশিয়া যখন দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশ তখন আরও ৪০ বছর নবীন জনসংখ্যার সুবিধা পাবে।  নতুন জ্ঞান, কর্মদক্ষতা আর স্বপ্ন নিয়ে আজকের শিশু কিশোররাই তো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।  কিন্তু জীবনের শুরুতেই কোনো শিশু যদি ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় তাহলে সে কোন স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে? বিকাশের পরিবেশ তৈরি করে এবং আতঙ্কের মধ্যে শিশুদের না রেখে তাদের আনন্দময় শৈশব দেওয়ার দায়িত্ব কি সমাজ নেবে না? সমাজ বলতে আমরা কী বুঝব? আমি আপনি আমরা সবাই মিলেই তো সমাজ। আসুন আমরা সবাই মিলে শিশুর জন্য বাসযোগ্য, বিকাশের অনুকূল আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করি। খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, শিশুর প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব গড়ে তোলার পথে বাধাগুলো চিহ্নিত করা কাজ যেমন জরুরি তেমনি মুনাফার সর্বগ্রাসী আক্রমণের হাত থেকে শিশুর ভবিষ্যৎ আর ভবিষ্যতের শিশুকে রক্ষা করার কাজটাও জরুরি। এসব ভুলে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের প্রস্তুতি নিতে নিতে আমরা যেন শিশুদের বিষণœ বর্তমান আর বিবর্ণ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে না দিই।

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট